Image description

রাজশাহী বিভাগের ছয় জেলার হাসপাতালগুলোতে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও শয্যা থাকার পরও জনবলসংকটে আইসিইউ (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) কার্যত অচল হয়ে আছে। দক্ষ চিকিৎসক ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সেবিকার অভাবে বিভাগের জয়পুরহাট, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, বগুড়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ জেলায় কমপক্ষে ৬০টি আইসিইউ শয্যা পড়ে আছে। হাসপাতালগুলোর আইসিইউ দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহারহীন থাকায় নষ্ট হচ্ছে যন্ত্রপাতিও। আইসিইউ সেবা বন্ধ থাকায় জেলা শহর থেকে রোগী পাঠানো হচ্ছে বিভাগীয় শহর রাজশাহীতে।

কিন্তু এখানেও রোগীর চেয়ে আইসিইউ শয্যা কম থাকায় প্রতিদিন অপেক্ষমাণ থাকতে হচ্ছে গড়ে ৪০ জন রোগীকে। অপেক্ষমাণ রোগীদের একটি অংশ মারা যাচ্ছে।

রাজশাহী বিভাগের স্বাস্থ্য খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আইসিইউ পরিচালনার জন্য অ্যানেসথেসিওলজিস্ট বা ক্রিটিক্যাল কেয়ার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সেবিকার দরকার হয়। কিন্তু এসব জনবলের ঘাটতির কারণে হাসপাতালগুলোতে কোটি টাকার যন্ত্রপাতি থাকলেও সেগুলো কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

বিশেষ করে শিশুদের হাম, নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগের প্রকোপ বাড়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। প্রতিদিনই বিভিন্ন জেলা থেকে রোগীদের রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে। কিন্তু এই হাসপাতালে মাত্র ৪৩টি শয্যা রয়েছে। কম জনবল দিয়ে আইসিইউ সেবা চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে।
 
রামেক হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, রামেকে ৪৩ শয্যার একটি আইসিইউ ইউনিট রয়েছে, যা যা এখনো সরকারিভাবে অনুমোদিত নয়। নিয়ম অনুযায়ী এখানে কম হলেও ১০ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক থাকার কথা। কিন্তু আছেন মাত্র একজন। প্রয়োজনীয় জনবলের তীব্র সংকটে শিক্ষার্থী ও অস্থায়ী কর্মীদের দিয়ে কোনোভাবে আইসিইউ কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। এখানে প্রতিদিন কমপক্ষে ৪০ জন রোগীকে আইসিইউ শয্যার জন্য অপেক্ষায় থাকতে হয়।
 
সূত্র মতে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ২৪০ শয্যার জেলা সদর হাসপাতালে ১০টি আইসিইউ শয্যা থাকলেও এটিতে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নেই। নেই জনবলও। ফলে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে আছে আইসিইউটি। বগুড়ার মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে আটটি আইসিইউ শয্যা থাকলেও জনবলসংকটে তা চালু করা সম্ভব হয়নি। বেসরকারি টিএমএসএস হাসপাতালেও ১৪টি আইসিইউ শয্যার মধ্যে মাত্র চারটি সচল রয়েছে। পাবনা জেলা হাসপাতালে চার শয্যার আইসিইউ উদ্বোধন করা হয়। কিন্তু জনবল ও দক্ষ টেকনিশিয়ানের অভাবে সেটিও বন্ধ রয়েছে। সিরাজগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে ছয়টি এবং শহীদ এম মনসুর আলী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ১০টি আইসিইউ শয্যা রয়েছে। আছে আধুনিক যন্ত্রপাতিও। তবে ২০১৪ সাল থেকেই এ দুই হাসপাতালে জনবলসংকটে সেগুলো অচল রয়েছে। এ ছাড়া জয়পুরহাট জেনারেল হাসপাতালে ২০২২ সালে ১০টি আইসিইউ শয্যা প্রস্তুত করা হলেও এখনো চালু করা যায়নি।

পাবনা জেলা হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলাম জানান, দীর্ঘদিন ধরেই আইসিইউ অচল পড়ে আছে। মুমূর্ষু রোগীদের পাঠাতে হচ্ছে রাজশাহীতে। অনেক দূরের পথ হওয়ায় রাস্তায় কোনো কোনো রোগী মারা যাচ্ছে। নওগাঁ জেলা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক আবুজার গাফফার কালের কণ্ঠকে বলেন, কিছুদিন আগে সাত শয্যার আইসিইউ ইউনিট এখানে চালু করার জন্য জায়গা বরাদ্দ রাখা হয়। সেখানে শুধু দেয়াল তুলে রাখা হয়েছে, কিন্তু যন্ত্রপাতি বা জনবল এখনো নিয়োগ করা হয়নি; যার কারণে আইসিইউ চালু করা যায়নি।

রাজশাহী হাসপাতালের চিকিৎসকরা অভিযোগ করেন, জেলা পর্যায়ে আইসিইউ সুবিধা না থাকায় রোগীদের দ্রুত রাজশাহীতে নিতে গিয়ে অনেক সময় জীবনহানির ঝুঁকি তৈরি হয়। বিশেষ করে গুরুতর রোগীদের জন্য এই স্থানান্তর অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।

রাজশাহী হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পি কে এম মাসুদুল ইসলাম বলেন, রাজশাহী হাসপাতালে আশপাশের জেলাগুলো থেকে অনেক রোগী আসে। অনেক সময় একেবারেই শেষ পর্যায়ে রাজশাহী হাসপাতালে পৌঁছায়। তখন তাদের আইসিইউ প্রয়োজন হয়, কিন্তু এখানে আইসিইউ শয্যা যথেষ্ট না থাকায় তাদের তাৎক্ষণিক ভর্তি করা সম্ভব হয় না।

এ বিষয়ে বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাবিবুর রহমান জানান, আইসিইউ চালু রাখতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও প্রশিক্ষিত নার্সের প্রয়োজন হয়, কিন্তু বর্তমানে এসব পদে নিয়োগ নেই। তবে ভবিষ্যতে প্রতিটি জেলা সদর হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে তিনি জানান।

রামেক হাসপাতালে তিন শিশুর মৃত্যু : রামেক হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে আরো তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে এই হাসপাতালে হাম সন্দেহে মারা গেছে ৩৮ শিশু। এ ছাড়া হাসপাতালে গতকাল শনিবার দুপুর পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ১৪৯ শিশু চিকিৎসাধীন ছিল। দুপুরে হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কুমার বিশ্বাস এসব তথ্য জানিয়েছেন। তিনি জানান, গত শুক্রবার দুপুর থেকে গতকাল শনিবার দুপুর পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে।