দীর্ঘদিন ধরে দলীয় রাজনীতি ও সাংগঠনিক ব্যস্ততায় সময় পার করছে জামায়াত ১১ দলীয় জোটের নেতারা। রাজপথে সক্রিয় হওয়ার চিন্তা করছে বিরোধীরা। এই লক্ষ্যে আগামী অক্টোবর-নভেম্বরের দিকে ঢাকায় বড় গণজমায়েত করার চিন্তাও করছে তারা। ১১ দলীয় জোটের রাজনীতিতে বর্তমানে আলোচনায় রয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টির তৃণমূল ও স্থানীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে একক প্রস্তুতির বিষয়টি। জামায়াতের পক্ষ থেকে এককভাবে স্থানীয় নির্বাচনের জন্য দলগুলোকে প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে। তবে শেষ সময়ে কিছুটা পরিবর্তনের আভাসও দেয়া হয়েছে। সেই লক্ষ্যে এখন কার্যালয়ভিত্তিক আলোচনা ও কর্মসূচির বাইরে রাজপথে সক্রিয় হওয়ার চিন্তা করছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
দীর্ঘদিন ধরে সভা-সেমিনার ও ১১ দলীয় ঐক্যের কর্মসূচির ভেতরেই কার্যক্রম চলছে দলটির। ঈদুল আজহার পর মাঠমুখী কর্মসূচির মাধ্যমে সরাসরি জনসংযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পটভূমিতে গড়ে ওঠা এই রাজনৈতিক দল। এ ছাড়াও ১১ দলীয় জোটের হয়ে বিভিন্ন জেলা উপজেলা ও বিভাগীয় শহরগুলোর মিটিং মিছিলে অংশ নিচ্ছেন দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন জায়গায় চলমান রয়েছে ১১ দলীয় ঐক্যের কর্মসূচি। দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা বলছেন, এখন তাদের লক্ষ্য শুধু সংস্কার বা বিচার ইস্যুতে সীমাবদ্ধ থাকা নয়। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জ্বালানি সংকট, নাগরিক সেবা, শ্রমিক ও পেশাজীবী মানুষের অধিকারসহ জনজীবনের নানা সংকটকে সামনে এনে রাজপথে সক্রিয় হওয়ার চিন্তা নিয়ে এগুচ্ছে তারা। এর মাধ্যমে জনগণের কাছে নিজেদের বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
এদিকে, বিভাগীয় শহরগুলোতে কর্মসূচি দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। সেসব কর্মসূচি বাস্তবায়নে কেন্দ্র থেকে নেতাকর্মীরা যাচ্ছেনও। কর্মসূচির মধ্যে গত ১৬ই মে রাজশাহী জনসভা হয়েছে। এ ছাড়াও ১৩ই জুন চট্টগ্রামে, ২০শে জুন খুলনায়, ২৭শে জুন ময়মনসিংহে, ১১ই জুলাই রংপুরে, ১৮ই জুলাই বরিশালে এবং ২৫শে জুলাই সিলেটে বিভাগীয় সমাবেশ হবে। এসব সমাবেশে সিটি করপোরেশন, বিভাগীয় শহর ও জেলাকে সম্পৃক্ত করা হবে। ১১ দলীয় ঐক্যের কর্মসূচির বাইরে দলগুলো দলীয় ব্যানারে মতবিনিময়, সেমিনার, বিক্ষোভ, সমাবেশসহ আলাদা কর্মসূচি পালন করছে। জামায়াত-এনসিপি আলোচনায় থাকলেও স্থানীয় নির্বাচন ঘিরে আলোচনায় নেই ১১ দলীয় ঐক্যের অন্য দলগুলোর।
জামায়াতের দলীয় সূত্র জানায়, সংবিধান ও রাজনৈতিক সংস্কার-সংক্রান্ত আলোচনাতে সক্রিয় ভূমিকা রাখার চিন্তা রয়েছে দলটির। অর্থনৈতিক চাপ ও জনজীবনের সংকট নিয়ে জনগণের উদ্বেগ বাড়ছে। তাই এসব ইস্যুতে তারা ধারাবাহিক অবস্থান নিতে চান রাজপথে।
এ ছাড়া রাজপথের কর্মসূচিকে জোরালো করতেও বেশ কিছু পরিকল্পনা করছে জামায়াত। পরিকল্পনা অনুযায়ী জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ পরিবারকে জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে সক্রিয় করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আদর্শিক মিল না থাকলেও গণ-অভ্যুত্থান ও সংস্কার বিষয়ে নীতিগতভাবে জামায়াতের সঙ্গে একমত- এমন অনেক দলের সঙ্গেই তাদের যোগাযোগ রয়েছে। তবে তারা এখনই ১১ দলের সঙ্গে যুক্ত হবে না, নিজেদের মতো করে কর্মসূচি পালন করবে। প্রধান বিরোধী দল হওয়ার পর জামায়াত ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের ঘোষণা দিয়েছিল। সেই মন্ত্রিসভা গঠনের কাজ শেষ করে দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের অনুমোদন নেয়া হয়েছে। এখন শীর্ষ নেতৃত্বের প্রস্তাব অনুযায়ী কিছু প্রস্তুতিমূলক কাজ চলছে বলে সূত্র জানিয়েছে। সংসদে সরব থাকা, রাজপথে চাপ তৈরি করা এবং ছায়া মন্ত্রিসভার মাধ্যমে নিজেদের বিকল্প অবস্থান তুলে ধরা।
এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামও সম্প্রতি যুবসংগঠন জাতীয় যুবশক্তির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে একই বার্তা দিয়েছেন। তিনি নেতাকর্মীদের ‘ইনডোর’ কর্মসূচির গণ্ডি থেকে বের হয়ে ঈদের পর মাঠে আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে সাংগঠনিক বিস্তারেও মনোযোগ দিয়েছে এনসিপি। দলীয় সূত্র জানায়, বিভিন্ন পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের দলে টানার উদ্যোগ চলছে। ইতিমধ্যে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত নেতা ইসহাক সরকার এবং জামায়াতের সাবেক আমীর মতিউর রহমান নিজামীর ছেলে মোহাম্মদ নাদিমুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে দলে যোগ দিয়েছেন।
দলের ভেতরে আলোচনা রয়েছে, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পর যেসব নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ নেই, তাদের মধ্য থেকেও সাংগঠনিকভাবে দক্ষ ব্যক্তিদের দলে নেয়া হতে পারে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তাদের প্রার্থী করার বিষয়েও ভাবছে দলটি। তবে স্থানীয় নির্বাচন ঘিরে এনসিপি’র সামনে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের ভবিষ্যৎ। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জোটগতভাবে অংশ নিলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এককভাবে এগোনোর প্রস্তুতি নিচ্ছে দলটি।
সংবিধান সংস্কার প্রশ্নেও এনসিপি নিজেদের স্বতন্ত্র অবস্থান তুলে ধরছে। সরকার ঘোষিত সংসদীয় সংবিধান সংশোধন কমিটিতে যোগ দেয়ার বিষয়ে দলটি আগ্রহী নয়। এনসিপি’র অবস্থান হলো শুধু সংশোধন নয়, গণভোটের রায়ের ভিত্তিতে একটি পূর্ণাঙ্গ সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে।
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, জুলাই সনদের ভিত্তিতে রাষ্ট্র সংস্কার না হলে সংসদ ও রাজপথে আন্দোলনে নামবে। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সংস্কারের প্রশ্নে দ্বিধা ও সংকটে রয়েছে। আগে তারা রাষ্ট্র সংস্কার, গণভোট ও পুনর্গঠনের কথা বললেও এখন সেই অবস্থান থেকে সরে যাচ্ছে। আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ না হলে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে। জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে না পারলে সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠবে।
এসব বিষয়ে এনসিপি’র মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া মানবজমিনকে বলেন, প্রতিদিনই ঢাকা এবং ঢাকার বাইরের মানুষ এনসিপিতে যোগ দিচ্ছেন। তৃণমূল গোছানোর কাজও জোরেশোরেই চলছে।
তিনি বলেন, সংস্কার বাস্তবায়নে ১১ দলীয় ঐক্য হয়েছিল জাতীয় নির্বাচনের আগমুহূর্তে, সেটি এখনো অটুট রয়েছে। বিভাগীয় সমাবেশগুলো হচ্ছে সব দলের নেতাকর্মীরা অংশ নিচ্ছেন। একইসঙ্গে এই জোটের প্রতিটি দলের মতো এনসিপিও সংস্কার এবং মানুষের দৈনন্দিন সংকটগুলো নিয়ে সভা-সেমিনারসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে। আমাদের ছায়া বাজেট কমিটি যেমন জনগণের স্বার্থ প্রাধান্য দিয়ে কেমন বাজেট প্রয়োজন তা নিয়ে কাজ করছে, সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটিও ব্যাপকভাবে কাজ করছে। এতে ১১ দলীয় ঐক্যে কোনো প্রভাব পড়ছে না বরং এই জোটের গণমুখী রাজনীতি মানুষের কাছে আরও গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে দিন দিন।