Image description

আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনা ছয় মাসের মধ্যে ফিরবে বলে মিডিয়া ও স্যোশাল মিডিয়ায় যে হাইপ তৈরি হয়েছে- তা থেকে দূরে থাকতে পারলাম না। দলটির এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ফেরার ৮টি পথ পেলাম। সেগুলোর সম্ভাব্যতা নিয়েও বলিছ। (আপনার যদি মনে হয় আরও কোনো পথ আছে যোগ করে দেবেন।)

১. শেখ হাসিনা নিজে থেকেই ফিরবেন। দেশে এসে আদালতে আত্মসমর্পন করে কারাগারে গিয়ে আইনী লড়াই চালাবেন।

২. ভারত বাংলাদেশে কোনো সামরিক অভিযান চালিয়ে আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় পুনর্বহাল করবে।

৩ . বাংলাদেশে কখনও ক্যু হলে আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনাকে রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ দেবে।

৪. অভ্যুত্থান বা কমপক্ষে গণবিক্ষোভে বর্তমান সরকারের পতনে আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনা রাজনীতিতে ফিরবেন।

৫. দায়ী নেতাদের বিচার এবং জুলাইকে মেনে নিয়ে সরি বলে আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে ফিরে আসবে।

৬. নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ আদালতে যাবে। আইনী প্রক্রিয়ায় বা প্রক্রিয়া শেষ রাজনীতিতে ফিরে আসবে।

৭. অন্যান্য দেশে যেমন একটি দল নিষিদ্ধ হলে, অন্য নামে বা অন্য দলের মার্জ হয়ে রাজনীতি করেন। আওয়ামী লীগও তেমন করবে। সেই দল ক্ষমতায় এলে, আওয়ামী লীগ নিজ নামে ফিরবে।

৮. কোনো পরাশক্তি ফিরিয়ে আনবে।

এবার এগুলোর সম্ভাব্যতা দেখি

১. শেখ হাসিনা নিজে থেকে ফিরবেন এই সম্ভাবনা শূন্য। দেশের প্রধান দুই নেত্রীর সবকিছুর উর্ধ্বে- তাই এই জেন্টালম্যান এগ্রিমেন্ট শেষ হয়ে গেছে খালেদা জিয়াকে জেলে পাঠানোর মাধ্যমে। ফলে দেশে ফিরলে, শেখ হাসিনাকে অবশ্যই কারাগারে যেতে হবে। বিএনপি এই জায়গায় সামান্য ছাড় দেবে না। রায়ও কার্যকর করবে।

এই বাস্তবতা শেখ হাসিনাও বোঝেন। তাই তিনি ফিরবেন না। আর ফিরলে, ছয় মাসের তারিখ দেওয়ার কিছু নেই। চাইলে তিনি এখনই ফিরতে পারেন।

২. বাংলাদেশে সামরিক হস্তক্ষেপ করে ভারত আওয়ামী লীগকে ফিরিয়ে আনবে, এই সম্ভাবনা বা আশঙ্কা জিরো। ভারতের জন্য ইউনূস সরকার ছিল ব্ল্যাকহোল। 'আপদ' বিদায় হয়েছে, এটাই তাদের জন্য স্বস্তির। ভারতের নাকের নীচে একটি বিরুদ্ধ সরকারের আসা এবং টিকে থাকা ছিল, দুনিয়ার সামনে দিল্লীর কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যর্থতার সার্টিফিকেট।

ইউনূস সরকার বিদায়ে ভারত তা থেকে মুক্তি পেয়েছে। তাই তাদের আচরণেও তাই পরিবর্তন এসেছে। ইউনূস আমলে ভারত ইনক্লুসিভ নির্বাচনের কথা বললেও, সেই জায়গায় তারা আর নেই। এর উদাহরণ হলো, খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক জানাতে পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে পাঠানো। তারেক রহমানকে নির্বাচনের পরেরদিনই মোদীর শুভেচ্ছা জানিয়ে ফোন করা এবং শপথ অনুষ্ঠানে স্পিকারকে পাঠানো।

নির্বাচনের পর বাংলাদেশ নিয়ে আর কথা বলছে না ভারত। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের অধ্যাদেশ আইনে পরিণত করার পর, ভারতের প্রতিক্রিয়া ছিল সাদামাটা। নিজে থেকে কিছু বলেনি। সাংবাদিকদের প্রশ্নে গত ২৩ এপ্রিল প্রথম ও শেষবারের মত ভারত বলে, তারা বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে।

