Image description

রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র সচিবালয় ও নগর ভবনের মাঝখানে অবস্থিত ওসমানী উদ্যান। একসময় যা ছিল নগরবাসীর স্বস্তির আশ্রয়। ভোরের নির্মল বাতাসে হাঁটাহাঁটি, শরীরচর্চা; বিকালের অবসর আড্ডা কিংবা শিশুদের প্রাণচঞ্চল খেলাধুলায় মুখর থাকত উদ্যানের প্রতিটি কোণ।

ব্যস্ত নগরজীবনের ক্লান্তি দূর করতে অসংখ্য মানুষের প্রতিদিনের গন্তব্য ছিল সংরক্ষিত এ সবুজ প্রাঙ্গণ। কিন্তু এটি এখন ঢাকার উন্মুক্ত পার্কগুলোর যে সংকট, তার প্রতীক হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রাখা হয়েছে উদ্যানটি। উন্নয়নের নামে নির্মাণ করা হচ্ছে বিভিন্ন অবকাঠামো, সংকুচিত হয়ে এসেছে সবুজের পরিসর।

সম্প্রতি সরজমিনে দেখা যায়, ওসমানী উদ্যানের একটি অংশ দখলে নিয়ে করা হয়েছে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা। মূল উদ্যানে এখনো সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ। ভেতরে চলছে নতুন করে কংক্রিটের আচ্ছাদন বসানো ও বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের কাজ। অনেকটাই নষ্ট হয়ে গেছে উদ্যানের প্রাকৃতিক পরিবেশ।

ঢাকার অন্যান্য পার্ক ও উন্মুক্ত মাঠের অবস্থাও অনেকটা একই রকম। কোথাও হয়েছে ভাতের হোটেল, কোনোটি আবার ফুডকোর্ট, গ্যারেজ, মার্কেট কিংবা ট্রাক স্ট্যান্ডের দখলে। ফলে একের পর এক হারিয়ে যাচ্ছে সবুজের পরিসর, সংকুচিত হচ্ছে খেলাধুলা, শরীরচর্চা ও অবসর কাটানোর সুযোগ।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, একটি পার্কের মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষকে উন্মুক্ত সবুজ পরিবেশে বিশ্রাম, হাঁটাহাঁটি ও বিনোদনের সুযোগ দেয়া। কিন্তু সে ধারণা থেকে সরে এসে রাজধানীর অনেক পার্ক ও মাঠেই বাড়ছে বাণিজ্যিক ও অবকাঠামোগত ব্যবহার।

আগারগাঁওয়ে জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘরের বিপরীত পাশে অবৈধ স্কুল ভবন উচ্ছেদ করে গত বছর একটি আধুনিক পার্ক, লাইব্রেরি ও পাবলিক টয়লেট নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। প্রকল্পের কাজও শুরু হয়েছিল জোরেশোরে। কিন্তু প্রশাসনিক পরিবর্তনের পর সে নির্মাণকাজ থেমে যায়। বর্তমানে লাইব্রেরি ও পাবলিক টয়লেটের জন্য নির্মিত ভবনগুলোই ব্যবহার হচ্ছে ভাতের হোটেল, গাড়ির গ্যারেজ ও কেয়ারটেকারের কক্ষ হিসেবে। এলাকাবাসী বলছে, প্রকল্পটি আদৌ শেষ হবে কিনা তা নিয়েই তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

একইভাবে গুলিস্তানের শহীদ মতিউর পার্কেরও স্বাভাবিক চরিত্র আর ধরে রাখা যায়নি। পার্ক পরিচালনার জন্য ইজারা দেয়া হলেও বাস্তবে সেটি এখন ব্যবহার হচ্ছে পার্কিং হিসেবে। রাতে হাজার হাজার হকারের ঠেলাগাড়ি রাখা হয় সেখানে, আর দিনের বেলায় বিভিন্ন মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির পার্কিং স্পটে পরিণত হয় পুরো এলাকা। পার্কের একাংশে আবার দোকান নির্মাণ করে দখল করেছে স্বয়ং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনই (ডিএসসিসি)।

Playing_field_Kolabagan_MAS_070726_006

মোহাম্মদপুর ত্রিকোণ পার্কের একাংশে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র ।

ঢাকা দক্ষিণের অন্যতম উন্মুক্ত স্থান ধূপখোলা মাঠ। এর একাংশে মার্কেট নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, যা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে রয়েছে অসন্তোষ। অন্যদিকে দীর্ঘ আন্দোলনের পরও পান্থকুঞ্জ পার্কের ওপর দিয়ে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের পিলার নির্মাণ করা হয়েছে। পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, এতে স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এ সবুজ এলাকা।

ধানমন্ডির কলাবাগান মাঠের পাশে নির্মাণ করা হয়েছে একটি বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্র (এসটিএস)। এলাকাবাসীর ভাষ্য, মাঠটি খোলা থাকলেও বর্জ্যের দুর্গন্ধ ও নানা সমস্যার কারণে সেটি আর আগের মতো খেলাধুলা কিংবা অবসর সময় কাটানোর উপযোগী নেই।

পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক বাহাদুর শাহ পার্কটিও (রানী ভিক্টোরিয়া পার্ক) প্রায় দখল হয়ে গেছে ডিএসসিসির ইজারা বাণিজ্যের কারণে। পার্কের ভেতরে ফুডকোর্ট স্থাপন করায় সংকুচিত হয়েছে হাঁটার জায়গা। তাই স্থানীয় বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে এসব ফুডকোর্ট সরিয়ে নেয়ার দাবি জানিয়ে আসছেন। তাদের অভিযোগ, ছোট একটি পার্কেও বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে তুলে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত স্থান কমিয়ে দেয়া হয়েছে।

নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, একটি ঘনবসতিপূর্ণ শহরে পার্ক ও উন্মুক্ত স্থান বিলাসিতা নয়; বরং জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও বাসযোগ্যতার জন্য অপরিহার্য অবকাঠামো। উন্নয়নের প্রয়োজন থাকলেও তা যেন সবুজ ধ্বংস বা পার্কের মৌলিক চরিত্র নষ্ট না করে হয়—সেদিকে গুরুত্ব দেয়া জরুরি। অন্যথায় কংক্রিটের এ শহরে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য উন্মুক্ত সবুজের পরিসর আরো সংকুচিত হবে।

রাজধানীকে বাসযোগ্য করতে সরকার নতুন মাঠ ও পার্ক নির্মাণের ঘোষণা দিলেও যেগুলো রয়েছে তা পুনরুদ্ধারের বেলায় নীরব বলে মন্তব্য করেছেন ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খান। বিস্ময় প্রকাশ করে এ নগর পরিকল্পনাবিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আশ্চর্যজনক ব্যাপার হলো সরকার বিদ্যমান মাঠ-পার্ক পুনরুদ্ধারের ব্যাপারে একেবারেই নীরব। অথচ তাদের নির্বাচনী ইশতাহারে মাঠ পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি ছিল। একই অবস্থা আমরা দেখেছি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও। তখন সারা দেশে শত শত আন্দোলন হয়েছে, অসংখ্য সিদ্ধান্ত হয়েছে, কিন্তু ঢাকার মাঠ-পার্ক নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তই আসেনি। অন্তর্বর্তী সরকার একটি মাঠও পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে জনগণের জন্য উন্মুক্ত করেনি। বর্তমান সরকারও মাঠ-পার্ক নিয়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না।’

রাজধানীর মোহাম্মদপুর টাউন হল মার্কেটের পেছনে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের (জাগৃক) একটি খোলা জায়গা পার্ক হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছিল দীর্ঘদিন ধরে। এলাকাবাসীর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) সাবেক মেয়র আনিসুল হক সেটির সৌন্দর্যবর্ধনের বিষয়ে স্থপতিদের সঙ্গে কথাও বলেছিলেন। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সেটি হাতছাড়া হয়। বর্তমানে সেখানে আবাসন নির্মাণের প্রকল্প নিয়েছে জাগৃক। গণপরিসর হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছিল মিরপুরের কালশী মাঠ। এটিও নিজেদের আয়ত্তে নিয়ে নিয়েছে জাগৃক। ডিএনসিসি এলাকার বারিধারা জে ব্লকের মাঠটিও বেশ কয়েক বছর ধরে অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে। অভিজাত এলাকার উন্মুক্ত স্থানটি এখন ট্রাক, ভ্যান আর রিকশার গ্যারেজের দখলে।

মোহাম্মদপুর ত্রিকোণ পার্কে (টাউন হলের বিপরীতে) গিয়ে দেখা যায়, সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র মাঠের একাংশ দখল করে রেখেছে। তার পাশেই খেলাধুলা করছে শিশুরা। মাঠের ভেতর রয়েছে একটি অফিস ঘরও। তাজমহল পার্ক, শ্যামলী পার্কে গিয়েও প্রায় একই চিত্র চোখে পড়ে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এসব মাঠ-পার্কের কোনো যত্ন নেয়া হয় না।

Playing_field_Gabtoli_MAS_070726_005

মিরপুর মাজার রোডের বালুর মাঠের অর্ধেক স্থান দখল করে বানানো হয়েছে গাড়ির গ্যারেজ ।

