Image description
তথ্য গোপন ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের দুই মামলা

সম্পদের তথ্য গোপন ও অসংগতিপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় আসামি হয়েছেন ময়মনসিংহে স্কাবো মেডিকেল টেকনোলজি প্রাইভেট লিমিটেডের মালিক হুমায়ুন কবীর এবং তার পরিবারের দুই সদস্য। ১৩ কোটি ৬ লাখ ১২ হাজার টাকা মূল্যের সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন হুমায়ুন কবীর। তার বাবা ও স্ত্রীর নামে ৫ কোটি ৬২ লাখ টাকায় জমি কিনে নিজের নামে হেবা দলিলও করে নিয়েছেন। এসব আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে করা মামলায় তাদের হাজির হওয়ার জন্য বারবার নোটিশ করছে দুদক। কিন্তু আইনের তোয়াক্কা না করে দুদকের নোটিশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছেন হুমায়ুন কবীরসহ মামলার অন্য আসামিরা। আর দুদকের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আদালতের আদেশ ব্যতীত আসামি ধরার নির্দেশনা নেই তাদের।

দুদক সূত্রে জানা যায়, সম্পদের তথ্য গোপন, জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ সম্পদ অর্জন, স্থানান্তর ও হস্তান্তরের ঘটনায় ২০২৫ সালে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে পৃথক দুটি মামলা হয়েছে ময়মনসিংহ নগরীর ধোপাখলা হিন্দুপল্লির বাসিন্দা মো. হুমায়ুন কবীর, স্ত্রী বেবী আলিয়া হাসনাত ও বাবা আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের সহকারী পরিচালক নুরুল ইসলাম যুগান্তরকে জানান, দুদক সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের নির্দেশক্রমে ২০২৫ সালের ৪ মার্চ সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতে এ মামলা করা হয়। প্রথমে দুদক সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের তৎকালীন উপসহকারী পরিচালক শাহাদত হোসেনকে তদন্তভার দেওয়া হয়। পরে ২০২৫ সালের নভেম্বরে মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন করা হয়। দুদকের করা পৃথক এ দুটি মামলার বাদী রেকর্ডপত্র নিয়ে দুদক কার্যালয়ে হাজির হওয়ার জন্য আসামিদের একাধিকবার নোটিশ পাঠিয়েছেন। কিন্তু তারা হাজির হচ্ছেন না।

নুরুল ইসলাম বলেন, আদালতের আদেশ ব্যতীত আমাদের আসামি ধরার নির্দেশনা নেই। আমরা অভিযানও চালাতে পারি না।

মামলার বিবরণে দেখা যায়, হুমায়ুন কবীরের বিরুদ্ধে সম্পদ স্থানান্তর, হস্তান্তর ও রূপান্তরের অভিযোগ রয়েছে। দুদকে তার দাখিলকৃত সম্পদবিবরণীতে তিনি ১৩ কোটি ৬ লাখ ১২ হাজার ১৪০ টাকা মূল্যের সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন। তার বিরুদ্ধে ১৫ কোটি ৭১ লাখ ৫০ হাজার ৮২৯ টাকা মূল্যের জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ সম্পদ অর্জনপূর্বক ভোগদখলে রেখে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০১২-এর ধারা ৪(২) ও ধারা ৪(৩) লঙ্ঘন করার অভিযোগ করা হয়েছে। তার বাবা মো. আলী হোসেন ও স্ত্রী বেবী আলিয়া হাসনাত কর্তৃক ওই অবৈধ সম্পদ অর্জনে প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করে দণ্ডবিধির ১০৯ ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন।

দুদকের দেওয়া তথ্য বলছে, সম্পদবিবরণী যাচাইকালে প্রাপ্ত রেকর্ডপত্র অনুযায়ী, হুমায়ুন কবীর তার দাখিলকৃত সম্পদবিবরণীতে ৪ কোটি ৩১ লাখ ৮০ হাজার ৫৫০ টাকার স্থাবর এবং ৩ লাখ ৪৩ হাজার ৪৪৭ টাকার অস্থাবর সম্পদসহ ৪ কোটি ৩৫ লাখ ২৩ হাজার ৯৯৭ টাকার সম্পদের তথ্য ঘোষণা করেন। কিন্তু যাচাইকালে তার নামে ১৭ কোটি ৩৭ লাখ ৯২ হাজার ৬৯০ টাকার স্থাবর এবং ৩ লাখ ৪৩ হাজার ৪৪৭ টাকার অস্থাবর সম্পদসহ ১৭ কোটি ৪১ লাখ ৩৬ হাজার ১৩৭ টাকার সম্পদের তথ্য পাওয়া যায়। ফলে তিনি ১৩ কোটি ৬ লাখ ১২ হাজার ১৪০ টাকা মূল্যের সম্পদের তথ্য গোপনপূর্বক মিথ্যা তথ্য প্রদান করে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৬(২) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন। এছাড়াও তিনি স্কাবো মেডিকেল টেকনোলজি প্রাইভেট লিমিটেডের ১৩৫০টি শেয়ারের মূল্য ও বিদেশে গমনাগমনের তথ্য গোপন করেন। তার প্রতিষ্ঠানগুলোর আসবাবপত্র ও মেশিনারিজ উচ্চমূল্যের, যা তিনি সম্পদবিবরণীতে উল্লেখ করেননি।

মামলার বিবরণে জানা যায়, হুমায়ুন কবীরের গ্রহণযোগ্য আয় পাওয়া যায় ১ কোটি ৬৯ লাখ ৮৫ হাজার ৩০৮ টাকা। অথচ তার জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ সম্পদের পরিমাণ ১৫ কোটি ৭১ লাখ ৫০ হাজার ৮২৯ টাকা।

