ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে হওয়া গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণার অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে সদ্য জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ছাড়া সর্দার আমিরুল ইসলাম সাগরের বিরুদ্ধে। দলের আদর্শিক বিচ্যুতি ও ‘ডানপন্থার উত্থান’কে কারণ দেখিয়ে এনসিপির ঢাকা মহানগর উত্তর শাখার সদস্য সচিব পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন তিনি। যদিও দলটির একাধিক নেতার অভিযোগ, গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে সাংগঠনিক ব্যয়ের নামে পাওয়া বিপুল অর্থের হিসাব দিতে না পারা, আর্থিক অনিয়ম ও অভ্যন্তরীণ ক্ষোভের মুখেই মূলত নিজ দলে কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন আমিরুল। এমন প্রেক্ষাপটে গত রবিবার বিকেলে ফেসবুকে পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই গভীর রাতে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করে এনসিপি।
দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়, সতর্ক করার পরও শৃঙ্খলাপরিপন্থী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকায় তার বিরুদ্ধে নেওয়া হয়েছে সাংগঠনিক ব্যবস্থা। যদিও আমিরুলের দাবি, এনসিপি থেকে পদত্যাগ করায় পরিকল্পিতভাবে তাকে হেয়প্রতিপন্নের চেষ্টা চলছে। আর তা করা হচ্ছে রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সাংগঠনিক ব্যয়ের জন্য প্রায় ১০ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছিল সর্দার আমিরুল ইসলামের কাছে। কিন্তু সেই অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছ হিসাব তিনি দিতে পারেননি বলে অভিযোগ ওঠে। বরং বিভিন্ন নেতা ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের ব্যক্তিগত অনুদানকেও দলীয় ব্যয় হিসাবে দেখানোর মাধ্যমে আমিরুল বড় অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ করেন— এমন দাবি করেছেন এনসিপির কয়েকজন নেতা।
আগামীর সময়ের হাতে আসা একাধিক ভয়েস রেকর্ড, দলীয় সভার বিবরণ এবং কেন্দ্র ও মহানগর উত্তরের অন্তত ১০ নেতার বক্তব্যে এসব অভিযোগের সপক্ষে তথ্য মিলেছে। এতে দেখা যায়, গণভোটের প্রচারণায় ব্যবহৃত বিশেষ প্রচারযান ‘সুপার ক্যারাভান’ পরিচালনায় ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা খরচ দেখান সর্দার আমিরুল। অথচ বাস্তবে এর মধ্যে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা ব্যক্তিগতভাবে বহন করেন ঢাকা মহানগর উত্তর এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব আবু বকর সিদ্দিক। তাকে দলীয় তহবিল থেকে কোনো অর্থ দেওয়া হয়নি বলেও জানা গেছে। একইভাবে ঢাকা মহানগর উত্তরের একটি আসনের নির্বাচনে ভোটার স্লিপ ছাপানোর জন্য ১ লাখ ২০ হাজার টাকা অনুদান দেন দলেরই এক সদস্য। কিন্তু সে খরচ তিনি দলের পক্ষ থেকে দেখিয়েছেন। গণভোটের লিফলেট ছাপানোর ক্ষেত্রেও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। দলীয় এক নেতার ব্যক্তিগত সহায়তায় ৯০ হাজার টাকা ব্যয়নির্বাহ হলেও সে খরচও দলীয় তহবিল থেকে দেখানো হয়।
ঢাকা মহানগর উত্তর এনসিপির একাধিক নেতা জানালেন, সাধারণ সভায় সর্দার আমিরুল ইসলামকে ব্যয়ের হিসাব নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি সুস্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। অন্তত সাড়ে ৪ লাখ টাকা দলকে ফিরিয়ে দিতে বলা হলেও বিষয়টি এড়িয়ে যান তিনি।
ওই সভায় উপস্থিত থাকা শীর্ষস্থানীয় এক নেতা আগামীর সময়কে বললেন, ‘তাকে (আমিরুল) ১০ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি ১১ লাখ টাকার খরচ দেখান। অথচ বেশিরভাগ খাতেই কোনো গ্রহণযোগ্য কাগজপত্র বা হিসাব ছিল না। বিভিন্ন নেতার ব্যক্তিগত অনুদানকেও দলীয় ব্যয় হিসেবে দেখিয়েছেন।’
এনসিপি নেতাদের অভিযোগ, অন্তত ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা এভাবে তছরুপ করা হয়েছে। এ ছাড়া মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা যে অর্থ খরচ করেছেন, তারও পুরো টাকা পরিশোধ করা হয়নি। কেউ ২০ হাজার টাকা খরচ করেও পেয়েছেন ১০ হাজার, আবার কেউ ১৫ হাজার খরচ করে পেয়েছেন মাত্র ৫ হাজার টাকা। সাধারণ সভায় তোলা হয় এসব অভিযোগও।
দলের শীর্ষস্থানীয় আরেক নেতা জানান, মহানগর উত্তরের সভার পর বিষয়টি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নজরে আনা হয়। পরে মৌখিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় সর্দার আমিরুলকে। একই সঙ্গে সাংগঠনিক শৃঙ্খলাভঙ্গ ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে নির্বাচনের পর গত মার্চে তাকে দেওয়া হয়েছিল শোকজ নোটিসও। তবে সেই নোটিসের কোনো জবাব দেননি তিনি।
তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগই ভিত্তিহীন বলে দাবি এনসিপি থেকে সদ্য পদত্যাগ করা সর্দার আমিরুল ইসলাম সাগরের। আগামীর সময়কে তিনি বললেন, ‘আমি এনসিপি থেকে পদত্যাগ করায় উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমাকে হেয়প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করা হচ্ছে। রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতেই আনা হচ্ছে এসব অভিযোগ।’
গণভোটের প্রচারণায় ব্যয়ের অসংগতির অভিযোগ প্রসঙ্গে আমিরুল দাবি করেন, এনসিপি নেতা আবু বকর সিদ্দিকের সঙ্গে ব্যয়ের বিষয়টি পারস্পরিক সমন্বয়ের ভিত্তিতেই হয়েছিল।
তার ভাষ্য, ‘আবু বকর সিদ্দিক ৩ লাখ টাকার মতো গণভোটের প্রচারণায় খরচ করেছিলেন। তিনি আমাকে জানিয়েছিলেন, আমি যদি মেয়র নির্বাচন করি তাহলে তার দায়িত্বে বিলবোর্ড করে দেবেন। পরে আমি বলি, সেটা আমি নিজেই করব। এরপর প্রায় ৩ লাখ টাকার পোস্টার করেছি। এভাবেই টাকাটা সমন্বয় করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সিনিয়র নেতাদের সঙ্গেও কথা হয়েছিল।’
তবে সাংগঠনিক ব্যয়ের পুরো ১০ লাখ টাকার নির্দিষ্ট হিসাব বা কাগজপত্র আছে কি না— এমন প্রশ্নের সরাসরি জবাব দিতে পারেননি আমিরুল; বরং তিনি সামগ্রিক অভিযোগই অস্বীকার করেন।
টাকা সমন্বয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে এনসিপির নাম প্রকাশে অনাগ্রহী এক নেতা বললেন, ‘এখানে টাকা সমন্বয়ের কিছুই হয়নি। বরং দলের ফান্ডের কথা জেনে আবু বকর সিদ্দিক অভিযোগ জানিয়েছিল, তিনি কোনো টাকা পাননি। এ ছাড়া আমিরুল ইসলাম যে পোস্টার করেছেন, সেটি তার ব্যক্তিগত প্রচারের জন্য— দলের কোনো প্রচারণা ছিল না। তাও পোস্টারের পেছনে ৩ লাখ নয়, সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা খরচ করতে পারেন।’
গণভোটের প্রচারণার অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়েছিল ঢাকা মহানগর উত্তর এনসিপির আহ্বায়ক ও কেন্দ্রীয় সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীবের কাছে। তিনি আগামীর সময়কে বলেন, ‘মহানগরের সাধারণ সভায় আমিরুল ভাইকে নির্বাচনকালে তার দায়িত্ব পালন নিয়ে সদস্যদের মধ্য থেকে বেশ কিছু প্রশ্ন উত্থাপিত হয়।’
সর্দার আমিরুল ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী। একসময় ছিলেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির মুক্তিযুদ্ধ ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক। ২০১৭ সালের আগস্টে ফেসবুকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে হয়েছিলেন বহিষ্কার। গত বছরের জুনে যোগ দেন এনসিপিতে।
বহিষ্কারের আগে দেওয়া ফেসবুক পোস্টে সর্দার আমিরুল ইসলাম দাবি করেন, এনসিপি ‘মধ্যপন্থী রাজনীতির নতুন শক্তি’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও নির্বাচনকালীন ডানপন্থী জোটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত তাকে হতাশ করেছে। তিনি লেখেন, নির্বাচনের পরও দলে ডানপন্থার বাড়ন্ত লক্ষ্য করেছেন এবং সে কারণেই গত দুই মাস নিষ্ক্রিয় ছিলেন। এনসিপির দেওয়া প্রতিশ্রুতির সঙ্গে কার্যক্রমের সংগতি পাননি। সাধারণ মানুষের আশাভঙ্গের পরিস্থিতিতে এনসিপির নীতি ও কৌশলের সঙ্গে ক্রমাগত মতভেদ বাড়তে থাকায় পদত্যাগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন।
তবে দলীয় একাধিক নেতা মনে করছেন, আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে সাংগঠনিকভাবে চাপে পড়ে যাওয়ার পর রাজনৈতিক মতপার্থক্যের বিষয়টি সামনে এনে সম্মানজনক প্রস্থানের চেষ্টা করেছেন আমিরুল।
দলের একাধিক সূত্র জানায়, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়রপ্রার্থী হওয়ার বিষয়ে আশাবাদী ছিলেন আমিরুল। শেষ পর্যন্ত সে সম্ভাবনা না থাকায় তিনি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ওপরও ক্ষুব্ধ ছিলেন।
পদত্যাগের বিষয়ে আমিরুল ইসলাম আগামীর সময়কে বললেন, ‘নির্বাচনের আগে থেকে শুরু করে এনসিপিতে ডানপন্থার উত্থান হয়েছে। এ কারণেই আমি মনে করছি, এনসিপি তার লক্ষ্য থেকে সরে গেছে। তাই আশাহত হয়ে আমি পদত্যাগ করি। মেয়রপ্রার্থী হতে না পারার কষ্ট অবশ্যই আছে। তাড়াহুড়ো করে মেয়রপ্রার্থী ঘোষণার বিষয়টি আমার পছন্দ হয়নি।’
ভারপ্রাপ্ত সদস্য সচিবের দায়িত্ব পেলেন দিনা: এনসিপি ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক কমিটির ভারপ্রাপ্ত সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন সাদিয়া ফারজানা দিনা। গতকাল সোমবার দুপুরে দলের সদস্য সচিব আখতার হোসেন এবং মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া স্বাক্ষরিত এক নোটিসে জানানো হয় এ তথ্য।
এর আগে ঢাকা মহানগর উত্তর এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করছিলেন সাদিয়া।