Image description
ডলার ও সুদের ধাক্কায় ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধের বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়েছে বাংলাদেশ। আওয়ামী সরকারের আমলে বিদেশ থেকে অপরিকল্পিতভাবে ও বেপরোয়া গতিতে চড়া সুদে যেসব ঋণ নেওয়া হয়েছিল সেগুলোর মেয়াদ পূর্তি শুরু হয় ২০২২ সাল থেকেই। বৈশ্বিক মন্দার কারণে ওইসব ঋণ পরিশোধ স্থগিত করে মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। সেগুলো এখন বাড়তি সুদ ও দণ্ড সুদসহ পরিশোধ করতে হচ্ছে। এতে বিপুল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা খরচ হচ্ছে। এরমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ডলারের ওপর এমনিতেই বাড়তি চাপের সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে রাজস্ব আয় কমে যাওয়ায় নতুন ঋণ নিয়ে পুরোনো ঋণের কিস্তি শোধ করতে হচ্ছে, অন্যদিকে বাজার থেকে বাড়তি দামে ডলার কিনতে গিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও চাপে পড়েছে। ফলে দেশীয় ও বৈদেশিক-উভয় দিক থেকেই অর্থনীতি এখন এক ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের সময় ২০০৯ সালের শুরুতে দেশের বৈদেশিক ঋণের স্থিতি ছিল ২ হাজার ২৭৯ কোটি ডলার। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে ২০২৪ সালের জুনে এর স্থিতি বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ১০ হাজার ৪০৭ কোটি ডলার। ওই সময়ে ঋণের স্থিতি বেড়েছে ৮ হাজার ১২৮ কোটি ডলার বা সাড়ে চারগুণের বেশি। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত এর স্থিতি আরও বেড়ে ১১ হাজার ৩৫২ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। আলোচ্য ঋণের মধ্যে সরকারি খাতে ৯ হাজার ৩৪২ কোটি ডলার এবং বেসরকারি খাতে ১ হাজার ৯৭৮ কোটি ডলার। সরকারি খাতের ঋণের সিংহ ভাগই দীর্ঘমেয়াদি ঋণ। বিভিন্ন প্রকল্পের বিপরীতে এসব ঋণ নেওয়া হয়েছে। এরমধ্যে বৈদেশিক ঋণের বেশিরভাগ প্রকল্পই বাস্তবায়ন হয়নি। কিন্তু ঋণ নেওয়া হয়েছে। ২০২২ সালে বৈশ্বিক মন্দা দেখা দিলে প্রবল ডলার সংকটের কারণে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ স্থগিত করা হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময় পর্যন্ত ঋণের কিস্তি পরিশোধ স্থগিত করা হয়। ফলে ওইসব ঋণের বিপরীতে মূল কিস্তির সঙ্গে নিয়মিত সুদের পাশাপাশি অতিরিক্ত সুদ ও দণ্ড সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে স্থানীয় টাকা দিয়ে ডলার কিনে ঋণ শোধ করতে হয়। ঋণের কিস্তি পরিশোধের শুরুর দিকে অর্থাৎ ২০২২ সালের মার্চে প্রতি ডলারের দাম ছিল ৮৬ টাকা। এখন তা বেড়ে ১২৩ টাকা ৪০ পয়সায় ওঠেছে। ওই চার বছরে ডলারের দাম বেড়েছে ৩৭ টাকা ৪০ পয়সা। এ হিসাবে এখন ঋণ শোধ করতে প্রতি ডলারে ৩৭ টাকা ৪০ পয়সা বেশি দিতে হচ্ছে। বাড়তি দামে ডলার কেনা ও বেশি সুদ পরিশোধের ফলে সরকারি ও বেসরকারি খাতের বাড়তি অর্থ খরচ হচ্ছে। এতে দুই খাতই অর্থ সংকটে পড়েছে। সরকারের রাজস্ব আয় কম হওয়ায় ঋণের কিস্তি পরিশোধেও সরকারকে নতুন ঋণ নিতে হচ্ছে। অথচ বৈদেশিক ঋণনির্ভর বেশিরভাগ প্রকল্প থেকেই কোনো সুফল মিলছে না। যা সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।

২০২২ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বৈদেশিক ঋণ এমন সব প্রকল্পেই নেওয়া উচিত যেসব প্রকল্প থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয় হবে। এতে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের ঝুঁকি কম হবে। এর বাইরে স্থানীয় মুদ্রা আয় হবে এমন প্রকল্পে বৈদেশিক ঋণ নিলে বাজার থেকে ডলার কিনে তা পরিশোধ করতে হবে। তখন ডলারের বাজারে চাপ বাড়বে।

আইএমএফের প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, ২০০৫ সালে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধের পরিমাণ ছিল মোট রাজস্ব আয়ের ১৫ শতাংশের সামান্য বেশি। ওই সময়ে রাজস্ব আয় হয়েছিল ৩১ হাজার ৩২৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে সুদ পরিশোধ করা হয়েছিল ৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। ২০১০ সালে তা বেড়ে মোট রাজস্বের প্রায় ২৬ শতাংশে ওঠে। গত বছরের ডিসেম্বরে তা বেড়ে মোট রাজস্ব আয়ের ৩০ শতাংশে ওঠে। অর্থাৎ বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধ বাবদ ব্যয় লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করে আইএমএফ। রাজস্ব আয় কম হওয়ার কারণে এ ঝুঁকির মাত্রা আরও বেশি। যা অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে চাপের সৃষ্টি করছে। আগামী অর্থ বছরে এ ব্যয় কিছুটা কমে মোট রাজস্ব আয়ের ২৭ শতাংশে নামতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, গত ১৫ বছরে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধ বেড়েছে প্রায় ৬ গুণ এবং সুদ পরিশোধ বেড়েছে ১২ গুণের বেশি। ২০১০ সালে মূল ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা হয়েছিল ৮২ কোটি ১০ লাখ ডলার। গত বছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৯০ কোটি ৪০ লাখ ডলার। একই সময়ে সুদ পরিশোধ ২০ কোটি ৩০ লাখ ডলার থেকে বেড়ে ২৪৪ কোটি ৩০ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে দেখা গেছে, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণের কিস্তি পরিশোধ ২০১৯-২০ অর্থবছরে ছিল ১২৭ কোটি ডলার। গত অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৬০ কোটি ডলার। একই সময়ে এ ধরনের ঋণের সুদ পরিশোধ ৪৫ কোটি ডলার থেকে বেড়ে ১৫০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। স্বল্প মেয়াদি ঋণের সুদ পরিশোধ আলোচ্য সময়ে বেড়েছে।

২০০৯ সালের শুরুতে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২৪ দশমিক ৯০ শতাংশ ছিল বৈদেশিক ঋণ। বর্তমানে কিছুটা কমে ২৪ দশমিক ৫০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সাধারণত জিডিপির ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বৈদেশিক ঋণকে ঝুঁকিমুক্ত ধরা হয়। এ হিসাবে বাংলাদেশ ঝুঁকিমুক্ত। কিন্তু বৈদেশিক ঋণের বিপরীতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অনুপাত কমছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে রিজার্ভের বিপরীতে বৈদেশিক ঋণের অনুপাত ছিল ৫৭ দশমিক ১০ শতাংশ। এখন তা কমে ২৩ শতাংশে নেমেছে। অর্থাৎ যে হারে বৈদেশিক ঋণ বাড়ছে, সেই হারে রিজার্ভ বাড়ছে না। যে কারণে বৈদেশিক ঋণের পরিশোধের প্রবণতা এখন ঝুঁকিতে চলে গেছে।

বেশিরভাগ বৈদেশিক ঋণ শোধ করা হয় বাজার থেকে ডলার কিনে। ডলার কিনতে নগদ টাকার জোগান দিতে হয় সরকারের রাজস্ব আয় থেকে। বর্তমানে রাজস্ব আয় কমে গেছে। সরকারের চলতি ব্যয়ই মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে রাজস্ব আয় দিয়ে। ফলে সরকারকে ঋণ করে চলতে হচ্ছে। এমন অবস্থায় বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে রাজস্ব আয় থেকে অর্থের জোগান দেওয়া আরও চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছে। ফলে সরকারকে এখন নতুন ঋণ করে আগের দেশি-বিদেশি ঋণ শোধ করতে হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বা অনিশ্চয়তার কারণে ঝুঁকির মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ মধ্যপ্রাচ্যে সৃষ্ট অস্থিরতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলসহ প্রায় সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়ছে। পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে আমদানি ব্যয় বেড়ে গিয়ে ডলারের ওপর চাপ বেড়েছে। পাশাপাশি রিজার্ভও চাপে পড়েছে। এসব কারণে আইএমএফ ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে ঝুঁকি দেখছে।