দুদকের কর্মকর্তাদের রেকর্ডপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, তার অর্জিত টাকা দিয়ে ময়মনসিংহ সদরের ১৪২ দশমিক ৬২ শতাংশ জমি ৫ কোটি ৬২ লাখ ৪০ হাজার ৮৬০ টাকায় বাবা আবুল হোসেন ও স্ত্রী বেবি আলিয়া হাসনাতের নামে ক্রয় করে কিছুদিন পর ওই জমি বাবা ও স্ত্রীর কাছ থেকে নিজ নামে হেবা দলিল করে নেন। এর মাধ্যমে নিজের অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ স্থানান্তর, হস্তান্তর ও রূপান্তর করে মানি লন্ডারিং অপরাধ সংঘটিত করেছেন।

একইভাবে হুমায়ুন কবীরের স্ত্রী বেবি আলিয়া হাসনাতের বিরুদ্ধে দুদকের করা মামলার বিবরণে জানা যায়, সম্পদবিবরণীতে মিথ্যা তথ্য দিয়ে ৩ কোটি ৫০ লাখ ৬৬ হাজার ৩৪৬ টাকা মূল্যের সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন। এছাড়া ৪ কোটি ৪৬ লাখ ৭৮ হাজার ১৩৫ টাকা মূল্যের জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ সম্পদ অর্জনপূর্বক ভোগদখলে রেখে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ধারা ২৬(২) ও ২৭(১) এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ধারা ৪(২) ও ৪(৩) এবং স্বামী হুমায়ুন কবীর ও শ্বশুর মো. আলী হোসেন কর্তৃক ওই অবৈধ সম্পদ অর্জনে প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করে দণ্ডবিধির ১০৯ ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন।

সূত্র বলছে, সম্পদবিবরণী যাচাইকালে প্রাপ্ত রেকর্ডপত্র অনুযায়ী, বেবী আলিয়া হাসনাত তার দাখিলকৃত ৯৪ লাখ ৩৪ হাজার ১৭৬ টাকার স্থাবর ও ২০ লাখ ১ হাজার ১১৩ টাকার অস্থাবর সম্পদসহ ১ কোটি ১৪ লাখ ৩৬ হাজার ৮৯ টাকার সম্পদের তথ্য ঘোষণা করেন। যাচাইকালে তার নামে ১ কোটি ৭৩ লাখ ৭৫ হাজার ৫২২ টাকার স্থাবর এবং ২ কোটি ৯১ লাখ ২৬ হাজার ৯১৩ টাকার অস্থাবর সম্পদসহ ৪ কোটি ৬৫ লাখ ২ হাজার ৪৩৫ টাকা মূল্যের সম্পদের তথ্য পাওয়া যায়। ফলে বেবী আলিয়া হাসনাত ৩ কোটি ৫০ লাখ ৬৬ হাজার ৩৪৬ টাকা মূল্যের সম্পদের তথ্য গোপনপূর্বক মিথ্যা তথ্য প্রদান করে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৬(২) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন।

এছাড়াও মামলার বিবরণে জানা যায়, বেবী আলিয়া হাসনাতের নামে ৪ কোটি ৯৭ লাখ ১৪ হাজার ৬৩৫ টাকা মূল্যের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তথ্য পাওয়া যায়। অন্যদিকে তার নামে গ্রহণযোগ্য আয় পাওয়া যায় ৫০ লাখ ৩৬ হাজার ৫০০ টাকা। অথচ তার জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ সম্পদের পরিমাণ ৪ কোটি ৪৬ লাখ ৭৮ হাজার ১৩৫ টাকা।

দুদকের কর্মকর্তাদের রেকর্ডপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, তার অবৈধভাবে অর্জিত টাকা দিয়ে জমি ক্রয় করে কিছুদিন পর ওই ক্রয়কৃত জমি স্বামী হুমায়ুন কবীরের নামে হেবা দলিল সম্পন্ন করে এবং শ্বশুর কাঠমিস্ত্রি আলী হোসেনকে সম্পদবিবরণীতে প্রদর্শিত প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিষ্ঠাতা ও মালিক দেখিয়ে নিজের অবৈধভাবে অর্জিত টাকা স্থানান্তর, হস্তান্তর ও রূপান্তর করেছেন। ফলে তিনি মানি লন্ডারিং অপরাধ সংঘটিত করেছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হুমায়ুন কবির ও স্ত্রী আলিয়াসহ তাদের পরিবারের সদস্যদের নামে-বেনামে দেশ-বিদেশে শত কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে। এসব সম্পদ অর্জনে আয়ের কোনো বৈধ উৎস না থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন দুদকের মামলায় তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, দুদকের স্থানীয় কিছু অসৎ কর্মকর্তা এবং তরুণদের একটি দলের এক প্রভাবশালী নেতার বাবার যোগসাজশে দুদকের মামলা থেকে অব্যাহতি পাওয়ার সুযোগ খুঁজছে সংশ্লিষ্ট পরিবারটি।

জানতে চাইলে হুমায়ুন কবীর যুগান্তরকে বলেন, কাগজপত্র রেডি করে আমরা দুদকে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। পরিবারের সদস্যদের নামে-বেনামে দেশ-বিদেশে সম্পদ থাকার কথা অস্বীকার করেন তিনি। মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে হওয়া মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এগুলো আইনগত বিষয়। আমাদের বক্তব্য তাদের (দুদক) কাছে দেব।