আইনের খসড়া কেমন হবে তা নিয়ে এখনো একটি লাইনও লেখা হয়নি। অথচ তার আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম আর বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলোকে নিয়ন্ত্রণের সরকারি উদ্যোগ নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। তবে বিতর্কটা আইন নিয়ে নয়, শুরু হয়েছে আইন যারা তৈরি করছেন তাদের নিয়ে।
ডিজিটাল দুনিয়া নিয়ন্ত্রণে নতুন আইনি কাঠামো তৈরি করতে সরকার ১১ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে। এই কমিটিতে সরকারের উচ্চপদস্থ আমলা আর আইনজীবী থাকলেও কোনো সাংবাদিক কিংবা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা কোনো সংস্থার প্রতিনিধিকে রাখা হয়নি।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দাবি, ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা বিভিন্ন অনলাইন পোর্টাল আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আইডি থেকে যে গুজব ও ভুল তথ্য ছড়ানো হচ্ছে, তা ঠেকানোর জন্যই এই আইন করা দরকার।
এই খসড়া কমিটির অন্যতম সদস্য তাসনুভা শেলী ‘টাইমস অব বাংলাদেশ’কে বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে জালিয়াতি, কেলেঙ্কারি আর অপপ্রচার—সবই হচ্ছে। এখন ফেসবুক-ইউটিউব ছাড়া তো আমাদের চলা সম্ভব নয়। তাই আমাদের দেখতে হবে কীভাবে এটি দায়িত্বশীলতার সাথে ব্যবহার করা যায়।’
তবে সমালোচকরা বলছেন, কমিটিতে সাংবাদিকদের না রাখাটা কোনো সাধারণ ভুল নয়, এটি ইচ্ছাকৃত। তাদের মতে, যারা প্রতিদিন নিউজরুম সামলান, সাংবাদিকতা বোঝেন এবং মুক্তভাবে মতপ্রকাশের বাস্তব চ্যালেঞ্জগুলো জানেন, তাদের বাদ দিয়ে যোগাযোগের ভবিষ্যৎ আইন তৈরি করা কোনোভাবেই ঠিক হচ্ছে না।
গত ২ জুলাই তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবকে প্রধান করে এই কমিটি গঠন করা হয়। তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনের সভাপতিত্বে প্রথম বৈঠকে কর্মকর্তারা বলেন, ডিজিটাল দুনিয়ার এই বিশাল বিস্তৃতির সঙ্গে তাল মেলাতে পুরোনো আইনগুলো বদলে নতুন আইন দরকার। বৈঠকে উপস্থিত কর্মকর্তারা জানান, মন্ত্রী কমিটিকে বিদেশের আইনগুলো দেখে বাংলাদেশের উপযোগী একটি কাঠামো তৈরি করতে বলেছেন।
সমালোচকদের মূল আপত্তি ঠিক এখানেই। কমিটিতে আছেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল, অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাটর্নি জেনারেল, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর এবং সরকারের বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ আমলা।
আইন ও প্রশাসনের দিক থেকে তারা দক্ষ হলেও, এই দলে এমন একজন মানুষও নেই যিনি মাঠপর্যায়ে খবর সংগ্রহ করেছেন, রিপোর্ট এডিট করেছেন কিংবা খবরের ভেতরের চাপ সামলেছেন। ফলে ডিজিটাল দুনিয়া সামলানোর বিষয়ে সরকারের এই উদ্যোগকে গণমাধ্যম কর্মীরা সহজভাবে নিতে পারছেন না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সাইফুল আলম চৌধুরী বলেন, ‘সাংবাদিকদের বাদ দিয়ে যখন গণমাধ্যমের আইন তৈরি করা হয়, তখন তা সাধারণত সাংবাদিকতা রক্ষার চেয়ে সরকারের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর হাতিয়ারে পরিণত হয়।’
আইন বদলানোর দরকার আছে মেনে নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘আমলারা মিলে যে আইন তৈরি করবেন তা কি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করবে, নাকি উল্টো তা কেড়ে নেবে?’
বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সাবেক সভাপতি এম আবদুল্লাহ বলেন, ‘সাংবাদিকতা সংক্রান্ত যেকোনো আইনের সবচেয়ে বড় অংশীদার হলেন সাংবাদিকরা। তাদের বাদ দিয়ে কিছু করার চেষ্টা করা হলে সাংবাদিক সমাজ তা মেনে নেবে না।’
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন জানান, তিনি সংসদে আছেন এবং পরে কথা বলবেন।
এমনকি কমিটির প্রধান, অতিরিক্ত সচিব মো. শাহ আলম নিজেও কমিটির গঠন নিয়ে স্পষ্ট কিছু বলতে পারেননি। তিনি বলেন, ‘মূল কমিটিতে কেন কোনো সাংবাদিক নেই, তা আমার জানা নেই।’ তবে তিনি দাবি করেন, পরে সাংবাদিক সংগঠনসহ আরও শত শত মানুষের মতামত নেওয়া হবে। আইনটি গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় বাধা দেবে কি না জানতে চাইলে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।
কমিটির সদস্য তাসনুভা শেলী বলেন, ‘ফেসবুকের মাতৃপ্রতিষ্ঠান মেটার মতো বিদেশি বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে বোঝাপড়া করতে গিয়ে বাংলাদেশকে বেশ সমস্যায় পড়তে হয়। কারণ, তাদের জবাবদিহি করার মতো শক্তিশালী আইনি ব্যবস্থা আমাদের দেশে নেই।’
তবে এই আইন শুধু বিদেশি কোম্পানির জন্য নয়; দেশি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলোকেও এই আইনের আওতায় আনা হবে বলে জানান তাসনুভা শেলী। আর এতেই গণমাধ্যম কর্মীদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
কমিটিতে সাংবাদিকদের কেন রাখা হয়নি—এমন প্রশ্নের জবাবে তাসনুভা শেলী জানান, আইন চূড়ান্ত করার আগে সরকারি-বেসরকারি সবার সাথেই আলোচনা করা হবে।
কিন্তু সমালোচকরা এই আশ্বাসে ভরসা পাচ্ছেন না। তাদের স্পষ্ট কথা—আইনের মূল খসড়া তৈরি হয়ে যাওয়ার পর আলোচনা করা আর খসড়া তৈরির টেবিলে শুরু থেকে থাকা, দুটো কখনো এক বিষয় নয়।
যমুনা টেলিভিশনের সিনিয়র রিপোর্টার শাকিল হাসান বলেন, সাধারণ মানুষের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কর্মকাণ্ড আর পেশাদার সাংবাদিকতাকে এক পাল্লায় মাপা ঠিক হবে না। দুটোকে একসঙ্গে মেলালে স্বাধীন সাংবাদিকতা বাধাগ্রস্ত হবে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘ভয় আর অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকলে সাংবাদিকরা স্বাধীনভাবে সত্য তুলে ধরতে পারেন না।’