কূটনীতিতে 'পর্যবেক্ষণ করছি'- মানে কিছুই করছি না। ইদানিং ভারত আবার অর্থনৈতিক চাপে পড়েছে। কৃচ্ছতার মুডে আছে। ডলারের দাম ইতিহাসের রেকর্ড ১০০ রুপি ছুঁইছুঁই। ভারতের এখন ডলার ভীষণ দরকার। বাংলাদেশ থেকে বছরে ১৮-২০ বিলিয়ন ডলার পেতো। এটা আবার চালু করতে ভারত ঢাকার নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করতে আকুপাকু করছে। সুতরাং বাংলাদেশে কিছু করার আশঙ্কা জিরো।
৩. কোনো সামারিক কর্মকর্তা ক্ষমতা দখল করলে, তার একটা রাজনৈতিক সমর্থন লাগে। ধরুন, বাংলাদেশে যদি এমন কিছু ঘটল বর্তমান ব্যবস্থার বিরুদ্ধে, তাহলে মাঠে থাকা বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি সমর্থন করবে না। তখনই সুযোগ আসবে আওয়ামী লীগের।

কিন্তু বাংলাদেশে ক্যু ঘটার সম্ভাবনা আশঙ্কা বিগ জিরো। জুলাইয়ের সমর্থনে এবং পরবর্তী সময়ে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য যে ভূমিকা, তাতে ক্লিয়ার সেনাবাহিনী গণতান্ত্রিক ধারার বাইরে যাবে না।
কারণ, তারা ক্ষমতা দখল করতে চাইলে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই থেকে ৪ আগস্টের মধ্যে যে কোনো সময় করতে পারত। মানুষ রাস্তায় নেমে স্বাগত জানাত। জুলাইয়ে মানুষের সেই দাবিও ছিল। তখনই যেহেতু হয়নি, ভবিষ্যতে আর হবে না, হবে না, হবে না।

৪. বর্তমান সরকার ও ব্যবস্থা যদি চরমভাবে ব্যর্থ হয়, অর্থনীতি ভেঙে পড়ে, জনগণের মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়, গুম-বিচার বহির্ভূত হত্যা হয়, ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়; তাহলে মানুষ আবার রাস্তায় নামতে পারে কয়েক বছরের মধ্যে। তেমনটা ঘটলে, আওয়ামী লীগের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে ফেরার।
তবে মনে হচ্ছে না, সরকার ও বর্তমান ব্যবস্থা চরমভাবে ব্যর্থ হবে। সরকারের অনেক কিছুতে ঘাটতি আছে কিন্তু গুম-বিচার বহির্ভূত হত্যা, ভোটাধিকার কেড়ে নেবে; এমন লক্ষণ নেই।

বাকি থাকল, অর্থনীতি। বাংলাদেশের সুবিধা হলো, এই দেশে সম্পদ তৈরি হয়। ফুড সিকিউরিটি ভালো। ফলে কিছু দুর্নীতি হলেও, আর্থিক ও ব্যাংকিং খাতে যদি লুটপাট না হয়, তাহলে অর্থনৈতিক ধ্বসের আশঙ্কা নেই। (তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ৯ মাত্রার ভূমিকম্প বা মহাপ্লাবন হয়ে গেলে অন্য কথা।)

অর্থনীতি না ভাঙলে হবে না। মানুষের ওপর ম্যাসিভ দমনপীড়ন না হলে গণবিক্ষোভও হবে না। তবে সাধারণ মানুষকে যদি আওয়ামী লীগ ট্যাগ দিয়ে চরম নির্যাতন করা হয়, তাহলেও গণবিক্ষোভ তৈরি হতে পারে। বর্তমান সরকার তা করবে, এমন ইঙ্গিত নেই। বরং সরকারি দলের চেয়ে আওয়ামী বিরোধিতা বেশি দেখাচ্ছে জামায়াত-এনসিপি। তবে বিরোধীদলের বিরুদ্ধে দুনিয়াতে অভ্যুত্থানের নজির নেই।

৫. জুলাই ও দায়ী নেতাদের বিচার মেনে সরি বলে আওয়ামী লীগ ফিরবে না, যতক্ষণ শেখ হাসিনা নেতৃত্বে রয়েছেন। তিনি সরি বলার লোক নন। এ বিষয়ে ভারতের পরামর্শই তিনি নেননি। তবে এই পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা হচ্ছে, আওয়ামী লীগ ফিরতে পারলেও, শেখ হাসিনা পারবেন না। উনাকে ফিরতে হলে, ফিরে আসা আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে এই মেথডে।

