Image description
এ যেন সোনার ডিম পাড়া হাঁস

রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হয়, রাজপথের স্লোগান বদলায়; কিন্তু কাওরান বাজারের চাঁদাবাজি বদলায় না। শুধু টাকার অঙ্ক বাড়ে আর ক্যাশিয়ারের চেহারা পরিবর্তন হয়। কাওরান বাজার যেন অপরাধচক্রের ‘সোনার ডিম পাড়া হাঁস’। রাজধানীর সবচেয়ে বড় এই পাইকারি বাজারের চাঁদাবাজির ইতিহাস মূলত ঢাকার অপরাধজগৎ, রাজনীতি এবং অর্থনীতির এক সমান্তরাল দলিল। প্রায় চার দশক আগে এখানে যে চাঁদাবাজি শুরু হয়েছিল স্রেফ ‘লাঠিয়াল’ বাহিনীর পেশিশক্তির জোরে, ২০২৬ সালে এসে তা রূপ নিয়েছে একটি সুনিপুণ, প্রাতিষ্ঠানিক এবং প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধচক্রে। ৩০ বছর আগে নব্বইয়ের দশকের শুরুতে এখানে চাঁদার হার ছিল ট্রাকপ্রতি ২০ থেকে ৫০ টাকা। লাইনম্যানরা সেই টাকা তুলতেন মূলত ঝাড়ুদার বা রাতের পাহারাদারদের নাম করে। সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, এখন প্রতিদিন কয়েক কোটি টাকার চাঁদাবাজি হয়। বছরের পর বছর আলোচনায় রয়েছে এখানকার চাঁদাবাজি। বিষয়টি সোমবার ফের সামনে এসেছে সরকারি দল ও বিরোধী দলের দুই সংসদ-সদস্যের বাহাসে। এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, কাঁচা টাকার প্রভাবে স্থানীয় সংসদ-সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন নিজেই খুন হতে পারেন বলে যুগান্তরের কাছে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। চাঁদাবাজি বন্ধে তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলবেন বলেও জানিয়েছেন।

সোমবার রাজধানীতে আয়োজিত বাজেটবিষয়ক এক সেমিনারে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ-সদস্য (এমপি) সাইফুল আলম খান মিলন দাবি করেন, তার নির্বাচনি এলাকা ঢাকা-১২-এর অন্তর্ভুক্ত কাওরান বাজারে প্রতিদিন দুই থেকে তিন কোটি টাকার চাঁদাবাজি হয়। তিনি বলেন, যে সরকার পালিয়ে গেছে, আগে সেই সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই এই চাঁদাবাজিতে জড়িত ছিলেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন। বর্তমানেও সরকারি দল চাঁদাবাজি করছে। এ সময় বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য ও সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ-সদস্য মাহমুদা হাবীবা তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, ‘যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাদের নাম-পরিচয়সহ তালিকা নিয়ে আইনের আশ্রয় নেওয়া উচিত। টকশো বা গোলটেবিলে বসে অভিযোগ করলেই হবে না।’ জবাবে সাইফুল বলেন, সরকারি দলের লোকদের বিরুদ্ধে পুলিশ চাঁদাবাজির মামলা নেয় না।

রাজধানীর গুলশানে একটি হোটেলে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম আয়োজিত ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ : রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও নাগরিক প্রত্যাশা’ শীর্ষক প্রাক-বাজেট সংলাপে কাওরান বাজারে চাঁদাবাজি নিয়ে বিএনপি ও জামায়াতের এ দুই সংসদ-সদস্যের বক্তব্য মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়, যা মঙ্গলবারও ছিল টক অব দ্য কান্ট্রি।

এ বিষয়ে সংসদ-সদস্য মাহমুদা হাবীবা মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, চাঁদাবাজির মতো বিষয়ে কেবল মুখে না বলে আইনি পথে হাঁটা প্রয়োজন। দলীয় অবস্থান পরিষ্কার করে এই নেত্রী জানান, তাদের দল সব সময়ই চাঁদাবাজি ও অপরাধের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বজায় রেখেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দল থেকে অনেককে বহিষ্কার করার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, আমাদের দল কোনো দুষ্টু লোকদের আশ্রয় দেয় না। দল শক্তিশালী হলে কিছু সুযোগসন্ধানী মানুষ ঢোকার চেষ্টা করে, তবে দলীয় প্রধানের অবস্থান এ বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর। কোনো অপরাধ প্রমাণিত হলে দল থেকে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও নেওয়া হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, চাঁদাবাজির অভিযোগ নিয়ে দলীয় ফোরামে নিয়মিত আলোচনা করা হয়। এটি প্রতিরোধে সর্বাত্মক সাংগঠনিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। তিনি আরও বলেন, জাতীয় সংসদ-সদস্যের মর্যাদা অনেক উঁচুতে। তাকে কারও বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলতে হলে রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে গিয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ এবং আইনি প্রক্রিয়ার আশ্রয় নেওয়া উচিত। তারা যখন শুধু আলোচনার টেবিলে বা টকশোতে চাঁদাবাজির অভিযোগ করেন, তখন তা কেবলই রাজনৈতিক অজুহাতে রূপ নেয়।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জামায়াতের সংসদ-সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন যুগান্তরকে বলেন, কাওরান বাজারের চাঁদাবাজি অত্যন্ত সিরিয়াস পর্যায়ে চলে গেছে। সেখানে কাঁচা টাকা নিয়ে প্রতিনিয়ত মারামারি হচ্ছে। হচ্ছে খুনখারবিও। যেখানে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা মোসাব্বির খুন হয়েছেন, সেখানে আমাকেও খুন করা হতে পারে বলে আশঙ্কা করছি। তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদসহ একাধিক প্রভাবশালী মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছি। তারা আমাকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে বলেছেন। আমি শিগ্গিরই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলব। আশা করছি, সরকার চাঁদাবাজদের প্রশ্রয় দেবে না।

অনুসন্ধানে জানা যায়, কাওরান বাজারের চাঁদাবাজির টাকা একক কোনো পকেটে যায় না। এটি একটি চেইন অব কমান্ডের মাধ্যমে বণ্টন হয়। মাঠপর্যায়ের কালেকশনকারী বা লাইনম্যানরা পান মোট টাকার ৫ থেকে ১০ শতাংশ। একটি বড় অংশ পায় স্থানীয় ক্যাডাররা। ওপরের মহলকে খুশি রাখতে প্রতিমাসেই একটি বড় অঙ্কের ‘মাসোহারা’ চলে যায় নির্দিষ্ট গন্তব্যে। যখনই কোনো সরকার বা প্রশাসন কঠোর অবস্থান নেয়, চাঁদাবাজরা কিছুদিন ‘আন্ডারগ্রাউন্ডে’ চলে যায়। বাজার সাময়িকভাবে শান্ত মনে হয়। কিন্তু কয়েকদিন পর নতুন কোনো নামে, নতুন কোনো ব্যানারে আবার শুরু হয় একই খেলা। জানুয়ারিতে স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক নেতা আজিজুর রহমান ওরফে মুচ্ছাব্বির হত্যাকাণ্ডের পর কিছুদিন পরিস্থিতি স্বাভাবিক মনে হলেও ফের বেপরোয়া হয়ে ওঠে চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসীরা।

যুগান্তর অনুসন্ধান : কাওরান বাজারের বিভিন্ন সেক্টরের চাঁদাবাজ হিসাবে যাদের নাম বেরিয়ে এসছে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য-কাজী বাবু, ন্যাটা আজাদ, মজিদ মিলন ওরফে পিকআপ মিলন, ইউসুফ হোসেন মিন্টু ওরফে ফুট মিন্টু, শাহীন ওরফে ডাকাত শাহীন, পলাশ, শাহ আলম, তজিমুদ্দিন, মিঠু, আনিস, হানিফ মাস্টার, ফারুক ওরফে ভাইগ্না ফারুক, রাসেল জমাদ্দার, শামীম গাজী, সাদ্দাম খান ওরফে চাঁদাবাজ সাদ্দাম, কালা রিপন, শরীফ, এসএম আওলাদ বেল্লাল, বেলায়েত, বিল্লাল, এল রহমান, ইউসুফ মজুমদার, রাসেল, রহিম, আমানুল্লাহ আমান, জাহাঙ্গীর রহিম, ন্যাটা সুরুজ ও ইউসুফ মজুমদার প্রমুখ। চাঁদা আদায়ে নিয়োজিত আলোচিত লাইনম্যানদের মধ্যে আছে মো. বাবু ওরফে কাজী বাবু, সেলিম, মনু, রফিক প্রমুখ। এদের মধ্যে রফিক কয়েকদিন আগে গ্রেফতার হয়েছে।

চাঁদাবাজির সাতকাহন : আশির দশকে এরশাদ সরকারের আমলে কাওরান বাজার যখন ঢাকার প্রধান পাইকারি বাজার হিসাবে পূর্ণাঙ্গ রূপ নিতে শুরু করে, তখন থেকেই এখানে চাঁদাবাজির গোড়াপত্তন হয়। তখন ‘কুলি খরচ’ বা ‘রাতের পাহারাদার’দের বেতনের নাম করে নামমাত্র (৫ থেকে ১০ টাকা) চাঁদা নেওয়া হতো। নব্বইয়ের দশকে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র ফেরার পর কাওরান বাজারের চাঁদাবাজি সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক রূপ নেয়। নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নজর পড়ে কাওরান বাজারে। বাজারের ভেতরের বড় বড় আড়তদারদের কাছে তখন চিরকুট পাঠিয়ে বা ল্যান্ডফোনে কোটি টাকার ‘আন্ডারওয়ার্ল্ড ট্যাক্স’ দাবি করা হতো। চাঁদা না দিলে আড়তের ভেতরেই দিনে-দুপুরে গুলির ঘটনা ঘটত। ২০০১ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং পরবর্তীতে ২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে এই পুরো সময়টাতে চাঁদাবাজির ধরনে বড় পরিবর্তন আসে। সন্ত্রাসীরা সরাসরি সামনে না এসে ‘লাইনম্যান’ বা ‘ক্যাশিয়ার’ নিয়োগ করতে শুরু করে। কাগজে-কলমে যে ইজারার মূল্য ছিল ৫০ টাকা, ক্ষমতার জোরে আড়ত ও ট্রাক থেকে আদায় করা হতো ৫০০ টাকা। ওই সময়ে কাওরান বাজারে দৈনিক চাঁদার অঙ্ক কোটি টাকা স্পর্শ করে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কাওরান বাজারের চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণকারী দল ও ব্যানারের পরিবর্তন ঘটেছে। বদলেছে চাঁদাবাজির ধরনও। পর্দার আড়ালের ‘বড় ভাইদের’ নিয়োজিত ক্যাশিয়াররা এখন ডিজিটাল ওয়ালেট (বিকাশ/নগদ) অথবা নির্দিষ্ট কিউআর কোড ব্যবহার করে চাঁদার টাকা সংগ্রহ করে।

আড়তদারের জবানবন্দি : কাওরান বাজারের চাঁদাবাজির বিষয়ে জানতে চাইলে এক আড়তদার বলেন, ‘ভাই, ৩০ বছর ধরে ব্যবসা করছি। এরশাদ আমল দেখেছি, বিএনপি-আওয়ামী লীগ দেখেছি, অন্তর্বর্তী সরকারও দেখছি। আমাদের কপাল বদলায়নি। আগে এসে বলত পার্টি ফান্ড, এখন এসে বলে বাজার কমিটি বা লাইনম্যানের খরচ। টাকা না দিলে আড়তের সামনে ময়লা ফেলে রাখা হয়, মাল নামাতে দেওয়া হয় না। আমরা নিরুপায়।’ তিনি বলেন, ‘আমরা এখন অসহায়। সব মেনে নিয়েছি। এটা সব দলের কাছে সোনার ডিম পাড়া হাঁস। তাই মুখে যে যাই কিছু বলুক না কেন, এই চাঁদাবাজি আর বন্ধ হবে না।’

চাঁদাবাজির লাইসেন্স : ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যশনাল অব বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, কাওরান বাজারসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যে চাঁদাবাজি চলছে তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সারা দেশে ব্যাপক হারে চাঁদাবাজি শুরু হয়। অন্তর্বর্তী সরকার সেটা বন্ধে ব্যবস্থা নেয়নি। সেই ধারাবাহিকতাতেই চাঁদাবাজি চলছে। বর্তমান সরকারও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। এরই মধ্যে সরকারের একজন মন্ত্রী বিষয়টিকে একাধিকবার সমঝোতার লেনদেন হিসাবে উল্লেখ করেছেন। সবাই এর প্রতিবাদ করলেও সরকারের উচ্চ মহল নীরব আছে। যে কারণে চাঁদাবাজরা এক ধরনের লাইসেন্স পেয়ে গেছে।

ডিএমপি কমিশনার যা বলেন : ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) নবনিযুক্ত কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ যুগান্তরকে বলেন, কাওরান বাজারসহ পুরো রাজধানীর চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে আমরা কঠোর। এ ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অবলম্বন করা হচ্ছে এবং অপরাধীদের গ্রেফতারে পুলিশের বিশেষ অভিযান প্রতিদিন অব্যাহত রয়েছে। বাজার এলাকাকে ইতোমধ্যে পুলিশের বিশেষ নজরদারির (ব্লক রেইড) আওতায় আনা হয়েছে। চাঁদাবাজদের গ্রেফতারের ক্ষেত্রে আমরা কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বা অন্য কোনো বিষয় বিবেচনা করছি না।