নগরের বুকেই যেন এক আলাদা ‘সন্ত্রাসী রাজ্য’ জঙ্গল সলিমপুর! আর সেই অন্ধকার সাম্রাজ্যের আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে এবার সরাসরি রাষ্ট্রের যৌথ বাহিনীর ওপর রাতের আঁধারে নজিরবিহীন তাণ্ডব চালিয়েছে চট্টগ্রামের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা। এলএমজির মতো ভারী আগ্নেয়াস্ত্রের মুহুর্মুহু গুলি ছুড়ে এবং বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অস্থায়ী ক্যাম্প। গুলি ও বোমার শব্দে প্রকম্পিত হতে থাকে সলিমপুর। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যেন সেখানে অভিযান চালাতে না পারে, সে কারণে পূর্বপরিকল্পিতভাবে যাতায়াতের রাস্তা ও কালভার্ট তারা কেটে ফেলে। গত রবিবার গভীর রাতে চট্টগ্রামের কুখ্যাত জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে দুঃসাহসিক এ হামলার ঘটনার পর প্রশ্ন উঠেছে-শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে জঙ্গল সলিমপুর আর কতদূর?
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আড়াই মাস আগে প্রতিষ্ঠিত প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া এ দুঃসাহসিক হামলা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে জঙ্গল সলিমপুরে রাষ্ট্রের আইনের চেয়েও কতটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে অপরাধীদের নিজস্ব ‘সংবিধান’। র্যাব-৭ অধিনায়ক লে. কর্নেল হাফিজুর রহমান বলেন, সলিমপুরের সন্ত্রাসী বাহিনী ইয়াসিন গ্রুপের সদস্যরা পরিকল্পিতভাবে যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে হামলা চালিয়েছে। ক্যাম্পের সদস্যরা সাহসিকতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে। ইটপাটকেল ও ককটেল বিস্ফোরণে কয়েকজন সদস্য সামান্য আহত হয়েছেন। হামলায় সন্ত্রাসীরা এলএমজি সদৃশ অস্ত্র, দেশে তৈরি অস্ত্র, রাইফেল ও ককটেল ব্যবহার করেছে।’ চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় নতুন যে অস্থায়ী ক্যাম্প নির্মাণ করা হচ্ছিল, সেটিই ছিল হামলাকারীদের মূল লক্ষ্য। সেখানে যাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী স্থায়ীভাবে অবস্থান নিতে না পারে, সে উদ্দেশেই হামলা চালানো হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি পুরোপুরি প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
প্রশাসন ও স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগর এলাকার পাহাড়খেকো এবং শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নির্মূলে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে যৌথ বাহিনীর বিশেষ দল অবস্থান করছিল। দুর্গম পাহাড়ের ভিতরে একটি অস্থায়ী ক্যাম্প তৈরি করে তাদের কার্যক্রম চলছিল। রবিবার গভীর রাতে হঠাৎ করেই ২০০ থেকে ৩০০ জনের একটি সশস্ত্র দল ক্যাম্পটি ঘিরে ফেলে। তারা তিনটি ভাগে বিভক্ত হয়ে আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশি অস্ত্র নিয়ে ক্যাম্পের দিকে অগ্রসর হয়। পাহাড়ের ওপরের দিক থেকে সন্ত্রাসীরা প্রথমে বেশ কয়েকটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায় এবং এরপরই ক্যাম্প লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ শুরু করে। পাহারারত সদস্যরা তাৎক্ষণিকভাবে সতর্ক হয়ে পাল্টা গুলি চালান। শুরু হয় তুমুল বন্দুকযুদ্ধ। হামলায় সন্ত্রাসীরা এলএমজি ও রাইফেলসহ বিভিন্ন আধুনিক অস্ত্র ব্যবহার করে।
দুই পক্ষের মধ্যে কয়েকশ রাউন্ড গুলি বিনিময়ের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যেই বুলডোজার দিয়ে অস্থায়ী ক্যাম্পটি গুঁড়িয়ে দেয় সন্ত্রাসীরা। ভোর সাড়ে ৫টার দিকে অতিরিক্ত ফোর্স ঘটনাস্থলে পৌঁছালে সন্ত্রাসীরা টিকতে না পেরে গহিন জঙ্গলের দিকে পালিয়ে যায়। সন্ত্রাসীদের ছোড়া ইটপাটকেলে কয়েকজন আহত হন। পরে জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ অভিযান শুরু করে প্রশাসন। এ অভিযানে ২৫ জন সন্দেহভাজনকে আটক করা হয়েছে। তাদের যাচাইবাছাই শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বর্তমানে এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে এবং যৌথ বাহিনীর সদস্যরা সেখানে অবস্থান করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কামাল হোসেন নামে এক র্যাব কর্মকর্তার একাধিক ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে, যা সোমবার ভোরে আপলোড করা হয়। ভিডিওতে র্যাব কর্মকর্তা কামাল হোসেনকে বলতে শোনা যায়, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যাতে প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন স্থানে কালভার্ট ও রাস্তা কেটে দিয়েছে; যাতে আমাদের গাড়িগুলো ভিতরে প্রবেশ করতে না পারে। ওরা মনে করেছে ওদের কৌশলের কাছে আমরা পরাজিত হয়ে যাব। কিন্তু আমরা যে ওদের চেয়ে আরও বেশি কৌশলী, সেটা ওরা বুঝতে পারেনি।’
নগরের মধ্যে আলাদা রাজ্য : চট্টগ্রামের ‘অপরাধের দুর্ভেদ্য সাম্রাজ্য’ হিসেবে পরিচিত জঙ্গল সলিমপুর। সীতাকুণ্ড উপজেলার দুর্গম ৩ হাজার ১০০ একর পাহাড়ি এলাকাজুড়ে এই অপরাধ রাজ্যের অবস্থান। এলাকাটি নিয়ন্ত্রণ করে ছোট-বড় অন্তত ২০টি সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনী। এসব বাহিনীর নেতৃত্বে রয়েছেন- ইয়াসিন মিয়া, কাজী মশিউর রহমান, লাল বাদশা, ফারুক, গফুর মেম্বার ও গাজী সাদেক। ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর এই অপরাধ সাম্রাজ্যে নতুন করে যুক্ত হয়েছেন সীতাকুণ্ড বিএনপি নেতা রোকন উদ্দিন মেম্বার। তিনিও একটি বাহিনী গড়ে তোলেন। পরে রোকন বাহিনীর সঙ্গে কাজী মশিউর, গাজী সাদেক ও গোলাম গফুর বাহিনীর ঐক্য গড়ে ওঠে। কুখ্যাত সলিমপুরে সক্রিয় সন্ত্রাসী বাহিনীগুলো পুরো এলাকাকে বিভিন্ন ব্লকে বিভক্ত করে এ অপরাধ রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করে। সেখানে বসবাসরত প্রতিটি বাসিন্দাকে অপরাধী চক্রের দেওয়া বিশেষ ‘পরিচয়পত্র’ বহন করতে হয়, যা ওই এলাকায় প্রবেশের পাস হিসেবে গণ্য করা হয়।
জায়গা বেচাকেনা, ঘর তৈরি, ব্যবসাবাণিজ্য কিংবা জিয়াফত (মেজবান) করতে হলেও নিতে হয় এসব ‘রাজাদের’ বিশেষ অনুমতি। এমনকি প্রতিদিন সন্ধ্যায় নির্দিষ্ট এলাকায় বসে সন্ত্রাসীদের ‘আদালত’। সেখানে বাসিন্দাদের নানা তথাকথিত ‘অপরাধের’ বিচার করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, জঙ্গল সলিমপুরের প্রবেশপথে সন্ত্রাসীদের সশস্ত্র পাহারাদার নিযুক্ত থাকে। এ এলাকায় অভিযানে গিয়ে বারবার সন্ত্রাসী বাহিনীর হামলার মুখে পড়তে হয়েছে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের। চলতি বছরেই সন্ত্রাসীদের হামলায় র্যাব কর্মকর্তা মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত এবং তিন সদস্য আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এরপর গত ৯ মার্চ আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা যৌথ অভিযান চালিয়ে সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ নেন এবং সেখানে যৌথ বাহিনীর ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। এ এলাকায় সরকারের স্মার্ট হাব তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। সলিমপুরের কিছু অংশে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আড়াই মাসের মাথায় যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পকে লক্ষ করে হামলা চালাল সন্ত্রাসীরা। বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিল যৌথ বাহিনীর ক্যাম্প।