দেশের যেকোনো স্থানে সততা ও দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনে প্রস্তুত থাকতে মাঠ প্রশাসনের প্রতি নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাঁর নির্দেশনা ছিল জনবান্ধব ও সাধারণ মানুষের প্রতি দরদি প্রশাসন গড়ে তোলার।
জানা গেছে, চলতি মে মাসের ৬ তারিখ শেষ হওয়া চার দিনব্যাপী জেলা প্রশাসক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান এবং শেষ দিন বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময়সভায় ডিসিদের দুর্নীতি ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে নিরপেক্ষভাবে সততার সঙ্গে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। কিন্তু কাজ করতে গিয়ে ডিসি ও ইউএনওরা পদে পদে বাধাগ্রস্ত হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। শুধু তা-ই নয়, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতাদের নানামুখী তদবিরের চাপ রয়েছে তাঁদের ওপর।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, জোট এবং সমন্বয়ক পরিচয়ধারীদের মাত্রাতিরিক্ত রাজনৈতিক চাপে চরম অস্বস্তি ও অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
জানা গেছে, মাঠ প্রশাসনে রাজনৈতিক চাপের প্রধান ও উল্লেখযোগ্য দিকগুলো হলো নিয়োগ ও পদায়নে হস্তক্ষেপ। ডিসি বা ইউএনও অফিসের ছোটখাটো নানা পদে নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়ে তদবির থাকে স্থানীয় নেতাদের। এসব পদে তাঁদের পছন্দের প্রার্থীকে মনোনীত করতে চাপ থাকে স্থানীয় নেতাদের।
রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতাকর্মী ও নিজেদের ক্ষমতাধর দাবি করা বিভিন্ন সমন্বয়ক পরিচয়ধারীর চাপে কর্মকর্তারা প্রায়ই অতিষ্ঠ হয়ে পড়েন। অতীতে নিয়ম ও আইন মেনে কাজ করতে গিয়ে মাঠ কর্মকর্তাদের অনেককে রাজনৈতিক হুমকির মুখে পড়তে হয়েছে, যা এখনো বিদ্যমান। সরাসরি কর্মকর্তাদের ওপর হামলা ও অফিস ভাঙচুরের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাও অতীতে ঘটেছে, যা প্রতিনিয়ত ভাবিয়ে তোলে মাঠ প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের।
আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে সরকারের কাঠোর বার্তা থাকা সত্ত্বেও বর্তমানে কেন্দ্রের সঙ্গে মাঠ প্রশাসনের মধ্যে এক ধরনের নীরব অস্থিরতা বিরাজ করছে, যা দেশের সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে থানায় মামলা গ্রহণ করা না করা, তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া না দেওয়া, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা তামিল করা না করার বিষয়ে স্থানীয় নেতাদের হস্তক্ষেপ প্রতিনিয়ত মাঠ প্রশাসনকে অস্থির করে তুলছে।
এ ছাড়া সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক সরকার নির্দেশিত বিভিন্ন ধরনের কার্ড পাওয়া না পাওয়ার বিষয়টিসহ হাট-বাজার ও জলমহাল ইজারা দেওয়ার বিষয়টি মাঠ প্রশাসনকে প্রতিনিয়ত বিব্রত করছে। কখনো ফ্যামিলি কার্ড, কখনো জেলে কার্ড, কখনো কৃষক কার্ড, আবার কখনো স্থানীয় ছোটবড় খাল কাটার কাজ পেতে জোরালো তদবির থাকে ইউএনও ও ডিসিদের প্রতি। এর বাইরে নানা ধরনের লাইসেন্স পাওয়ার তদবির তো রয়েছেই। এ ক্ষেত্রে বাদ যান না বিভাগীয় কমিশনাররাও। এসব তদবির রাখতে না পারলেই বাধে বিপত্তি। এসব তদবির সামাল দিতে মাঠ প্রশাসনের অনেক স্বাভাবিক সেবা প্রদান ব্যাহত হচ্ছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্থানীয় জনসাধারণ। ইউএনও ও ডিসিদের সাক্ষাৎ পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাদের অপেক্ষা করতে হয়। এতে নতুন সরকারের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হচ্ছে। বিরক্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মঙ্গলবার সকাল ১১টার দিকে ফোনে কথা হয় রাজশাহীর জেলা প্রশাসকের দপ্তরে জমিসংক্রান্ত একটি জটিলতা নিরসনে ডিসির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসা রবিউলের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘সাড়ে ১০টা থেকে অপেক্ষা করছি, ডিসি সাহেবের সঙ্গে কথা বলব। কিন্তু কয়েকজন নেতা গেছেন ভেতরে, বের হচ্ছেন না। কখন যে বের হবেন, তা-ও জানি না।’
অন্যদিকে পিরোজপুর জেলার নেছারাবাদ উপজেলার ইউএনওর সঙ্গে অবসরপ্রাপ্ত পিতার পেনশন বিষয়ে কথা বলতে এসেছেন স্থানীয় স্কুল শিক্ষক আব্দুর রহমান। সকাল সাড়ে ১১টা থেকে অপেক্ষা করছেন ইউএনও সাহেবের রুমের সামনে। দুপুর ১২টা পেরিয়ে গেলেও ইউএনওর সাক্ষাৎ পাননি আব্দুর রহমান। ইউএনওর একজন ব্যক্তিগত কর্মচারী তাঁকে জানিয়েছেন, কয়েকজন নেতা ভেতরে আছেন, গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মিটিং করছেন। তাই সাক্ষাৎ পেতে দেরি হবে।
জানতে চাইলে পিরোজপুরের জেলা প্রশাসক আবু সাঈদ বলেন, ‘জেলা প্রশাসনের অনেক কাজের সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে কাজ করতে হয়। এ ক্ষেত্রে তাঁদের সহযোগিতা প্রয়োজন হয়। জেলার উন্নয়ন বিষয়ক অনেক কমিটিতে তাঁরা সদস্য হিসেবে কাজ করছেন। কাজেই তাঁদের সহযোগিতা জেলার উন্নয়ন ত্বরান্বিত করে। তবে কিছু বিষয়ে তাঁদের পরামর্শ বা সুপারিশ আমাদের কাছে আসে। আমরা বিচার-বিবেচনা করে সেসব সুপারিশ বাস্তবায়নে কাজ করি।’
একই সুরে কথা বলেছেন ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী, মাগুরার ডিসি আবদুল্লাহ আল মাহমুদ, চট্টগ্রামের ডিসি জাহিদুল ইসলাম মিঞা। সবাই বলেছেন, জনসাধারণের কল্যাণে স্থানীয় নেতাদের নানামুখী তদবির থাকে, তবে বিচার-বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই সরকারের প্রথম জেলা প্রশাসক সম্মেলনে দুর্নীতি ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে নিরপেক্ষভাবে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন ডিসিদের। তিনি কর্মকর্তাদের ভয়ভীতিহীন, নিরপেক্ষভাবে জনগণের কল্যাণে কাজ করার এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণের নির্দেশ দিয়েছেন। ডিসি সম্মেলনে দেওয়া তাঁর অন্যান্য নির্দেশনার মধ্যে রয়েছে দেশের যেকোনো স্থানে দায়িত্ব পালনে প্রস্তুত থাকা, জনবান্ধব প্রশাসন গড়ে তোলা, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মার্কেট বন্ধ করা এবং খাদ্যে ভেজাল ও বাল্যবিবাহ রোধ করা।
এসব নির্দেশনা বাস্তবায়নে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে মাঠ প্রশাসনে সরকারের মুখপাত্র হিসেবে পরিচিত জেলা প্রশাসকদের কাছে সুনির্দিষ্ট চিঠি পাঠানো হয়েছে। ডিসি সম্মেলনে মাঠ প্রশাসনের দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাধ্যমে মোট ২৪টি দিকনির্দেশনা পাঠানো হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে মন্ত্রিপরিষদসচিব ড. নাসিমুল গনি বলেছেন, ‘মাঠ প্রশাসনে নানামুখী তদবির তো থাকবেই। তবে বিচার-বিবেচনা করে সেগুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিচলিত হলে তো চলবে না।’
জানা গেছে, মাঠ প্রশাসনে ডিসি মূলত সরকারের প্রধান প্রতিনিধি হিসেবে জেলার সামগ্রিক প্রশাসন, রাজস্ব আদায়, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালনা ও সমন্বয় করেন। তিনি একই সঙ্গে জেলা কালেক্টর এবং জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
মাঠ প্রশাসনে ডিসির প্রধান কাজগুলোকে কয়েকটি মূল ভাগে ভাগ করা যায়, যেমন—জেলার সব সরকারি দপ্তরের কাজের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা; সরকারের বিভিন্ন নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনা তৃণমূল পর্যায়ে বাস্তবায়ন করা; জেলার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা (বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ইত্যাদি) এবং ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করা; ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) আদায় এবং ভূমি রেকর্ড ও জরিপ রক্ষণাবেক্ষণ করা; সরকারি খাসজমি উদ্ধার ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা; হাট-বাজার ও জলমহাল ইজারা দেওয়া এবং রাজস্ব আদায় তদারক করা; জেলার সামগ্রিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করা; ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে খাদ্যে ভেজাল, অবৈধ দখল ও অপরাধ দমন করা; লাইসেন্স প্রদান (অস্ত্র, বিস্ফোরক ইত্যাদি) এবং জেলখানা পরিদর্শন করা; সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি ও সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর কাজ সঠিকভাবে চলছে কি না তা তদারক করা; শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নারী-শিশু উন্নয়নমূলক কাজে সহায়তা ও তদারক করা; জাতীয় ও স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন নির্বাচনে রিটার্নিং বা সহকারী রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করা; বাজার নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত ট্রেড লাইসেন্স চেকিং, দ্রব্যমূল্য ও সাপ্লাই চেইন মনিটরিং করা; সার্বিকভাবে মাঠ পর্যায়ে সরকারের ইতিবাচক ভাবমূর্তি ধরে রাখা। জনগণের সেবা নিশ্চিত করার মূল কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ডিসির কার্যালয় কাজ করে।
মাঠ প্রশাসনে ইউএনও হলেন উপজেলা প্রশাসনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। সরকারের নীতি ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, ভূমি ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড তত্ত্বাবধান ও সমন্বয় করাই ইউএনওর প্রধান কাজ।