Image description

‘মাতৃদুগ্ধের বিকল্প নেই’—এটি বিশেষ করে নবজাতক এবং ছয় মাসের কম বয়সী শিশুদের বাবা-মায়েদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যবার্তা। মায়ের দুধ থেকে শিশু প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও প্রাথমিক রোগ প্রতিরোধক্ষমতা অর্জন করে। কিন্তু দেশে ছোট শিশুদের একচেটিয়া মাতৃদুগ্ধ পানের হার (শুধু মায়ের দুধ পান করা) সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কমেছে বলে বিভিন্ন পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে। এই পতন শিশুর প্রাথমিক রোগ প্রতিরোধক্ষমতা এবং পুষ্টিগত সুরক্ষায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য সংক্রামক রোগের বিস্তারেও এটি সহায়ক ভূমিকা রাখছে বলে মত দিয়েছেন শিশুবিশেষজ্ঞ এবং রোগতত্ত্ব ও পুষ্টিবিদেরা।

ইউনিসেফের সহায়তায় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) পরিচালিত ২০২৫ সালের মাল্টিক্লাস্টার ইনডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) নামের জরিপে শিশু ও নবজাতক খাদ্যসংক্রান্ত ফলাফলে দেখা যায়, দেশে জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে নবজাতককে মাতৃদুগ্ধ পান করানো শুরুর হার মাত্র ৩০ শতাংশ। শূন্য থেকে ৫ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যে একচেটিয়া মাতৃদুগ্ধ পানের (এক্সক্লুসিভ ব্রেস্টফিডিং) হারও মাত্র ৫৭ শতাংশ। প্রাথমিক পর্যায়ে মাতৃদুগ্ধ পান শুরুর হার কম থাকা এবং সময়মতো সঠিকভাবে দুধ পান নিশ্চিত না হওয়া শিশুর প্রাথমিক পুষ্টি ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

এমআইসিএস একটি আন্তর্জাতিক মানের গৃহভিত্তিক জরিপ, যা শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিক্ষা, পানি-স্যানিটেশনসহ বিভিন্ন সামাজিক ও স্বাস্থ্যসূচক পরিমাপ করে।

 

শিশু ও নবজাতক খাদ্য (আইওয়াইসিএফ) নির্দেশক অনুযায়ী, শিশুকে মায়ের দুধ পান করানোর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ রয়েছে। এগুলোর মধ্যে একটি হলো জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে নবজাতককে মাতৃদুগ্ধ দেওয়া শুরু করা, যা রোগ প্রতিরোধ- ক্ষমতা গঠনে সহায়ক। শিশুর জন্মের পরপর মায়ের স্তন থেকে নিঃসৃত আঠালো শালদুধের পুষ্টিগুণ তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। চিকিৎসকেরা বলেন, এটি শিশুকে জীবাণুর হাত থেকে রক্ষা করে।

দ্বিতীয় ধাপটি হলো একচেটিয়া মাতৃদুগ্ধ পান (এক্সক্লুসিভ ব্রেস্টফিডিং)। অর্থাৎ জন্মের পর প্রথম ৫ মাস শিশুকে খাদ্য হিসেবে শুধু মাতৃদুগ্ধ দেওয়া। এ সময়ে তাকে অন্য কোনো খাবার এমনকি পানিও দেওয়ার দরকার নেই।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং ইউনিসেফও জন্মের পর প্রথম ছয় মাস একচেটিয়া মাতৃদুগ্ধ পানের নির্দেশনা দিয়ে থাকে।এমআইসিএস এবং দেশের বড় জাতীয় স্বাস্থ্য জরিপ ‘বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ’ (বিডিএইচএস)-এর আগের তথ্য অনুযায়ী, দেশে একচেটিয়া মাতৃদুগ্ধ পানের হার ধারাবাহিকভাবে স্থিতিশীল নয়। এমআইসিএস ২০১২-১৩ জরিপে এর হার ছিল প্রায় ৫৬ শতাংশ। ২০১৯ সালে তা প্রায় ৬৩ শতাংশে পৌঁছায়। আবার সর্বশেষ ২০২৫ সালের ফলে এটি কমে ৫৭ শতাংশে নেমে এসেছে।

 

বিডিএইচএসের তথ্যেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা যায়। ২০১১ সালের প্রায় ৬৪ শতাংশ থেকে ২০১৭-১৮ সালে হার সামান্য বেড়ে ৬৫ শতাংশ হয়। ২০২২ সালের বিডিএইচএস অনুযায়ী দেশে একচেটিয়া মাতৃদুগ্ধ পানের হার প্রায় ৫৫ শতাংশ।