বনানী সি-ব্লক পার্কের জায়গায় নির্মাণ করা হয়েছে পাবলিক টয়লেট। আবার শিশুদের খেলার জন্য কয়েকটি রাইড থাকলেও সবগুলো ভাঙা। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ হয়ে আছে ফার্মগেটের আনোয়ার উদ্যানটিও। কারওয়ান বাজারের পেছনে ডিএনসিসির তালিকাভুক্ত একটি পার্ক রয়েছে, যেটি বহু বছর ধরে ব্যবহৃত হচ্ছে বর্জ্যের ভাগাড় হিসেবে।

রাজধানীর মাঠ-পার্কগুলোর বেহাল পরিস্থিতির পেছনে সরকারের সদিচ্ছার অভাবকেই বড় কারণ বলে মনে করছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের (ইউআরপি) অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘রাজধানীর অভিজাত এলাকায় কিছু মাঠ-পার্ক কেবল টিকে আছে। সেগুলোও আবার জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত নয়। এর বাইরে যেসব এলাকায় মাঠ রয়েছে, সেগুলো বাস্তবিক অর্থেই ব্যবহার উপযোগী নয়। সেখানে রয়েছে খাবারের দোকান, রিকশার গ্যারেজ, ট্রাক স্ট্যান্ড। অনেক এলাকায় আবার কোনো মাঠ কিংবা পার্কই নেই।’

মিরপুর মাজার রোডে অবস্থিত বালুর মাঠটি একসময় শিশু-কিশোরদের খেলাধুলায় মুখর থাকত। কিন্তু কয়েক বছর ধরে এর প্রায় অর্ধেক দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে রিকশা, মোটরসাইকেল ও গাড়ির গ্যারেজ। অন্যদিকে মিরপুর ১২ নম্বরে অবস্থিত হারুন মোল্লাহ ঈদগাহ পার্ক ও খেলার মাঠটি স্থানীয়ভাবে লালমাঠ হিসেবে পরিচিত। সরজমিনে দেখা যায়, মাঠের পশ্চিম পাশে এক কোণে অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে ওয়াসার পাম্প। মাঠের পশ্চিম পাশে কয়েকটি বড় খোলা ড্রেন।

নগরীর মাঠ-পার্কগুলো ব্যবহার উপযোগী না থাকায় শিশু-কিশোরদের মধ্যে ডিভাইস এবং যুবকদের মধ্যে মাদকাসক্তি বাড়ছে বলে মন্তব্য করেছেন সেফটি অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশনের (এসএএফ) সহসভাপতি স্থপতি ইকবাল হাবিব। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘শিশু-কিশোর, যুবক-বৃদ্ধ সবার জন্য মাঠ ও পার্কের সুবিধা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু সে দায়িত্ব থেকে তারা হাত গুটিয়ে নিয়েছে। ফলে আমাদের শিশু-কিশোর-যুবকরা খেলতে পারছে না। বয়স্করা হাঁটাচলা করার মতো জায়গা পাচ্ছে না। যে কারণে ঢাকায় শিশু থেকে বৃদ্ধ সব ধরনের মানুষের মধ্যে ডায়াবেটিক, হার্টের অসুখ, ওবেসিটি, ডিভাইস আসক্তি এবং মাদকাসক্তি ভয়ংকর রকম বেড়েছে। জনস্বাস্থ্য বিবেচনায় নিয়ে এবং সুস্থ্য নগরী নিশ্চিতের লক্ষ্যে মাঠ-পার্কগুলো দখলমুক্ত করে ব্যবহার উপযোগী করা জরুরি।’

মিরপুরের ৯ নম্বর ওয়ার্ডে গোলারটেক মাঠ। চার একর জায়গা নিয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সবচেয়ে বড় খেলার মাঠ এটি। এর এক অংশ জব্দকৃত গাড়ি দিয়ে দখলে করে রেখেছে দারুস সালাম থানা। স্থানীয়রা জানান, থানা গঠনের পর থেকেই বিভিন্ন সময়ে জব্দকৃত গাড়িগুলো এখানে এনে ফেলে রাখা হয়েছে। ট্রাক, বাস, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, মিনিবাস, প্রাইভেট কার, পিকআপ ভ্যান, লেগুনা, মোটরসাইকেল, রিকশা মিলিয়ে ৫০-৬০টির বেশি যানবাহন পড়ে আছে মাঠটিতে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আবদুস সালাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা মাঠ-পার্কগুলো নিয়ে কাজ করছি। মাঠগুলোর তালিকা ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছি। পার্কগুলোও দখলমুক্ত করার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। আর কিছু পার্ক বন্ধ আছে, কারণ সেখানে উন্নয়ন কার্যক্রম চলমান।’