৬. নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের আদালতে যাওয়া সহজ পথ। টাও শেখ হাসিনা নেতৃত্বে থাকাবস্থায় অসম্ভব। আবার আদালতে গেলেও লম্বা পথ। আদালত যদি আওয়ামী লীগকে জুলাইয়ের জন্য দুই বছরের জন্যও ব্যান করে, তাহলে মামলা এবং সেই সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

৭. অন্য নামে বা অন্য দলে মিশে আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে ফিরবে না, ৫ এবং ৬ নম্বরের পয়েন্টে উল্লেখ করা কারণের কারণেই। আবার সেই দল কবে, ক্ষমতায় আসবে, সেই নিশ্চয়তাও নেই।

৮. কোনো পরাশক্তি ফিরিয়ে আনবে, এই সম্ভাবনা জিরো। কারণ, দুনিয়া কোল্ড ওয়ার এবং ওয়ার অ্যাগেইস্ট টেরোরিজমের যুগে নাই। কোল্ড ওয়ার যুগে হয় কোনো দেশের সরকারকে আমেরিকার পক্ষে থাকতে হতো, নয়ত সোভিয়েত রাশিয়ার পক্ষে। মাঝামাঝি থাকা মুশকিল। ফলে দুই পরাশক্তি নানা দেশে পছন্দের সরকার বসাত এবং অপছন্দের সরকারকে সরাত। বুশ জামানার ওয়ার অ্যাগেইস্ট টেরোরিজমও তাই ছিল। বুশের পক্ষে না থাকাই ছিল বিপক্ষে থাকা।

এই সব যুগ চলে গেছে, এখন হল বিনিময়ের যুগ। কে কাকে কী দিবে, এর ওপর সম্পর্ক নির্ভর করে। আর উদীয়মান পরাশক্তি চীনের দরকার ব্যবসা। দেখেন না, শেখ হাসিনার পক্ষে স্তুতি করা চীন ৬ আগস্ট সকাল বেলা বিএনপি ও জামায়াতের অফিসে চলে গেছে ফুল নিয়ে।

শেষ কথা

আওয়ামী লীগকে নিজে থেকে ফিরতে হলে, একটা গণঅভ্যুত্থান ঘটাতে হবে। অভ্যুত্থান করা 'কঠিন' কাজ না। গ্রাম, জেলায় না, ঢাকা শহরে মাত্র ৪০-৫০ লাখ 'মাত্র' নারী, শিশুসহ সাধারণ মানুষকে নামাতে হবে। তবে এই পর্যায়ে যাওয়ার সরকারকে চরম স্বৈরাচার হতে হবে এবং জনগণের ধৈর্য্যের শেষ সীমা ভেঙে যেতে হবে। তখন কারো ডাকে নেমে আসলেই অভ্যুত্থান হয়ে যায়। এ কারণেই অভ্যুত্থান বছর বছর হয় না। যুগের পর যুগ লাগে।

আওয়ামী লীগ এটা শিগগির পারবে- এমন সম্ভাবনা নেই। আর বাংলাদেশে দলগুলোর লাখ লাখ নেতাকর্মী সারাদেশে থাকলেও, তা ঢাকায় আনা সম্ভব না। সরকার আগেই মাজা ভেঙে দেয়। অতীতেও কোনো দল পারেনি। উপায় হল রাজধানীর সাধারণ মানুষকে রাস্তায় নামানো। যারা দুই বছর আগে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে নেমেছিল, তারা সেই দলের ডাকে নামবে- এই সম্ভাবনা দেখি না।

তাই সবচেয়ে সহজ পথ হলো, দায়ী ব্যক্তিদের ঝেড়ে ফেলে জুলাইয়ের বিষয়ে সরি বলে মিটমাট করে ফেলা। অথবা ৭ নম্বর পথ ট্রাই করতে পারে।

ছয় মাসের মধ্যে আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনা ফিরবে বলে যে আলাপ দেওয়া হচ্ছে, এর কোনো বাস্তবতা দেখছি না। আবার যারা ছয় মাসে ফেরার কথা বলছিলেন, তাদের অধিকাংশই বলতেন এই দেশে নির্বাচন হবে না। যা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। ফলে আওয়ামী লীগ ফেরা সংক্রান্ত তাদের বিশ্লেষণ গ্রহণ করতে পারছি না। দুঃখিত।

-রাজিব আহম্মেদ, সাংবাদিক