Image description

এক মাসেরও কম সময় আগে এক প্রকাশ্য জনসভায় স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে ‘মোস্ট পাওয়ারফুল প্রতিমন্ত্রী’ বলেছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। এবার আর মুখের কথা নয়, একেবারে কাগজে-কলমে সেই প্রতিমন্ত্রীকে পাওয়ারফুল প্রমাণ করল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

চট্টগ্রামের একটি থানার ওসির ‘চাকরি নড়বড়ে’ করে দিয়েছেন কয়েকশ’ মাইল দূরের স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী। তার বাড়ি প্রধানমন্ত্রীর জেলা বগুড়ায়।

সম্প্রতি চট্টগ্রামের সদরঘাট থানার ওসি মুহম্মদ শরীফের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আধা-সরকারি চিঠি (ডিও লেটার) দেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী। ভিন্ন মন্ত্রণালয় আর ভিন্ন জেলার সেই প্রতিমন্ত্রীর চিঠিতে তড়িৎ ব্যবস্থা নিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।

ওসিকে থানা থেকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে তদন্তও শুরু করেছে পুলিশ বিভাগ। অথচ মাত্র ১৭ দিন আগে ওই থানায় ওসি হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন মুহাম্মদ শরীফ।

যে সদরঘাট থানা নিয়ে এত কাণ্ড, সেটি মূলত চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর) আসনের অধীন। আর এই আসনটি মন্ত্রিসভার জ্যেষ্ঠ সদস্য অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এবং বিএনপির প্রভাবশালী স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নির্বাচনী এলাকা।

নিজের এলাকায় অন্য এলাকার অন্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর এই চিঠিবাজি সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী ছিলেন অন্ধকারে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা টাইমস অব বাংলাদেশকে জানান, ‘ওসির বিরুদ্ধে অন্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর ডিও’র ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি অর্থমন্ত্রী জানতেনই না।’

 

বিএনপি সরকারের বর্তমান মন্ত্রিসভায় খুবই প্রভাবশালী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি গত ১৩ জুন কক্সবাজারে এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ‘এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বাংলাদেশের সবচেয়ে পাওয়ারফুল প্রতিমন্ত্রী।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই ‘সার্টিফিকেট’ যে নিছক কথার কথা ছিল না, খোদ তার মন্ত্রণালয়েই অন্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের এই হস্তক্ষেপে প্রমাণ হয়ে গেছে।

পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বর্তমানে বিদেশে। তার অনুপস্থিতিতে আইজিপির দায়িত্ব পালন করছেন অতিরিক্ত আইজিপি (প্রশাসন) একেএম আওলাদ হোসেন। তিনি অবশ্য নিজেদের নেওয়া পদক্ষেপেরই সাফাই গেয়েছেন। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় টাইমসকে তিনি বলেন, ‘একজন প্রতিমন্ত্রী ডিও লেটার দিতেই পারেন, ব্যবস্থাও নেওয়া হতে পারে।’

চট্টগ্রামের কোনো এমপি ডিও লেটার দিয়েছেন কি না এমন প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে গিয়ে তিনি বলেন, ‘এখানে কোনো অনিয়ম হয়নি।’

তবে প্রতিমন্ত্রীর এই ডিও লেটার নিয়ে খোদ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েই চলছে মুখরোচক আলোচনা। মঙ্গলবার সচিবালয়ে একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপকালে তারা বলেন, ‘মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বদলি, পদায়ন ও এমনকি ব্যবস্থা নিতেও ডিও লেটার দিয়ে থাকেন। তবে, নিজ জেলা বা বিভাগের বাইরে গিয়ে অন্য মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকার থানার ওসির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনা অনেকটাই ‘নজিরবিহীন’।

 

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, ওসির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হলে সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকার মন্ত্রীকে বিষয়টি প্রতিমন্ত্রী বলতে পারতেন।

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. নূরুল হুদা টাইমসকে বলেন, ‘একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর নির্বাচনী আসনে ওসির মতো একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অন্য একজন প্রতিমন্ত্রীর ডিও দেয়াটা স্বাভাবিক নয়। এমন ঘটনা হওয়া উচিত নয়। পুলিশে সরকারি দলের তদবির করার প্রবণতা থাকলেও এ ধরনের ঘটনার নজির কম।’

পুলিশ সূত্রের খবর, রাজনৈতিক পক্ষপাত, চাঁদাবাজি, অবৈধ আর্থিক লেনদেন আর জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদ অর্জনের মতো অভিযোগের লম্বা ফিরিস্তি দিয়ে ওসি মুহাম্মদ শরীফের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন প্রতিমন্ত্রী।

তার সেই ‘শক্তিশালী’ ডিও লেটার পাওয়ার পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আর দেরি করেনি। মন্ত্রণালয়ের পুলিশ-২ শাখার উপসচিব নাসরীন সুলতানা পুলিশ মহাপরিদর্শকের কাছে অভিযোগ তদন্তের চিঠি পাঠান। সেই চিঠি চট্টগ্রামে পৌঁছানো মাত্রই গত রোববার ওসি শরীফের ‘ডানা’ ছেঁটে দেওয়া হয়।

এ বিষয়ে উপসচিব নাসরীন সুলতানা টাইমস’কে জানান, ‘তিনি তার উর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশে রুটিন কাজ করেছেন। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আইজিপিকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। ওসি প্রত্যাহারের বিষয়টি তিনি জানেন না।’

এদিকে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কমিশনার ওয়াহিদুল হক চৌধুরী টাইমসকে ওসির বিদায়ের খবর নিশ্চিত করে বলেন, ‘পুলিশ সদর দপ্তরের চিঠি পাওয়ার পর সদরঘাট থানার ওসিকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। একজন উপপুলিশ কমিশনারকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি তদন্ত শুরু করেছে।’

যার ওপর দিয়ে এত বড় ঝড় বয়ে গেল, সেই ওসি মুহাম্মদ শরীফ অবশ্য নিজেকে নির্দোষ দাবি করছেন। গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘কর্ণফুলী থানার ওসি থাকাকালে এক আওয়ামী লীগ নেতার মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। সেই অনুষ্ঠানের ছবি ব্যবহার করে আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। আমি কোনো ধরনের অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নই।’

নেপথ্যে কী?

কিন্তু প্রতিমন্ত্রী কেন এত দূর থেকে ওসির ওপর খেপলেন? এনিয়ে বাতাসে উড়ছে নানা কথা। চট্টগ্রাম বন্দর এলাকায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বেশ কিছু বড় উন্নয়ন কাজ চলছে। সেসব কাজে বাধা হয়ে থাকতে পারেন ওসি শরীফ। আবার কেউ বলছেন, চট্টগ্রামেরই এক প্রভাবশালী সংসদ সদস্য নিজের ইচ্ছা পূরণে প্রতিমন্ত্রীকে কাজে লাগিয়েছেন। এই সংসদ সদস্য আবার বিতর্কিত সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু বলে পরিচিত!

নেপথ্যের আরেকটি কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, চট্টগ্রামের সিআইডির এক প্রভাবশালী কর্মকর্তার আক্রোশের শিকার হয়েছেন ওসি শরীফ। সম্প্রতি সিআইডির ওই কর্মকর্তার দুর্নীতির খবর পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল, আর ওসি শরীফ সেই সংবাদ প্রচারে সহযোগিতা করেছেন বলে গুঞ্জন রয়েছে।

বিতর্ক যখন প্রতিমন্ত্রীর ছায়া

অবশ্য প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের জন্য বিতর্ক কোনো নতুন বিষয় নয়। নিজের দুই ছেলের নামে দুটি ইউনিয়নের নামকরণ নিয়ে জাতীয় সংসদে আলোচনায় আসেন তিনি। এ নিয়ে দেশ জুড়ে মুখরোচক আলোচনা শুরু হলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইউনিয়ন দুটির নাম পরিবর্তনের নির্দেশ দেন।

এখানেই শেষ নয়, সম্পদ বৃদ্ধি নিয়ে সমালোচনা, শিবগঞ্জের একটি পুরোনো বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তনের চেষ্টা নিয়েও আলোচনায় এসেছেন মীর শাহে আলম। তার মানহানীতে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, সেই মামলায় সাংবাদিককে জেলেও নেওয়া হয়েছে।

চট্টগ্রামে ওসির বিরুদ্ধে ডিও লেটার নিয়ে ব্যাখ্যা জানার জন্য মঙ্গলবার রাত সাড়ে নয়টা পর্যন্ত প্রতিমন্ত্রীর মোবাইলে একাধিকবার ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ পাঠানো হলেও তিনি সাড়া দেননি। তার সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) তৌহিদুল ইসলাম টিটুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গেই যোগাযোগের পরামর্শ দেন।