মাতৃদুগ্ধ পানের এই সূচকগুলোতে দীর্ঘ মেয়াদে বড় ধরনের উন্নতি নেই। উল্টো সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ওঠানামা দেখা যাচ্ছে। শিশু ও নবজাতক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টি শিশুর প্রাথমিক পুষ্টি ও রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতির দিকেই ইঙ্গিত করে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশু জন্মের পর প্রথম ছয় মাস একচেটিয়া মাতৃদুগ্ধের অভাবে ভুগলে এবং পরবর্তী সময়ে টিকাদান ঘাটতি বা অপুষ্টির শিকার হলে তার হামের মতো রোগে আক্রান্ত হওয়া এবং জটিলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগের অধ্যাপক রেজাউল করিম কাজল আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘একচেটিয়া মাতৃদুগ্ধ পান শিশুর প্রাথমিক রোগ প্রতিরোধ- ব্যবস্থা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মাতৃদুগ্ধে থাকা অ্যান্টিবডি ও অন্যান্য জৈব উপাদান শিশুর অপরিণত রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা দেয়।’

হামের মতো অত্যন্ত সংক্রামক রোগে এই প্রাথমিক সুরক্ষা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে ডা. কাজল বলেন, ‘জন্মের পর প্রথম ছয় মাস মাতৃদুগ্ধ না পেলে এবং মায়ের পুষ্টিহীনতা থাকলে শিশুর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হয়ে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে।’

এই বিশেষজ্ঞের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে শুধু বুকের দুধ খাওয়ানোর হার হ্রাস পাওয়া বহু শিশুর প্রাথমিক পুষ্টিতে প্রভাব ফেলছে। অনেক ক্ষেত্রে শিশু জন্মের পর থেকে বিকল্প খাদ্যে অভ্যস্ত হয়ে পড়ায় স্বাভাবিক মাতৃদুগ্ধ গ্রহণ ব্যাহত হয়। কর্মজীবী মায়েদের ক্ষেত্রে শিশুকে বুকের দুধ পান করানোর সহায়ক পরিবেশের ঘাটতি এর অন্যতম কারণ।

দেশে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে হামের নজিরবিহীন প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। কয়েক দশকের মধ্যে মৃত্যুর হারও অনেক বেশি। হাসপাতালগুলোর ওয়ার্ডে উদ্বিগ্ন মায়েদের বিমর্ষ মুখ বা মৃত সন্তান কোলে বাড়ি ফেরার ছবি মিডিয়ার নিয়মিত বিষয় হয়ে উঠেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত হামের উপসর্গে ৩৯৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হামে মারা গেছে ৭৭ শিশু। মোট মৃত্যু হয়েছে ৪৭৪ শিশুর। হামের উপসর্গ শনাক্ত হয়েছে ৫৬ হাজার ৫৮৬ শিশুর। সারা দেশে ৭ হাজার ৯২৯ শিশুর হাম নিশ্চিতভাবে শনাক্ত হয়েছে।

তবে সরকারি এই হিসাব নির্ভুল কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন জনস্বাস্থ্যবিদেরা। তাঁদের ধারণা, প্রকৃত আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা আরও বেশি হবে।

হাম ও রুবেলা রোগ নির্মূলের অগ্রগতি মূল্যায়ন করার দায়িত্বপ্রাপ্ত কমিটি এনভিসির চেয়ারপারসন এবং রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. মাহমুদুর রহমানও একচেটিয়া মাতৃদুগ্ধ পানের ওপর জোর দিয়েছেন। আজকের পত্রিকাকে তিনি বলেন, ‘একচেটিয়া মাতৃদুগ্ধ পান শিশুর প্রাথমিক রোগ প্রতিরোধক্ষমতা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ। তবে হামের মতো সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে মাতৃদুগ্ধ গুরুত্বপূর্ণ হলেও একমাত্র নির্ধারক নয়। টিকা, পুষ্টি এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যও সমানভাবে ভূমিকা রাখে।’

ডা. মাহমুদুর রহমান একচেটিয়া মাতৃদুগ্ধ পান কমার পেছনে কর্মজীবী মায়েদের জন্য সহায়ক পরিবেশের অভাব, প্রচার ও সচেতনতার ঘাটতি এবং মিশ্র খাদ্যের প্রবণতাকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, শিশু জন্মের পর দ্রুতই ফিডার তথা দুধের বিকল্পে অভ্যস্ত হলে স্বাভাবিক মাতৃদুগ্ধ গ্রহণ ব্যাহত হয়।

বাংলাদেশ চিকিৎসা গবেষণা পরিষদের (বিএমআরসি) পরিচালক ও বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ কাজী সাইফউদ্দীন বেন্‌নূরও হামের মতো ভাইরাসজনিত রোগ মোকাবিলায় মায়ের দুধ থেকে পাওয়া সুরক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরলেন। তাঁর মতে, হামের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে টিকাদান প্রধান ব্যবস্থা হলেও শিশুর পুষ্টি এবং প্রাথমিক রোগ প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তুলতে মাতৃদুগ্ধ সহায়ক ভূমিকা রাখে।