Image description
তামাদি হচ্ছে জনগুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ

তামাদি হচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ২০টি গুরুত্বপূর্ণ ও জনকল্যাণকর অধ্যাদেশ। এই অধ্যাদেশগুলো আইনে রূপ দিতে সংসদে উপস্থাপন করছে না বিএনপি সরকার। এসব অধ্যাদেশের মধ্যে রয়েছে-সুপ্রিমকোর্টের বিচারক নিয়োগ ও সুপ্রিমকোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, গণভোট অধ্যাদেশ, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, তথ্য অধিকার এবং রাজস্ব ও ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ অন্যতম। এসব বিষয় নিয়ে সংসদ অধিবেশন শুরুর এক মাসের আগেই রাজপথে নেমেছে বিরোধী দল। বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের রাজনীতিতে আবারও কালো মেঘ দেখা দিয়েছে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্র সংস্কারের ব্যাপারে সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। তাদের মতে, বিষয়টি রাজপথে চলে গেলে তা আর রাজনীতিবিদদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে না। এটি কারও কাম্য নয়।

দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসবিষয়ক গবেষক আলতাফ পারভেজ শনিবার যুগান্তরকে বলেন, অধ্যাদেশগুলো নিয়ে সরকারি দল বিএনপি একটি সংসদীয় কমিটি গঠন করেছিল। কিন্তু ওই কমিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলো অনুমোদন করেনি। এর ফলে এই অধ্যাদেশগুলো সংসদে উত্থাপিত না হয়ে তামাদি হয়ে যাবে। এর সারকথা হলো-সংস্কার আর হচ্ছে না। অর্থাৎ সংস্কারের বিষয়ে আমরা ‘স্কয়ার জিরোতে’ চলে গেলাম। তিনি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের আলোকে সংস্কারের যে আকাঙ্ক্ষা ছিল, ১৮ মাস ধরে যে প্রস্তুতি নেওয়া হলো, তা আর বাস্তবায়ন হলো না। তার মতে, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে একটা রেজিম (ক্ষমতা) পরিবর্তন হলো মাত্র। এটুকুই অর্জন। জনগণের প্রত্যাশা অনুসারে রাষ্ট্র, প্রশাসন এবং আইনকানুনের সংস্কার খুব একটা হলো না। আলতাফ পারভেজ বলেন, অধ্যাদেশগুলো বাতিলের মাধ্যমে ইঙ্গিত পাওয়া গেল, বিএনপি মৌলিক সংস্কারে আর রাজি হবে না। অর্থাৎ তারা সংস্কার করবে না। তিনি বলেন, ঔপনিবেশিক শাসনের থেকে বেরিয়ে আসতে যে সংস্কার প্রয়োজন, তা আর হলো না। আমরা আবার ২০২৪ সালেই ফেরত গেলাম। মাঝখানে দুটি বছর নিষ্ফল চলে গেল।

জানতে চাইলে অধ্যাদেশ মূল্যায়নে গঠিত বিশেষ সংসদীয় কমিটির প্রধান ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন যুগান্তরকে বলেন সংসদ সার্বভৌম। সংসদের সদস্যরা জনগণের দ্বারা নির্বাচিত। ফলে তারা চাইলে কোনো অধ্যাদেশ রাখতে পারেন, আবার বাতিলও করতে পারেন। তবে আমরা কোনোটিই বাতিল করিনি। কিছু অধ্যাদেশ ল্যাপস (অকার্যকর) হয়ে যাবে। এগুলো আবার বিল আকারে উত্থাপিত হবে। এই অধ্যাদেশগুলো আইনে রূপ না দেওয়ায় সংস্কার নিয়ে সরকারের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হবে কিনা জানতে চাইলে জয়নুল আবেদীন বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে কথা আসছে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার বিচারক নিয়োগের যে অধ্যাদেশ জারি করেছিল, সেখানে আইনজীবীদের প্রতিনিধি রাখা হয়নি। এছাড়াও দুর্নীতি দমন কমিশন এবং মানবাধিকার কমিশনসহ বেশ কিছু জায়গায় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের প্রতিনিধি নেই। আরও কিছু দুর্বলতা রয়েছে। ফলে কোনো কিছুই বাদ দেয়নি। দুর্বলতাগুলো সংশোধন করে পরবর্তীতে বিল আকারে উত্থাপন করা হবে।

প্রসঙ্গত, সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুসারে সংসদ না থাকলে রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন। কিন্তু সংসদ কার্যকর হওয়ার পর ৩০ দিনের মধ্যে ওই অধ্যাদেশ আইনে রূপ দিতে হয়। সেই আইনে রূপ দেওয়া সম্ভব না হলে অধ্যাদেশগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়। রাষ্ট্র সংস্কারে গত দেড় বছরে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার। এসব অধ্যাদেশ ৯ এপ্রিলের মধ্যে সংসদে বিল আকারে পাশ না হলে তা বাতিল হয়ে যাবে।

১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠন করলে ১২ মার্চ সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়। এ সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা অধ্যাদেশ মূল্যায়নে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। ১৩ সদস্যের এ বিশেষ কমিটির ১০ জনই বিএনপির এবং বাকি তিনজন জামায়াতের ইসলামীর সংসদ-সদস্য। কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন। কমিটি ১ এপ্রিল সুপারিশ জমা দিয়েছে। এতে ১৩৩টির মধ্যে ৯৮টি অধ্যাদেশ হুবহু পাশ করতে বলা হয়েছে। ১৫টি অধ্যাদেশ সংশোধিত আকারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংসদে বিল উত্থাপনের জন্য সুপারিশ করেছে। বাকি ২০টির মধ্যে ১৬টি অধ্যাদেশের ক্ষেত্রে সংসদে এখনই বিল আকারে উত্থাপন না করে পরে যাচাই-বাছাই করে অধিকতর শক্তিশালী করে নতুন বিল উত্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে। চারটি অধ্যাদেশ বাতিল করার সুপারিশ করা হয়েছে। অর্থাৎ এই ২০টি অধ্যাদেশই বাতিল হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া যে ১৫টি অধ্যাদেশে সংশোধনী আনা হচ্ছে, এর মধ্যে সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশ ও পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশও রয়েছে। তবে যেসব অধ্যাদেশ বাতিল বা সংশোধন করা হচ্ছে, তার সবগুলোতেই নোট অব ডিসেন্ট (আপত্তি) দিয়েছে বিশেষ কমিটিতে থাকা জামায়াতের তিন সদস্য।

জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার শনিবার যুগান্তরকে বলেন, জনগুরুত্বপূর্ণ ও জনকল্যাণকর বেশকিছু অধ্যাদেশ আইনে পরিণত করছে না সরকার। এই আচরণ কাম্য নয়। কারণ এর মাধ্যমে সংস্কারের ব্যাপারে সরকার আন্তরিক কিনা সেই প্রশ্ন সামনে আসছে। তিনি বলেন, গণভোট বাস্তবায়ন নিয়ে টালবাহানা করছে সরকার। এর মানে হলো দুটি। একদিনে জনরায়ের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানো হচ্ছে না। অপরদিকে জুলাই আন্দোলনে যারা জীবন দিয়ে স্বৈরাচারকে বিতাড়িত করেছে, তাদের আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান দেখানো হচ্ছে না। তিনি বলেন, জুলাই যোদ্ধাদের রক্তের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা কাম্য নয়। কারণ জনরায়কে অগ্রাহ্য করলে জনগণ এটিকে কীভাবে নেবে, তা দেখার বিষয়। সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক এ প্রসঙ্গে যুগান্তরকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করেছে।

অর্থাৎ প্রতি ৪ দিনে একটি অধ্যাদেশ পাশ হয়েছে। তিনি বলেন, আইন পাশ করার ক্ষমতা সংসদের। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার কয়েকজন আমলাকে নিয়ে একটি রুমের মধ্যে বসে অধ্যাদেশ পাশ করে রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে জারি করবে, আর পরবর্তীতে সংসদ সবকিছুই অনুমোদন করবে এটি আইন পাশের প্রক্রিয়া নয়। তার মতে, সংসদ যাচাই-বাছাই করে আইন পাশ করবে।

বাদ যাচ্ছে অধ্যাদেশ : জুলাই সনদের চূড়ান্ত আইনি ভিত্তি দিতে গণভোট আয়োজনের জন্য ২৫ নভেম্বর গণভোট অধ্যাদেশ জারি করে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। এই অধ্যাদেশের আওতায় ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গণভোটে হ্যাঁ ভোটের পক্ষে ৬৮ শতাংশ মানুষ ভোট দিয়েছেন। তবে আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অধ্যাদেশটি বাতিল হলেও গণভোটের রায় বাতিল হবে না। জানতে চাইলে সুপ্রিমকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার আহসানুল করিম যুগান্তরকে বলেন, গণভোট অধ্যাদেশটি বাতিলের সুপারিশের মানে হলো এটি আর আইনে রূপ নেবে না। তবে এটি আইনে রূপ না নিলেও গণভোট বাতিল হবে না। কারণ ওই অধ্যাদেশের অধীনে ইতোমধ্যে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে। আর এটি আইনে রূপ নেওয়ার মানে হলো ভবিষ্যতেও এই আইনের মাধ্যমে মানুষের জন্য বাধ্যবাধকতা তৈরি করা। কিন্তু সেটির আর প্রয়োজন নেই।

গুরুত্বপূর্ণ আরও যেসব অধ্যাদেশ বাদ যাচ্ছে সেগুলো হলো-সুপ্রিমকোর্টের বিচারক নিয়োগ ও সুপ্রিমকোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ। এই আদেশের মাধ্যমে বিচার বিভাগের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছিল। বাদ দেওয়া হচ্ছে দুদক অধ্যাদেশ। এর মূল কথা ছিল দুদক স্বাধীনভাবে কাজ করবে। এখানে সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। এছাড়াও গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, তথ্য অধিকার এবং রাজস্ব ও ব্যবস্থাপনার মতো জনগুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ বাদ দেওয়া হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আইনুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, জুলাই আন্দোলনের পর সংস্কার নিয়ে যে জনআকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তার একটি বাস্তবতা আছে। আবার একটি দল দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করেছে, তাদেরও একটি কর্মসূচি আছে। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশ একটি রাজনৈতিক ধারায় চলে এসেছে। ফলে পুরো বিষয়টার একটি রাজনৈতিক সমাধান দরকার। তিনি আরও বলেন, একদিকে সংস্কার না সংশোধন এই নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে। অপরদিকে জুলাই সনদের বাস্তবায়ন নিয়ে বিতর্ক চলছে। আবার এসব বিষয়ে আন্দোলনে রূপ নিচ্ছে। তিনি বলেন, আমার মতে পুরো বিষয়টি রাজনৈতিক। এসব নিয়ে রাজনীতিতে একটি চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ রাজনীতিতে আবারও কালো মেঘ দেখা দিয়েছে। ফলে রাজনৈতিক সমাধান দরকার। সংসদের ভেতরে ও বাইরে আলোচনা হতে পারে। তবে পুরো বিষয়টি রাজপথে চলে গেলে বিষয়টি আর রাজনীতিবিদদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে না। তখন চলে যাবে কর্মীদের নিয়ন্ত্রণে। অতীতে দেখেছি, কোনো কিছু রাজপথে গেলে এর ফলাফল ভালো হয় না।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ যুগান্তরকে বলেন, যেসব অধ্যাদেশ বাতিল করা হচ্ছে, সেগুলো জনগুরুত্বপূর্ণ। এই অধ্যাদেশগুলো জারি করার কারণ হলো-ওই বিষয়ে বিদ্যমান যে আইন রয়েছে, তা ফ্যাসিস্ট সরকারের আজ্ঞাবহ। অন্তর্বর্তী সরকার তাদের প্রতিশ্রুতি অনুসারে আজ্ঞাবহ আইন পরিবর্তনের অংশ হিসাবে অধ্যাদেশ জারি করেছে। কিন্তু সেগুলো বর্তমান সরকার আইনে রূপ না দিয়ে বাতিল করতে যাচ্ছে। দ্বিতীয় বিষয় হলো সংবিধান সংস্কার। এই সংবিধান সংস্কারের জন্য গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু বিএনপি সেটি মানছে না। তারা সংসদের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন করতে চায়। কিন্তু সংসদ সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তন করতে পারে না। মৌলিক কাঠামো পরিবর্তন করতে হলে অবশ্যই গণভোট প্রয়োজন। জনগণ গণভোটের মাধ্যমে সংবিধান সংস্কার পরিষদকে সেই রায় দিয়েছে। ফলে গণরায় বাস্তবায়নের বাইরে অন্য কোনো সমাধান নেই। তিনি বলেন, বিএনপি দুভাবে সংস্কার এড়িয়ে যাচ্ছে। প্রথমত, গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ বাতিল। দ্বিতীয়ত, সংবিধান সংস্কার না করে নিজেদের মতো সংশোধন করছে। এ কারণে আমরা রাজপথে নেমেছি।