Image description

দেশে মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ও অনলাইন সেবার ব্যবহার আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। তবে এসব প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়লেও এখনো দক্ষতা, নিরাপদ ব্যবহার এবং সমান সুযোগ নিশ্চিত হয়নি। আইসিটি ব্যবহারকারীদের মধ্যে মৌলিক ডিজিটাল দক্ষতা তুলনামূলকভাবে বেশি থাকলেও উন্নত এবং জটিল কাজের দক্ষতায় বড় ঘাটতি রয়েই গেছে। প্রযুক্তি ব্যবহারে নারী-পুরুষের পাশাপাশি শহর ও গ্রামের মধ্যেও রয়েছে বড় বৈষম্য। সেইসঙ্গে প্রযুক্তি ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা, অধিক ব্যয় এবং উন্নত ডিজিটাল দক্ষতার ঘাটতি দেশের ডিজিটাল অগ্রযাত্রায় বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এমন চিত্র উঠে এসেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘আইসিটি ব্যবহারের সুযোগ ও প্রয়োগ পরিমাপ’ শীর্ষক জরিপে। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পরিসংখ্যান ভবনে এ জরিপের ফলাফল প্রকাশ করা হয়। এ সময় দেশে মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা, গ্রাম ও শহরের পার্থক্য এবং নারী-পুরুষের ব্যবহারের সুবিধা তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব আলেয়া আক্তার। আরও উপস্থিত ছিলেন বিবিএস মহাপরিচালক মো. ফরহাদ সিদ্দিকসহ প্রকল্পের কর্মকর্তারা।

আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে দেশের অর্ধেক নারীই ইন্টারনেট সেবার বাইরে রয়ে গেছেন বলে জানিয়েছে বিবিএস। সংস্থাটির জরিপে দেখা যায়, দেশের মোট জনসংখ্যার ৫৩ দশমিক ৪ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। এর মধ্যে পুরুষ ৫৬ দশমিক ৬ শতাংশ, আর নারী ব্যবহারকারী ৫০ দশমিক ২ শতাংশ। এ ছাড়া উচ্চমূল্যর কারণে ইন্টারনেটের ব্যবহারে এখনো অনাগ্রহী ৪৬ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ।

বিবিএসের প্রকাশিত এই জরিপের তথ্য অনুযায়ী, দেশের অর্ধেকের বেশি মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করলেও শহর ও গ্রামের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে। জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, শহর এলাকায় ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ৭৫ দশমিক ৭ শতাংশ হলেও গ্রামে তা মাত্র ৪৩ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থাৎ, শহর এবং গ্রামের মধ্যে প্রযুক্তি ব্যবহারের ব্যবধান ৩২ দশমিক ১ শতাংশ পয়েন্ট।

গ্রাম ও শহরের ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা কম্পিউটার ও ল্যাপটপের সীমিত ব্যবহারের সুযোগ। জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, গ্রামের মাত্র ৩ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবারের কম্পিউটারের সুবিধা রয়েছে, যা শহরের তুলনায় (২১.১%) অনেক কম। ব্যক্তিগত পর্যায়েও গ্রামের মাত্র ৫ শতাংশ মানুষ কম্পিউটার ব্যবহার করার সুযোগ পান, যেখানে শহরের ২৫ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে এগিয়ে যাচ্ছেন। অর্থাৎ, প্রযুক্তির বিস্তার ঘটলেও তা সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছায়নি।

জরিপে পরিবারভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণেও একই বৈষম্যের চিত্র উঠে আসে। ঢাকায় ইন্টারনেট ব্যবহারকারী সবচেয়ে বেশি। বিপরীতে, পঞ্চগড়ে সবচেয়ে কম। কম্পিউটার ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ঢাকার পরিবারগুলো এগিয়ে থাকলেও সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে ঠাকুরগাঁও। এ তথ্য অনুযায়ী, গ্রামীণ অঞ্চলে কম্পিউটার ও উন্নত প্রযুক্তির সীমিত ব্যবহার ডিজিটাল বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।

