নতুন অর্থবছর সামনে রেখে বাজেটের সর্বোচ্চ বরাদ্দপ্রাপ্ত ১০টি অগ্রাধিকার খাতের বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এসব খাতের মধ্যে রয়েছে-পরিবহণ ও যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, শিক্ষা ও প্রযুক্তি, গৃহায়ন ও কমিউনিটি সুবিধা, স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন, কৃষি, পরিবেশ জলবায়ু ও পানিসম্পদ, শিল্প ও অর্থনৈতিক সেবা এবং বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি। দীর্ঘ দেড় যুগেরও বেশি সময় পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দেশ পরিচালনার সুযোগ পেয়েছে। আগামী বাজেট প্রণয়ন ও চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার গুরুত্বসহ ১০ খাতে অর্থের বরাদ্দ সঠিকভাবে ব্যবহার করতে চায়।
একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে অগ্রাধিকার এসব খাতে বরাদ্দের অর্থ সঠিক ব্যবহার করা হয়েছে কিনা খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া ওই সরকারের সময়ে রাজনৈতিক স্বার্থে এসব বরাদ্দ হয়েছে কিনা সে বিষয়েও জানতে চাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এ লক্ষ্যে বাজেটে সর্বোচ্চ বরাদ্দপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সিনিয়র সচিব ও সচিবদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন তিনি। এ বিষয়ে ৭ এপ্রিল অর্থ মন্ত্রণালয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, নতুন বাজেট প্রণয়ন সামনে রেখে অর্থমন্ত্রী সর্বোচ্চ বরাদ্দপ্রাপ্ত খাতগুলো নিয়ে সংশ্লিষ্ট সিনিয়র সচিব ও সচিবদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। বিগত দিনে এসব খাতের বরাদ্দ, অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন নিয়ে অর্থমন্ত্রী খোঁজখবর নিচ্ছেন। নতুন অর্থবছরেও এসব খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হবে, না-কি অন্য কোনো খাত সংযুক্ত করা হবে-সে বিষয়ে নিজস্ব মতামত তুলে ধরবেন অর্থমন্ত্রী।
ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতার কারণে সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ। বিশ্ববাজারে সব ধরনের জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, জ্বালানির অভ্যন্তরীণ মজুত তলানিতে নেমে আসা, অবৈধ ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কারসাজির কারণে জ্বালানি খাতে অস্থিরতা ও আতঙ্ক বাড়ছে। প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত না হলে বিদ্যুৎ খাতে বিপর্যয় দেখা দেওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ অবস্থায় আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ ১৭ বছরে এ খাত উন্নয়নে কি ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল তাও অনুসন্ধান করা হবে।
সূত্র জানায়, কুইক রেন্টালের ব্যাপক দুর্নীতি, বিদ্যুৎ আমদানিতে অর্থের অপচয় এবং এ খাতে ক্যাপটিভ চার্জের আর্থিক কেলেঙ্কারির বিষয়েও জানতে চান অর্থমন্ত্রী। একই সঙ্গে বর্তমান সংকট মোকাবিলায় জ্বালানির বিকল্প উৎসের অনুসন্ধান, রেশনাল জ্বালানির ব্যবহার, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর ও ভর্তুকি এবং মূল্য সমন্বয়ের বিষয়ে আগামী বাজেটে সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করা হবে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জুন পর্যন্ত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে অতিরিক্ত ৩০০ কোটি ডলার প্রয়োজন হবে। এই অর্থ জোগাড় করতে আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও এআইআইবির কাছ থেকে ঋণ নেওয়ার চেষ্টা করছে সরকার। ইতোমধ্যে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম প্রায় ৪৯ শতাংশ এবং এলএনজির দাম ৮৩ শতাংশ বেড়ে গেছে। ব্যারেলপ্রতি তেলের দাম ৬৭ ডলার থেকে বেড়ে ১২০ এবং এলএনজি ১২ ডলার থেকে বেড়ে ২২ ডলার হয়ে গেছে। ঋণের অর্থ দিয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের অবকাঠামো উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করা হবে।
গত অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে বকেয়াসহ মোট ভর্তুকি ব্যয় হয়েছে ৫৯ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে বরাদ্দ ছিল ৩৭ হাজার কোটি টাকা, যা সংশোধিত বাজেটে কমিয়ে ৩৬ হাজার কোটি টাকায় আনা হয়। এর মধ্যে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৮ মাসে ২৬ হাজার কোটি টাকা ছাড় হয়েছে। এতে মাসিক গড় ভর্তুকি দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ২৫০ কোটি টাকা। নতুন করে আবার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগ থেকে ২০ হাজার ১৩৬ কোটি টাকা ভর্তুকি চেয়ে সম্প্রতি অর্থ বিভাগে প্রস্তাব দেওয়া হয়। ওই ভর্তুকির প্রস্তাব অনুমোদিত হলে মাসিক ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি হতে পারে। এতে পুরো অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির পরিমাণ ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
এদিকে, আগামী অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের প্রাথমিক প্রস্তুতি হিসাবে অর্থমন্ত্রী ইতোমধ্যে অর্থনীতিবিদ এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও অন্যান্য উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বিনিয়োগ নির্ভর প্রবৃদ্ধি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের রোডম্যাপ সামনে রেখে এবারের বাজেটে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়ার কথা ভাবছে সরকার। এ লক্ষ্যে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, ইজ অব ডুয়িং বিজনেস, পুঁজিবাজারের উন্নয়ন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, স্মার্ট কার্ড ও ডিজিটাল সেবার মতো বিষয়গুলোর ওপর গুরুত্বারোপ করা হবে। আসন্ন অর্থবছরের জন্য সরকার ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। যার মধ্যে কৃষি ঋণ মওকুফ, নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে সব ধরনের জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় সামগ্রিক অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। দায়িত্ব গ্রহণের পরই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পাইলট প্রকল্প হিসাবে ফ্যামিলি কার্ড চালু করেছেন। এর বাইরে কৃষি উৎপাদন বাড়ানো এবং খাদ্য নিরাপত্তা জোরদারে কৃষি কার্ড প্রদানের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয়েছে। দশ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ মওকুফ করা হয়েছে। খাল কাটা, খাল ও নদী উদ্ধার করে দেশে কৃষিবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সরকারের এসব কর্মসূচি বাজেটে অগ্রাধিকার কর্মসূচি হিসাবে বিবেচনা করা হবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফ্যামিলি কার্ড-যেটি পাইলট প্রকল্প হিসাবে নেওয়া হয়েছে, সেটি নতুন বাজেটে ‘সর্বজনীন ফ্যামিলি কার্ড’ ঘোষণা দিয়ে এর জন্য অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়া হবে।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাসরুর রিয়াজ যুগান্তরকে বলেন, বাজেটের সবচেয়ে বড় দিক হওয়া উচিত সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে পদক্ষেপ নিতে হবে। এছাড়া অগ্রাধিকার খাতগুলো এমন হবে, যেখানে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সবাই এর উপকারভোগী হতে পারেন। ইতঃপূর্বে অনেক প্রকল্প নেওয়া হয়েছে যেগুলোর বেশি প্রয়োজন ছিল না। নতুন সরকারকে এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই অগ্রাধিকার খাতগুলো বাছাই করতে হবে। চলমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি খাতের ওপর বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন।