জামালপুরে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও শিক্ষক-কর্মচারী থাকলেও বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নেই কোনো শিক্ষার্থী। তবে শিক্ষার্থী না থাকলেও মাসের শেষে নিয়মিত সরকারি কোষাগার থেকে বেতন-ভাতা তুলছেন শিক্ষকরা। কাগজে-কলমে শত শত শিক্ষার্থী দেখিয়ে সরকারি অর্থ অপচয়ের এমন চিত্র জেলার কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে।
সরজমিনে জেলা শহর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে বীর গোবিন্দবাড়ি এলাকার শামসুন্নাহার মোহাম্মদিয়া মহিলা দাখিল মাদ্রাসায় প্রবেশ করতেই দেখা মেলে এক নজিরবিহীন চাতুর্যের। গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতি টের পেয়েই তড়িঘড়ি করে ক্লাসরুমে ছুটে যান শিক্ষকেরা এবং পাঠদান শুরু করেন। অথচ তখনো প্রতিষ্ঠানটির বেশ কয়েকটি কক্ষ তালাবদ্ধ অবস্থায় ছিল।
মাদ্রাসার ষষ্ঠ শ্রেণিতে গিয়ে দেখা যায়, মাত্র একজন শিক্ষার্থীকে পড়াচ্ছেন এক শিক্ষক। পাশের আরেকটি কক্ষে একটি বেঞ্চে মোট তিনজন শিক্ষার্থী বসে অঙ্ক করছে। নবম ও দশম শ্রেণির অবস্থাও একই রকম; দুজন ছাত্রীকে পড়াচ্ছেন মৌলভি। বাইরে বিশাল একটি সীমানা প্রাচীর ও দৃষ্টিনন্দন প্রবেশদ্বার থাকলেও ভেতরের শ্রেণিকক্ষগুলোর অবস্থা জরাজীর্ণ। কোনো ক্লাসেই জানালা নেই, কোথাও আবার ভাঙা দরজা।
এই মাদ্রাসায় সরকারি বেতনভুক্ত এমপিও শিক্ষক আছেন ১৪ জন। কিন্তু বাস্তবে প্রতিদিন যতজন শিক্ষার্থী উপস্থিত থাকে, তা শিক্ষকের সংখ্যার চেয়েও কম। অথচ নথিপত্রে এখানে ২৩৬ জন শিক্ষার্থী দেখানো হয়েছে। প্রতিদিন সব মিলিয়ে ক্লাসে উপস্থিত থাকে ১০ জনের মতো শিক্ষার্থী।
অনুপস্থিতির বিষয় স্বীকার করে শামসুন্নাহার মোহাম্মদিয়া মহিলা দাখিল মাদ্রাসার সুপার লুৎফর রহমান বলেন, সরকারিভাবে কোনো ভবন না পাওয়ায় শিক্ষার্থীরা ঠিকমতো আসে না। জরাজীর্ণ টিনের ঘর, বৃষ্টি হলেই ওপর থেকে পানি পড়ে। এসব অজুহাতে ছাত্রীরা অনুপস্থিত থাকে। তবে কোনো কোনো দিন উপস্থিতি ভালোই থাকে।

এমপিওভুক্ত এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চেয়ে নন-এমপিও কিছু প্রতিষ্ঠানের দৃশ্যপট আরও উদ্বেগজনক। জামালপুর শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে উপজেলার শাহবাজপুরের উত্তর কৈডোলা স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসায় গিয়ে দেখা যায় আরও করুণ চিত্র। দূর থেকে দেখলে মনে হবে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত বা দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত কোনো ঘর। জরাজীর্ণ টিনের ঘরে নেই কোনো আসবাবপত্র বা ব্ল্যাকবোর্ড, নেই কোনো পাঠদান কার্যক্রম। অথচ সরকারি নথিপত্রে এই মাদ্রাসায় শতাধিক শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত দেখানো হয়েছে। এই ভুয়া শিক্ষার্থী সংখ্যার ওপর ভিত্তি করেই প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে এমপিওভুক্তির (মাসিক পেমেন্ট অর্ডার) জন্য আবেদন জানিয়েছে।
অনুরূপ চিত্র দেখা গেছে সদর উপজেলার তুলশীপুর ডিগ্রি কলেজেও। সেখানে কাগজে-কলমে সাত শতাধিক শিক্ষার্থী রয়েছেন। এই বিপুল পরিমাণ শিক্ষার্থীর বিপরীতে সরকারি বেতনভুক্ত শিক্ষক আছেন প্রায় অর্ধশত। কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, তদারকির অভাবে বছরের বেশির ভাগ সময় ক্লাস না হয়ে কলেজটি বন্ধই থাকে।
স্থানীয় বাসিন্দা রুকন বলেন, সকাল সাড়ে ১০টায় কলেজ শুরু হওয়ার নিয়ম থাকলেও শিক্ষকেরা আসেন বেলা সাড়ে ১১টা বা দুপুর ১২টার দিকে। দপ্তরি প্রতিদিন এসে তালা খোলেন আর বন্ধ করেন। কোনো ছাত্র-ছাত্রী আসেন না। শিক্ষকেরাও নিয়মিত আসেন না, একেক দিন একেকজন এসে হাজিরা খাতায় সই করে চলে যান।

কলেজ সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা রহমত আলী বলেন, দিনের পর দিন এই কলেজে কোনো পড়াশোনা হয় না। সরকার প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা শিক্ষকদের বেতন দিচ্ছে, অথচ তারা হাজিরা খাতায় সই করা ছাড়া আর কোনো কাজ করেন না। মাঝেমধ্যে দু-চারজন ছাত্র আসলেও ক্লাস না থাকায় ফিরে যায়। এটি মূলত একটি নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
তুলশীপুর ডিগ্রি কলেজের সহকারী শিক্ষক আনোয়ার হোসেন মোবাইল ফোনে বলেন, ‘এখন কাজের সময়, আমাদের গ্রামাঞ্চল তো, কামলার ময়না ১৩০০-১৪০০ টাকা করে। এমনি যখন কাজ না থাকবো, তখন ছাত্র আসবো।’
আর শাহবাজপুরের উত্তর কৈডোলা স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসায় গিয়ে কোনো শিক্ষককেই পাওয়া যায়নি। সাইনবোর্ডে দেওয়া ফোন নাম্বারে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কাউকে পাওয়া যায়নি।
মানবাধিকারকর্মী জাহাঙ্গীর সেলিম এই পরিস্থিতিকে শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর আখ্যা দিয়ে বলেন, শিক্ষা বিভাগ থেকে যেভাবে নিয়মিত পরিদর্শন ও নিবিড় পর্যবেক্ষণ করার কথা ছিল, তা হচ্ছে না। প্রশাসনের উচিত অবিলম্বে এই ছাত্রশূন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা তৈরি করে আল্টিমেটাম দেওয়া। তারা যদি সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী প্রতিষ্ঠান চালাতে ব্যর্থ হয়, তবে দ্রুত তাদের এমপিও বাতিল করা উচিত।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) জামালপুর জেলা শাখার সহসভাপতি মো. ইউসূফ আলী বলেন, শিক্ষকেরা যদি প্রতিদিন নিয়ম মেনে বিদ্যালয়ে যেতেন এবং শিক্ষার্থীদের ধরে রাখার চেষ্টা করতেন, তবে অবশ্যই শিক্ষার মান উন্নয়ন হতো। সরকারি টাকা নিয়ে ঘরে বসে থাকার এই সংস্কৃতি বন্ধ করতে সরকারকে কঠোর হতে হবে এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে কড়া জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে জামালপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক ও শিক্ষা) আফসানা তাসলিম এশিয়া পোস্টকে বলেন, কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী সংখ্যা কম থাকা সত্ত্বেও কাগজে-কলমে বেশি উপস্থিতি দেখানোর মতো সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ যদি কেউ আমাদের কাছে করেন, আমরা তাৎক্ষণিকভাবে তদন্ত কমিটি গঠন করব। তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে।