১২ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য গণভোট কোনো সাধারণ রাজনৈতিক আয়োজন নয়-এটি রক্তাক্ত গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে উচ্চারিত জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোয় রূপ দেয়ার চূড়ান্ত গণতান্ত্রিক পদক্ষেপ। গণভোটের পক্ষে-রাষ্ট্র রূপান্তর ও গণ-অভ্যুত্থান বাস্তবায়নে জোরালো প্রস্তাবনা, বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরাট একটি গণতান্ত্রিক সম্ভাবনা। যা মানবাধিকার, শাসন-কাঠামো, ক্ষমতার ভারসাম্য ও রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কারের জন্য ঐতিহাসিক সুযোগ।
গণ-অভ্যুত্থান রাজপথে যে- দাবি তুলেছিল, জুলাই সনদ সেই দাবির রাজনৈতিক ও নীতিগত সংহত রূপ। এটি কোনো দলীয় দলিল নয়; এটি শহীদদের রক্তে লেখা জনগণের ন্যূনতম রাষ্ট্রদর্শন।
১. শক্তিশালী ক্ষমতার ভারসাম্যের দিকে যাত্রা:
বর্তমান সংবিধানমূলক কাঠামোতে নির্বাহী ক্ষমতা এককেন্দ্রিক- প্রধানমন্ত্রীর হাতে একচ্ছত্র ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত রয়েছে। ‘হ্যাঁ’ ভোটের জয়ের মাধ্যমে এই অবস্থা বদলে যাবে। প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা সীমিত হবে এবং রাষ্ট্রপতির ভূমিকা ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক হবে। সাংবিধানিক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বিরোধী দল ও বিচার বিভাগের মতামত যুক্ত হবে। স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা, নিয়োগ কর্তৃপক্ষ ও গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রিক প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহিতা ও ভারসাম্য বাড়বে।
ফলে ক্ষমতার এককেন্দ্রীকরণ কমে, জবাবদিহিতা ও গণতান্ত্রিক দিক আরও সুদৃঢ় হবে।
২. সংসদকে শক্তিশালী ও গণতান্ত্রিক করে তোলা:
সংবিধান সংস্কারের ফলে জাতীয় সংসদ দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট হবে। উচ্চকক্ষের সদস্যরা সাধারণ ভোটের ভিত্তিতে নির্বাচিত হবেন।
সংবিধান সংশোধনের জন্য শুধুমাত্র একটি দলের ইচ্ছাই যথেষ্ট হবে না-এতে পারস্পরিক সমঝোতা বৃদ্ধি পাবে।
সংসদ সদস্যরা আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবে- যা, দলতন্ত্রের বাধ্যবাধকতা থেকে বেরিয়ে আসার পথকে উন্মুক্ত করবে। এই পরিবর্তনগুলো রাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারণকে ঔপনিবেশিক-কাঠামোর বাইরে এনে গণমুখী, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গণতান্ত্রিক করে তুলবে।
৩. মৌলিক অধিকার ও ন্যায্য সুযোগের প্রসার:
‘হ্যাঁ’ ভোটের জয়ের ফলে রাষ্ট্রের মূলনীতি ও নাগরিক অধিকারগুলো সমপ্রসারিত হবে, বিচারবিভাগ থেকে দুর্নীতি দমন কমিশন পর্যন্ত স্বাধীনতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে। এটি শুধু শাসনব্যবস্থার একটি নামমাত্র সংস্কার নয়; নাগরিকদের অধিকার ও ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া।
৪. গণভোট: অভ্যুত্থানের সাংবিধানিক রূপ:
গণঅভ্যুত্থান যদি দাবি হয়,
জুলাই সনদ যদি রূপরেখা হয়,
তবে এই গণভোট হলো বাস্তবায়ন। এর মাধ্যমে-রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক দর্শন জনগণের হাতে ফিরে আসবে, শাসনব্যবস্থায় ক্ষমতার ভারসাম্য সাংবিধানিকভাবে নিশ্চিত হবে।