বিবিএসের জরিপে ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির পথে বড় বাধা হিসেবে সামনে এসেছে খরচের বিষয়টি। জরিপে অংশ নেওয়া ৪৩ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ জানান, ইন্টারনেটের উচ্চমূল্যের কারণে তারা এ সেবা ব্যবহার করতে চান না। বিশেষ করে গ্রামীণ ও নিম্নআয়ের মানুষের ক্ষেত্রে এ উচ্চমূল্য এখনো একটি বড় প্রতিবন্ধকতা।

জরিপ বলছে, দেশের ৮৮ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন। তবে নিজস্ব মোবাইল ফোন রয়েছে ৬৪ দশমিক ৪ শতাংশের। অন্যদিকে, কম্পিউটার ব্যবহারকারী মাত্র ১১ দশমিক ৩ শতাংশ। ফলে প্রযুক্তি ব্যবহারকারীদের একটি বড় অংশ এখনো মোবাইলনির্ভর, যা মৌলিক যোগাযোগ ও তথ্য গ্রহণে সহায়ক হলেও উন্নত দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।

দেশে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লেও তা এখনো মূলত মৌলিক কাজেই সীমাবদ্ধ। সবচেয়ে বেশি প্রচলিত দক্ষতা হলো কপি-পেস্ট। জরিপে দেখা গেছে, কম্পিউটার ব্যবহারকারীদের মধ্যে ৮৪ দশমিক ৪ শতাংশ কপি-পেস্ট করতে পারেন। ফাইল পাঠাতে স্প্রেডশিট ফর্মুলা ব্যবহার করতে পারেন ৫০ শতাংশের কিছু বেশি ব্যবহারকারী। অ্যাপ ইনস্টল করতে পারেন প্রায় ৪০ শতাংশ, প্রেজেন্টেশন সফটওয়্যার ব্যবহার করতে পারেন প্রায় ৩০ শতাংশ। কিন্তু ফাইল ট্রান্সফারের মতো তুলনামূলক জটিল কাজে দক্ষতা রয়েছে মাত্র ১৫ শতাংশের কাছাকাছি।

জরিপের তথ্য বলছে, উন্নত ডিজিটাল দক্ষতার চিত্র আরও উদ্বেগজনক। ফাইল ট্রান্সফার, সফটওয়্যার সেটিংস বা জটিল ডিভাইস ব্যবস্থাপনার মতো কাজ করতে পারেন মাত্র ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ ব্যবহারকারী। অর্থাৎ, প্রায় ৮৪ শতাংশ মানুষ এখনো প্রযুক্তির গভীর ও কার্যকর ব্যবহারে পিছিয়ে। এতে কর্মসংস্থান, শিক্ষা, উদ্যোক্তা কার্যক্রম এবং আধুনিক সেবার সুযোগ থেকে বড় একটি জনগোষ্ঠী বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

ডিজিটাল নিরাপত্তা সচেতনতার ক্ষেত্রেও মিশ্র চিত্র উঠে এসেছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৭৮ দশমিক ৫ শতাংশ ব্যবহারকারী জানিয়েছেন, সাইবার আক্রমণের শিকার হলে তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সক্ষম। ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে ৫০ দশমিক ৫ শতাংশ ব্যবহারকারীর জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ভাইরাস ও ম্যালওয়্যার। অর্থাৎ, নিরাপত্তা সচেতনতা বাড়লেও তা এখনো পর্যাপ্ত নয়।

ইন্টারনেট ব্যবহারের উদ্দেশ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত তিন মাসে ৬৪ দশমিক ৪ শতাংশ ব্যবহারকারী সরকারি চাকরি-সংক্রান্ত তথ্য খুঁজেছেন। খেলাধুলাবিষয়ক তথ্য অনুসন্ধান করেন ৪৯ দশমিক ৮ শতাংশ। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও কনটেন্ট ও বিনোদনমূলক ব্যবহারও উল্লেখযোগ্য। তবে অনলাইনে কেনাকাটা করেছেন মাত্র ১১ দশমিক ৬ শতাংশ ব্যবহারকারী। অর্থাৎ, ডিজিটাল অর্থনীতির সুযোগ এখনো সীমিত পরিসরে ব্যবহার হচ্ছে।