সংবিধান সংস্কারসহ জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশে ১১ দলীয় রাজনৈতিক ঐক্যের নেতারা বলেছেন, এক দলকে বিদায় করে আরেক দলকে ক্ষমতায় বসাতে জুলাই বিপ্লব হয়নি। জুলাই বিপ্লব হয়েছে ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থার জন্য রচিত বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোর পরিবর্তনের জন্য। এজন্যই সংবিধান সংস্কার করে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে হবে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলাম এমপির সভাপতিত্বে বায়তুল মোকাররম উত্তর গেটে শনিবার বিকালে ১১ দলীয় ঐক্য এই বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করে। গণভোটের রায়ের বিরুদ্ধে সরকারি দলের অবস্থানের প্রতিবাদ এবং অবিলম্বে গণরায় বাস্তবায়নের দাবিতে এই সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশ শেষে বায়তুল মোকাররম উত্তর গেট থেকে একটি বিশাল বিক্ষোভ মিছিল পল্টন, বিজয়নগর, নাইটিঙ্গেল হয়ে কাকরাইল মোড়ে গিয়ে শেষ হয়। এ সময় শত শত নেতাকর্মী ও সমর্থক জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে নানা স্লোগান দেন।
এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাও বিএনপি ক্ষমতায় থাকতে সহজে মেনে নেয়নি। অনেক রক্তের বিনিময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু করতে বিএনপি সরকারকে বাধ্য করা হয়েছিল। আজও বিএনপি সময় থাকতে সহজে গণভোটের রায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করলে বিএনপিকে বাধ্য করা হবে। রাজপথের আন্দোলন সরকারের জন্য সুফল আনে না।
সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, আমাদের জেল-জুলুম, অত্যাচারের ভয় দেখাবেন না। এসব পার করে আমরা আজ এখানে এসেছি। যদি দেশ ভালো চালাতে চান তবে সময় থাকতে গণভোটের রায় মেনে নিয়ে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করুন। আমরা আপনাদের সহযোগিতা করব। কিন্তু আপনারা জনগণের বিপক্ষে গেলে জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দল জনগণের পক্ষে রাজপথে নামতে বাধ্য হবে।
বিক্ষোভ সমাবেশে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারিকৃত অধ্যাদেশের মধ্যে যেগুলো সরকারের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে সেগুলো বিএনপি সরকারের খুব পছন্দ। কিন্তু যেসব অধ্যাদেশ জনগণের কাছে সরকারকে জবাবদিহিতে বাধ্য করে সেগুলো বিএনপির খুবই অপছন্দ। এজন্য বিএনপি বাছাই করে সেই অধ্যাদেশগুলো বাতিল করার পথে হাঁটছে।
তিনি বলেন, বিএনপির রাজনীতি একদিকে সুবিধাবাদী আরেকদিকে মোনাফেকি। তারা মুখে এক কথা বলে, কাজে আরেকটা করে। নির্বাচনের আগে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশবাসীকে গণভোটে হ্যাঁ ভোট দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। কিন্তু সরকার গঠনের পর গণভোটের রায় তারা মেনে নিচ্ছে না। প্রায় ৭০ শতাংশ জনগণের বিপক্ষে গিয়ে ক্ষমতায় টিকতে পারবেন না। আবারও যদি বিএনপির ভুলের খেসারত দিতে হয় তবে দেশবাসী বিএনপিকে আর ক্ষমা করবে না।
জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন এমপি বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে সংসদ-সদস্য বৈধ হলেও জনগণের ভোটে গণভোট জয়যুক্ত হওয়ার পর বিএনপি এখন একে বলে অবৈধ। বিএনপি নির্বাচনের আগে গণভোটের বিপক্ষে কথা না বললেও সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার পর তারা জনগণকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে। তিনি বলেন, দেশ পরিচালনার জন্য অবশ্যই সংবিধান লাগবে। কিন্তু সেই সংবিধান মুজিববাদের সংবিধান নয়, শেখ হাসিনার সংবিধান নয় বা বিএনপির মনগড়া সংবিধান নয়। সংবিধান হতে হবে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এইচএম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, বিএনপি গণভোটের রায় মেনে সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে শপথ না নিয়ে জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। যারা জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় তারা কখনো জনপ্রতিনিধি হতে পারে না। তারা ফ্যাসিবাদ কায়েম করতে চায়। তিনি বলেন, সংবিধান সংশোধন করা সংসদের রুটিন কাজ। রুটিন কাজের জন্য জুলাই বিপ্লব হয়নি, গণভোট হয়নি। জুলাই বিপ্লব এবং গণভোট হয়েছে সংস্কারের জন্য। তাই সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে হবে। জনগণ রাজপথে নেমে এলে পালানোর জায়গা খুঁজে পাওয়া যাবে না।
খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের বলেন, গণভোট অবৈধ হলে সংসদ নির্বাচনও অবৈধ। বিএনপি সরকার জনগণের বিপক্ষে হাঁটছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনগণের বিপক্ষে শুধু ফ্যাসিবাদী সরকার হাঁটে। বাংলাদেশে কোনো ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থা চলতে দেওয়া হবে না।
বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির নায়েবে আমির মুফতি মোখলেছুর রহমান কাসেমী বলেন, যারা জনগণের ভাষা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে তাদের ছাত্র-জনতা মাত্র ৩৬ দিনে ১৭ বছরের ক্ষমতার মসনদ ভেঙে দিয়েছে। আজকে যারা গণভোটের রায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করছে না তাদের ৩৬ দিন নয় ৩৬ ঘণ্টায় বিতাড়িত করতে পারে এ দেশের ছাত্র-জনতা।
লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. ওমর ফারুক বলেন, গণভোটের রায় মেনে না নেওয়ার অর্থ হচ্ছে ফ্যাসিজম প্রতিষ্ঠা করা। কিভাবে জনরায় বাস্তবায়ন করা লাগে জনগণ সেটি ভালো করেই জানে। সোজা পথে না এলে জনগণ দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলতে বাধ্য হবে।
জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহসভাপতি ও দলীয় মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান বলেন, বিএনপি ম্যানেজ ভোটের মাধ্যমে সরকার গঠন করে সংসদ নির্বাচন মানলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদ মানে না। তাদের ভাষায় সংসদ নির্বাচন বৈধ, গণভোট অবৈধ। তিনি বলেন, জনগণই নির্ধারণ করবে কোনটা বৈধ আর কোনটা অবৈধ।
জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপির পরিচালনায় অনুষ্ঠিত সমাবেশে দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসেন, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, ঢাকা মহানগরী উত্তরের সেক্রেটারি ড. রেজাউল করিম, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের নায়েবে আমির অ্যাডভোকেট ড. হেলাল উদ্দিন, সহকারী সেক্রেটারি মুহাম্মদ দেলাওয়ার হোসেন, মোহাম্মদ কামাল হোসেন এমপি, সৈয়দ জয়নুল আবেদীন এমপিসহ ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।