রাজধানীর পল্লবীতে প্রতিবেশীর লালসার শিকার হয়ে খুন হলো সাত বছরের ছোট্ট শিশুটি। দ্বিতীয় শ্রেণির এই শিক্ষার্থী পাশের ফ্ল্যাটের সোহেল রানার (৩২) লোলুপ দৃষ্টিতে পড়ে প্রাণ হারায়। স্কুলে যাওয়ার সময় বাসা থেকে বের হওয়ার মুহূর্তে পাশের ফ্ল্যাটের সোহেল রানা শিশুটিকে নিজের ফ্ল্যাটে নিয়ে যায় এবং সম্ভবত ধর্ষণ করে। একপর্যায়ে গলা কেটে হত্যার পর শিশুটির নগ্নদেহ খাটের নিচে এবং বিচ্ছিন্ন মাথা পাশে বাথরুমে একটি বালতিতে রেখে বাসা থেকে পালিয়ে যায়। পুলিশের ধারণা হত্যার আগে সোহেল শিশুটিতে ধর্ষণ করে থাকতে পারে।
রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে গতকাল সকালে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটে। রিকশার মেকানিক সোহেল রানাকে সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জ থেকে আটক করে পুলিশ। সোহেল একটি রিকশার গ্যারেজে কাজ করেন। আগেই সোহেলের স্ত্রী সম্পাকে নিজের বাসা থেকে আটক করা হয়। শিশুটিকে যখন ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় তখন সম্পা ঘুমাচ্ছিল বলে দাবি করা হয়েছে। শিশুটির পরিবার ও সোহেল একই ভবনের পাশাপাশি ফ্ল্যাটে বসবাস করায় তারা একে অপরের পরিচিত ছিল।
শিশুটি মিরপুর পল্লবীর পপুলার মডেল স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। শিশুটির বাবা রাজধানীর একটি রিক্রুটিং এজেন্সিতে চাকরি করেন। মা গৃহীনি। তাদের দুই মেয়ের মধ্যে হত্যার শিকার শিুশুটি ছোট। বড় মেয়ে স্থানীয় একটি স্কুলের নবম শ্রেণিতে পড়ে। পরিবারটি প্রায় ১৭ বছর ধরে পল্লবীর মিরপুর-১১ নম্বরে বি-ব্লকের সাত নম্বর সড়কে তিনতল বিশিষ্ট ভবনের উত্তর পাশের ফ্ল্যাটে বসবাস করছে।
মঙ্গলবার দুপুরের পর পল্লবীর ওই বাসার সামনে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির সামনে উৎসুক জনতার ভিড়। বাসায় ঢুকতেই দেখা যায়, পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের সদস্যরা আলামত সংগ্রহ করছেন। একটি কক্ষে রামিসার বাবা-মা বাকরুদ্ধ হয়ে বসেছিলেন। চারদিকে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠিত মানুষের আনাগোনা।
হত্যাভাগ্য শিশুটির চাচা এ কে এম নজরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বড় বোনের সঙ্গে তার স্কুলে যাওয়ার কথা। হঠাৎ করেই শিশুটিকে পাওয়া যাচ্ছিল না। তার মা ফ্ল্যাটের দরজার বাইরে দেখেন, মেয়ের পায়ের একটি জুতা পড়ে আছে। তখন পাশের ফ্ল্যাটের দরজায় নক করেন। অনবরত নক করার পরও দরজাটি বন্ধ ছিল। এতে স্থানীয়দের সন্দেহ বাড়ে। পরে বিষয়টি পুলিশকে জানানো হয়। স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় বন্ধ দরজা ভেঙে পুলিশ বাসায় ঢুকে সোহেলের ঘরে রক্ত দেখতে পায়। এরপর প্রথমে খাটের নিচ থেকে শিশুটির মাথাবিহীন লাশ পাওয়া যায়। শরীর বিবস্ত্র ছিল। শৌচাগারের খালি প্লাস্টিকের বালতির মধ্যে কাটা মাথার সন্ধান মেলে। সোহেলের স্ত্রী সম্পা রান্নাঘরে লুকিয়ে ছিলেন। সেখান থেকে তাকে আটক করা হয়। এর আগেই সোহেল পালিয়ে যান। অপর দুটি কক্ষ তালাবদ্ধ ছিল। পল্লবী থানা পুলিশ ছাড়াও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আলামত সংগ্রহ করে।
পুলিশ ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ট্রাভেল এজেন্সির কর্মচারী আব্দুল হান্নান পল্লবীর ১১ নম্বর সেকশনের বি ব্লকের ৭ নম্বর রোডের ৩৯ নম্বর বাড়ির তিনতলার একটি ফ্ল্যাটে পরিবার নিয়ে ভাড়া থাকেন। এর পাশের ফ্ল্যাটের তিনটি কক্ষে আলাদা তিন পরিবার বাস করে। একটি ঘরে বাস করে সোহেল-সম্পা দম্পতি। ওই ঘর থেকে শিশুটির লাশ উদ্ধার করা হয়। এ সময় শিশুটির মাথাবিহীন শরীর বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ছিল। পুলিশের ধারণা, ধর্ষণের পর মেয়েটিকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাসান বাসির যুগান্তরকে বলেন, পাশের ফ্ল্যাটেই থাকত ঘাতক মাদকাসক্ত সোহেল।
দুই ফ্ল্যাটের মাঝখানে ফাঁকা জায়গা থেকে সোহেল শিশুটিকে টেনে রুমের মধ্যে নিয়ে যায়। পরে বাথরুমে নিয়ে গলা কেটে হত্যা করে। আমাদের ধারণা ধর্ষণ করে শিশুটিকে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনার সময় সোহেলের স্ত্রী ঘুমন্ত অবস্থায় ছিল। এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত জানানো হবে।
ঘটনার পর পুরো এলাকায় আতঙ্ক ও শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সকালে শিশুটিকে খুঁজে না পেয়ে পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। একপর্যায়ে প্রতিবেশীরা পুলিশে খবর দেয়।
পুলিশ বলছে, ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। শিশুটির লাশের ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর ধর্ষণের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে। পল্লবী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) এমদাদুল হক বলেন, জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। প্রথমে শিশুটির মাথাবিহীন লাশ উদ্ধার করা হয়। পরে ওই বাসার ভেতরে একটি বালতির মধ্যে মাথাটি পাওয়া যায়। তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে আমাদের ধারণা, প্রতিবেশী সোহেল শিশুটিকে কৌশলে নিজের ফ্ল্যাটে নিয়ে যায়। এরপর সেখানে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সোহেলের স্ত্রীকেও হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
পল্লবী থানা পুলিশ জানিয়েছে, হত্যার পেছনের কারণ, ঘটনার সময়কার পরিস্থিতি এবং অন্য কেউ জড়িত ছিল কিনা সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সন্দেহভাজন সোহেলকে আটক করা হয়েছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।