জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হলে ‘পূর্ণকালীন সভাপতি’ হিসেবে দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকার করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। তবে, সভাপতি নির্বাচিত হলে তিনি কি বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব ছেড়ে দেবেন, নাকি নির্বাচনে জেতার কূটনৈতিক কৌশল হিসেবে এমন পন্থা অবলম্বন করেছেন– তা নিয়ে দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে নানা গুঞ্জন শুরু হয়েছে।
নির্বাচনী প্রচারে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ‘পূর্ণকালীন সভাপতি’ হিসেবে দায়িত্ব পালনের এই অঙ্গীকারকে মূলত একটি কার্যকর কূটনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখছেন সরকারের ঊর্ধ্বতন কূটনীতিকরা। তারা বলছেন, সাধারণত সদস্যরাষ্ট্রগুলোর প্রত্যাশা থাকে— যিনি সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হবেন, তিনি যেন পূর্ণকালীন দায়িত্ব পালন করেন। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের প্রার্থী খলিলুর রহমান বর্তমানে সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে সভাপতি নির্বাচিত হলে তাকে একই সঙ্গে দুটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলাতে হবে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের ‘পূর্ণকালীন সভাপতি’ হিসেবে দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকারকে সরকারের কূটনীতিকরা একটি কূটনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখছেন। সদস্যরাষ্ট্রগুলোর প্রত্যাশা অনুযায়ী তিনি এই অঙ্গীকার করেছেন। সভাপতি নির্বাচিত হলে তিনি একই সঙ্গে দুটি দায়িত্ব পালন করবেন নাকি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব ছেড়ে দেবেন তা নিয়ে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে
বাংলাদেশের একমাত্র প্রতিপক্ষ সাইপ্রাসের প্রার্থী ভোটে জিততে নিশ্চিতভাবেই এই দিকটিকে নেতিবাচক হিসেবে প্রচার করছেন। সে কারণেই হয়তো পররাষ্ট্রমন্ত্রী ‘পূর্ণকালীন সভাপতি’ হিসেবে বিশ্বমঞ্চে এই জোরালো অঙ্গীকার করেছেন।
সরকারের এক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘বাংলাদেশ নির্বাচনী প্রচারের জন্য খুব কম সময় পেয়েছে। অন্যদিকে, সাইপ্রাস কিন্তু বছরজুড়ে জোরদার প্রচারণা চালিয়েছে। ভোটে জিততে অনেক সময় নানামুখী কৌশল অবলম্বন করতে হয়। আমার মনে হয় না সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হলেই খলিলুর রহমানকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব ছেড়ে দিতে হবে।’

সম্প্রতি নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে সংস্থার সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদের নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিয়ে খলিলুর রহমান জানান, নির্বাচিত হলে তিনি ‘পূর্ণকালীন সভাপতি’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন এবং তিনি হবেন সবার সভাপতি। এ সময় তিনি তার লিখিত বক্তৃতায় বিশ্বশান্তি ও বৈশ্বিক উন্নয়নে তার ছয়টি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার প্রস্তাবও তুলে ধরেন।
আগামী ২ জুন নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই পদে খলিলুর রহমানের প্রতিদ্বন্দ্বী হলেন সাইপ্রাসের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পার্মানেন্ট সেক্রেটারি আন্দ্রেজ কাকাউরিস
আঞ্চলিক পালাক্রমে দায়িত্ব পালনের আন্তর্জাতিক পদ্ধতি অনুযায়ী, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির পদটি এবার ‘এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় গ্রুপ’- এর জন্য নির্ধারিত। এই পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে বাংলাদেশ ও সাইপ্রাস। বাংলাদেশের পক্ষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এবং সাইপ্রাসের পক্ষে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পার্মানেন্ট সেক্রেটারি আন্দ্রেজ কাকাউরিস নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী।
আগামী ২ জুন নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সাধারণ পরিষদকক্ষে এই পদের আনুষ্ঠানিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আগামী ৮ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। ২২ সেপ্টেম্বর বিশ্বনেতাদের ভাষণের মধ্য দিয়ে শুরু হবে উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্ক।
সম্প্রতি নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদের নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিয়ে খলিলুর রহমান জানান, নির্বাচিত হলে তিনি ‘পূর্ণকালীন সভাপতি’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন এবং তিনি হবেন সবার সভাপতি।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধির দায়িত্ব পালন করা সাবেক এক কূটনীতিক বলেন, “জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্বটি মূলত ‘পূর্ণকালীন’। সদস্যরাষ্ট্রগুলো সবসময়ই একজন পূর্ণকালীন সভাপতি আশা করে। এই পদের জন্য সাধারণত বিভিন্ন দেশের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বেশি মনোনীত করা হয়ে থাকে। তবে, রানিং বা দায়িত্বে থাকা পররাষ্ট্রমন্ত্রী হলে কেউ সভাপতি হতে পারবেন না— জাতিসংঘের সংবিধানে এমন কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। মালদ্বীপের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিন্তু একই সঙ্গে দুটি দায়িত্বই সফলভাবে পালন করেছিলেন, যদিও তাকে বেশিরভাগ সময় নিউইয়র্কেই কাটাতে হয়েছিল।”
সাবেক এই কূটনীতিক আরও যোগ করেন, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সাধারণ পরিষদের সভাপতির এনগেজমেন্ট (ব্যস্ততা) অনেক বেশি। অনেক আন্তর্জাতিক সফর থাকে। এক্ষেত্রে ‘পূর্ণকালীন’ সময় দিতে না পারলে কাজের ব্যাঘাত ঘটার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

উল্লেখ্য, ইতিপূর্বে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৬তম অধিবেশনের সভাপতি ছিলেন মালদ্বীপের আবদুল্লা শহিদ। তিনি মালদ্বীপের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্বও সমানতালে সামলেছিলেন।
এর আগে, বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতীয় সংসদের স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী ১৯৮৬ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হলে খলিলুর রহমান হবেন এই গৌরব অর্জনকারী দ্বিতীয় বাংলাদেশি।
২০২০ সালে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন এই পদে নির্বাচনের আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং ২০২৬ সালে এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপ থেকে বাংলাদেশের প্রার্থী হওয়ার বিষয়টি জাতিসংঘকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনকে ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির জন্য মনোনীত করা হয়। তবে, প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বাংলাদেশ ও সাইপ্রাস ছাড়াও ফিলিস্তিনের প্রতিনিধি থাকায় ঢাকা কিছুটা ‘ধীরে চলো’ নীতি গ্রহণ করে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করে। এরপর টেকনোক্র্যাট কোটায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী করা হয় খলিলুর রহমানকে, যিনি সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর জাতিসংঘের সভাপতির পদের জন্য বাংলাদেশের প্রার্থী পরিবর্তন করে খলিলুর রহমানকে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেয় এবং বাদ পড়েন তৌহিদ হোসেন। এর মধ্যে ফিলিস্তিনও নির্বাচন থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেওয়ায় আগামী ২ জুনের নির্বাচনে এখন মুখোমুখি প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে কেবল বাংলাদেশ ও সাইপ্রাসের মধ্যে।