বিচারবিভাগ, প্রশাসন ও নিরাপত্তা-কাঠামো জনগণের কাছে জবাবদিহির আওতায় আসবে। ভবিষ্যতে যেন আর কোনো সরকার রক্তের উপর দাঁড়িয়ে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে না পারে- সে নিশ্চয়তা তৈরি হবে। ‘হ্যাঁ’ ভোটের জয়ের মাধ্যমে সেই অভীষ্ট প্রত্যাশা বাস্তবে পরিণত হবে।
এটি প্রমাণ করবে যে, জনগণ শুধুই ক্ষমতা বদলের সমর্থক নয়, বরং তারা একটি বাস্তবিক ও অধিকতর অংশগ্রহণশীল অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র-কাঠামোর দাবি করছে।
৫. শান্তিপূর্ণ, গণতান্ত্রিক উন্নতির পথ:
অনেকে ভয় করেন যে, পরিবর্তন অস্থিরতা সৃষ্টি করবে-কিন্তু আসলে গণভোটের ফল ‘হ্যাঁ’ হলে তা গণতান্ত্রিক মূলনীতিকে শক্তিশালী করে শান্তিপূর্ণ, স্থিতিশীল ও উন্নয়নের পথকে খুলে দেবে। এটি স্বৈরাচারী মনোভাবকে বৃদ্ধির পরিবর্তে, আধুনিক-গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দিকেই নিয়ে যাবে।
যারা রাজপথে নেমেছিলেন, যারা নীরবে ক্ষত বহন করেছেন, যারা সন্তান হারিয়েছেন, চোখ হারিয়েছেন এবং যারা মুক্তিকামী, তারা এই গণভোটের স্বপক্ষে অংশ নিন। এটি কোনো দলের প্রশ্ন নয়-রাষ্ট্রের চরিত্র নির্ধারক।
গণভোটে ভোট না দেয়া মানে-
শহীদদের আত্মত্যাগকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দেয়া। জুলাই সনদকে কাগজে বন্দি করে রাখা, পুরনো দমনমূলক কাঠামোকে পুনরুজ্জীবিত হওয়ার অবারিত সুযোগ দেয়া। গণভোটে হ্যাঁ ঝুঁকি নয়; বরং ঝুঁকিপূর্ণ রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার সাংবিধানিক পথ।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিন- কারণ এটি শুধু একটি প্রশ্নের উত্তর নয়, বরং একটি জাতির ক্ষমতার ভারসাম্য, মানুষের অধিকার, জবাবদিহিতা ও গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের পুনঃনির্মাণের সংকল্প। ‘হ্যাঁ’ ভোট এমন এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত, যা আগামী প্রজন্মের জন্য শক্তিশালী, অন্তর্ভুক্তিমূলক, প্রগতিশীল ও নৈতিক একটি প্রজাতন্ত্রের ভিত্তি গড়ে দেবে। ইতিহাস আমাদের সবসময় সুযোগ দেয় না; কদাচিৎ এমন এক অলঙ্ঘনীয় সীমানার সামনে দাঁড় করায়, যা পার হওয়া ব্যতিরেকে মুক্তির অন্য পথ থাকে না। ১২ই ফেব্রুয়ারির গণভোট সেই গন্তব্য। এখানে ‘হ্যাঁ’ বলা মানে- পুরনো ও জরাজীর্ণ কাঠামোর ‘মহাপ্রয়াণ’ ঘোষণা করে আকাঙ্ক্ষিত নতুন এক শাসন ব্যবস্থার প্রবর্তন করা।
ইতিহাসের পাতায় জুলাই অবিনাশী এক সাক্ষী হয়ে থাকবে। সেই ত্যাগের মহিমা ধরে রাখতে আজ রাষ্ট্র সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই। জুলাই সনদের বাস্তবায়ন মানেই হলো শহীদদের স্বপ্নের প্রতিফলন। সময় এসেছে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার, সময় এসেছে ব্যালটের মাধ্যমে বিপ্লবকে পূর্ণতা দেওয়ার। গণভোটে আপনার ইতিবাচক রায় কেবল একটি ভোট নয়, বরং আগামীর নিরাপদ বাংলাদেশের গ্যারান্টি। আসুন, ইতিহাসের বিচারালয়ে আমরা যেন মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারি- গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত করে সেই দায় মোচনের অংশীদার হোন।
লেখক: গীতিকবি ও সংবিধান বিশ্লেষক
[email protected]