চট্টগ্রাম বন্দরের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নেওয়ার বোর্ডের যে একচেটিয়া ক্ষমতা রয়েছে, তা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বন্দরের বোর্ডে চট্টগ্রাম বন্দরের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয় ও অর্থ বিভাগের দুজন কর্মকর্তাকে যুক্ত করে ‘চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (সংশোধন) বিলের খসড়া করেছে নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়। খসড়া বিলে এ সংস্থার বোর্ডের বৈঠকে যে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে নতুন যুক্ত হতে যাওয়া দুজন সদস্যের অন্তত একজন কর্মকর্তার উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব করা হয়েছে। যে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এ দুজন সদস্যের ভোটাধিকারও রাখা হচ্ছে।
এ আইন পাশ হলে এখন পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা যেভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে আসছেন, সেই প্রক্রিয়ায় বড় পরিবর্তন আসবে। যদিও খসড়া বিলের বিরোধিতা করছেন বন্দরের শীর্ষ কর্মকর্তারা। তাদের মতে, এ সংশোধনী কার্যকর হলে সিদ্ধান্ত নিতে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হবে ও এর প্রভাবে বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
এ বিষয়ে নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. নূরুন্নাহার চৌধুরী শনিবার যুগান্তরকে বলেন, বোর্ডের সদস্য মনোনয়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনার জন্য আইনে সংশোধনী আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। খসড়া নিয়ে আলোচনা চলছে। এটি চূড়ান্ত হওয়ার পর সবার মতামত চেয়ে ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা চট্টগ্রাম বন্দরকে গতিশীল করতেই এ পদক্ষেপ নিচ্ছি। অন্যান্য বন্দরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আইন সংশোধন করা হচ্ছে।
বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এসএম মনিরুজ্জামান, সদস্য (হারবার ও মেরিন) কমডোর আহমেদ আমিন আবদুল্লাহ, সচিব মো. মাহবুব আলম তালুকদার, সদস্য (প্রকৌশল) কমডোর মো. মাযহারুল ইসলাম জুয়েল ও সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) মো. সামীমুজ্জামান বোর্ডের সদস্য। বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, তারা নিজেরা পরিকল্পনা করেন ও সব ধরনের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। চট্টগ্রাম বন্দরের কর্মকর্তাদের বাইরে কেউ বোর্ডের সদস্য নন। বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি পণ্যের সিংহভাগ চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। এটি দেশের অর্থনীতির প্রাণ হিসাবে পরিচিত। দেশের অন্য দুই সমুদ্র বন্দরের মধ্যে মোংলায় পণ্য আমদানি-রপ্তানি কম। আর পায়রা সমুদ্র বন্দর এখনো পুরোপুরি কার্যকর নয়।
সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের খসড়া বিল নিয়ে বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) নৌ সচিবের সভাপতিত্বে নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক হয়। ওই বৈঠকে নৌ প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসানও উপস্থিত ছিলেন। সেখানে খসড়া আইন নিয়ে সবার মতামত নেওয়া হয়। বৈঠকে উপস্থিত বেশির ভাগ কর্মকর্তা আইন সংশোধনের পক্ষে মতামত দেন। যদিও চট্টগ্রাম বন্দরের কর্মকর্তারা নানা ধরনের সমস্যার কথা তুলে ধরেন। ওই কর্মকর্তারা আরও বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা থাকে না। এমনকি তারা যেসব সিদ্ধান্ত নেন, তা অনেক সময় মন্ত্রণালয় জানতেও পারে না। এ কারণে বন্দরের ওপর মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ আরোপের জন্য আইন সংশোধন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে অপর একটি সূত্র জানায়, ২০২৪ সালে চট্টগ্রাম বন্দর আইনে বড় ধরনের সংশোধনী এনে একটি খসড়া তৈরি করা হয়। ওই খসড়াতে বন্দরের বোর্ড সদস্য নির্ধারণে চট্টগ্রাম বন্দরের বাইরের কর্মকর্তাদের রাখার বিধান ছিল। কিন্তু পরে সেটি আর এগোয়নি। বিএনপি সরকার গঠনের পর চট্টগ্রাম বন্দরের বিদ্যমান আইনের শুধু ৭ ও ৮ নম্বর ধারায় সংশোধনী এনেছে। ধারা ৭-এ বোর্ডে বন্দরের চেয়ারম্যান ও তিনজন সার্বক্ষণিক সদস্য এবং নৌপরিবহণ ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব বা তার চেয়ে উপরের পদমর্যাদার কর্মকর্তাকে প্রতিনিধি হিসাবে রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে বন্দরের চেয়ারম্যান ও চারজন সদস্যের প্রত্যেকে বোর্ডেরও সদস্য। প্রস্তাবিত বিল আইনে রূপান্তর হলে তখন চেয়ারম্যান ও চারজন সদস্যের মধ্যে তিনজন বোর্ড সদস্য হবেন। চেয়ারম্যান বোর্ডের প্রধান নির্বাহী হবেন। তবে কোনো কারণে চেয়ারম্যান অসুস্থ বা অনুপস্থিত থাকলে ওই সময়ে সার্বক্ষণিক সদস্যদের মধ্যে সিনিয়র একজন চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করবেন। আর ৮ ধারায় প্রস্তাবিত সংশোধনীতে খণ্ডকালীন দুজন সদস্যের অন্তত একজনের বৈঠকে উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কোরাম পূর্ণ হবে চারজন সদস্যে।
আইনের সংশোধনী উদ্দেশ্য ও কারণ হিসাবে খসড়া বিলে বলা হয়েছে, বিশ্বের সহিত সমতা বিধানের লক্ষ্যে নৌপরিবহণ খাতে অধিকতর সুশাসন ও পণ্য আমদানি-রপ্তানির সুব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা লক্ষ্য।
যেভাবে গঠিত অন্য বন্দরের বোর্ড : সংশ্লিষ্টরা বলেন, একেক সমুদ্র বন্দরের আইনে বোর্ডে সদস্য রাখার বিধান একেক ধরনের। মোংলা বন্দরের বোর্ড চেয়ারম্যান ও সংস্থার তিনজন সদস্য নিয়ে গঠিত। ওই বন্দরের বাইরের কোনো কর্মকর্তা বোর্ডের সদস্য নন। তবে ভিন্ন বিধান পায়রা সমুদ্র বন্দর আইনে। এ বন্দরের বোর্ডে চেয়ারম্যান ও তিনজন সার্বক্ষণিক সদস্য ছাড়াও তিনজন খণ্ডকালীন সদস্য রাখার বিধান রয়েছে। অর্থ, নৌ, বাণিজ্য, স্বরাষ্ট্র বা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে তিনজন যুগ্ম-সচিবকে সরকার মনোনয়ন দিতে পারবে। তবে বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের বোর্ডে খণ্ডকালীন সদস্য রাখার সুযোগ রয়েছে।