Image description

জাতীয় নির্বাচনের আর মাত্র ১০ দিন বাকি। ভোটের প্রচারণায় তুমুল ব্যস্ত দুই সহস্রাধিক প্রার্থী। এই প্রচারণায় দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটছে একের পর এক সংঘর্ষের ঘটনা। নির্বাচনী সহিংসতায় ঘটছে প্রাণহানিও। এতে ভোটারদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে শঙ্কা। অনেকেই বলছেন- ভোটের দিন কী হবে কিছুই বলা যাচ্ছে না। সংঘাতময় পরিবেশের কথা ভেবে কেউ কেউ আবার ভোট প্রদান এড়িয়ে যেতে চাচ্ছেন।

পুলিশ সূত্র বলছে, তফসিল ঘোষণার পর থেকে সারা দেশে কমপক্ষে ২ শতাধিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এরমধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বী সমর্থকদের সঙ্গে সংঘর্ষ ৭৩টি, প্রচারকাজে বাধা ২২টি, হামলার ঘটনা ১৫টি, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ১৪টি এবং প্রার্থীর ওপর আক্রমণের অন্তত ৯টি ঘটনা ঘটেছে।

এদিকে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য বলছে, ২২শে জানুয়ারি নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর দুই সপ্তাহ না যেতেই সারা দেশে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে অন্তত ৪২টি। আর তফসিল ঘোষণার পর থেকে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন কমপক্ষে ১৫ জন। এরমধ্যে সংঘর্ষে ৪ জন নিহত হয়েছেন।

আর বেসরকারি সংস্থা মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) তথ্য দিয়েছে, প্রচারণা শুরুর পর থেকে নির্বাচনে অংশ নেয়া অন্যতম বড় দুই দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের মধ্যে মোট ৬৪টি নির্বাচনী সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব সহিংসতায় চারজনের মৃত্যুসহ আহত হয়েছেন অন্তত ৫০৯ জন। এ ছাড়াও অন্তর্দ্বন্দ্বে ১৩টি, স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের সঙ্গে ৯টিসহ দেশ জুড়ে একের পর এক সংঘর্ষের ঘটনা প্রতিদিনই ঘটছে। এসব ঘটনাতে নিহতের পাশাপাশি আহতদের তালিকাও ভারী হচ্ছে।

সম্প্রতি উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলা মিনি স্টেডিয়ামে শেরপুর-৩ আসনের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নিয়ে আয়োজিত ‘নির্বাচনী ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে’ সংঘর্ষের ঘটনা দেশ জুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। অনুষ্ঠানে চেয়ারে বসাকে কেন্দ্র করে প্রথমে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীরা বাকবিতণ্ডায় জড়ান। একপর্যায়ে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়। এতে উভয় পক্ষের অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হন। আহত শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি রেজাউল করিম ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। 

এর আগে ময়মনসিংহের ধোবাউড়ায় নির্বাচনী প্রচারণাকে কেন্দ্র করে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে নজরুল ইসলাম নামে এক কর্মী নিহত হয়েছেন। তিনি ময়মনসিংহ-১ (হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়া) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী সালমান ওমর রুবেলের সমর্থক ছিলেন। নিহত নজরুল ইসলাম ধোবাউড়ার রামসিংহপুর এলাকার হাজী মফিজ উদ্দিনের ছেলে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র বলে, শুক্রবার সন্ধ্যায় এরশাদ বাজারে স্বতন্ত্র প্রার্থী ও বিএনপি নেতা সালমান ওমর রুবেলের একটি নির্বাচনী অফিস উদ্বোধনের প্রস্তুতি চলছিল। এ সময় বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্সের সমর্থক রুমানসহ একদল কর্মী সেখানে উপস্থিত হয়। অফিস উদ্বোধন নিয়ে উভয়পক্ষের মধ্যে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে রুমান দেশীয় অস্ত্র (চাকু) দিয়ে নজরুল ইসলামের ওপর হামলা চালান। বুকের বাঁ পাশে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে নজরুল মাটিতে লুটিয়ে পড়লে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে দ্রুত ধোবাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

এ ছাড়াও নির্বাচনী সহিংসতায় কিশোরগঞ্জ-২ আসনের কটিয়াদি উপজেলার আচমিতা ইউনিয়ন বিএনপি’র সাবেক সভাপতি সাবেক ইউপি সদস্য মো. কামাল উদ্দিন ও নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের কাঞ্চনে আজহার নামে এক স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা নিহত হয়েছেন। গত শনিবার দুপুরে যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার গঙ্গানন্দপুর ইউনিয়নে বিএনপি ও জামায়াত সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। এতে অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। 

একই দিন সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার টবগী ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মুলাইপত্তন গ্রামে নির্বাচনী প্রচারণাকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে উভয়পক্ষের অন্তত ১০ থেকে ১২ জন আহত হয়েছেন। এর আগের দিন বিকালে পটুয়াখালীর বাউফলের  চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের চৌকিদার বাড়ি এলাকায় নির্বাচনী প্রচারণাকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াত নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। গতকালও সাভারের আশুলিয়ার শ্রীপুরের হাসান কলোনি এলাকায় ব্যানার নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর নির্বাচনী অফিসে হামলা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় অন্তত তিনজন আহত হন। 

এসব বিষয় নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, যেসব জেলায় নির্বাচনী সংঘর্ষ বেশি হচ্ছে, সেগুলো চিহ্নিত করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। দলীয়ভাবে কর্মীদের সংযত করতে যে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়, তা একটি দুর্বল উদ্যোগ। এ ধরনের পদক্ষেপ দিয়ে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। তিনি বলেন, নির্বাচনী সহিংসতা ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোর ভূমিকা নিতে হবে এবং আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ করতে হবে। শুধু বিবৃতি বা শোকজের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। সংঘাতপ্রবণ এলাকাগুলোতে নির্বাচন কমিশন যদি এক বা একাধিক আসনে কঠোর পদক্ষেপ নেয়, তাহলে অনেকেই সহিংস কার্যক্রম থেকে বিরত থাকবে। 

বিষয়টি নিয়ে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ও গত তিনটি নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগে গঠিত তদন্ত কমিশনের সদস্য, নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. মো. আব্দুল আলীম বলেন, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত যতোগুলো নির্বাচন হয়ে গেছে তার মধ্যে অনেকগুলো নির্বাচনের তুলনায় হয়তো এবার সংঘর্ষের সংখ্যা বেশি। আবার অনেকগুলোর চেয়ে কম।

২০১৪ সাল, ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে যা হয়েছিল তার তুলনায় এখন ভালো আছি। আবার ২০০৮ সালে যেই নির্বাচন হয়, সেই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর আমরা কিন্তু সহিংসতা তেমন দেখতেই পাইনি। সেই তুলনায় এবার বেশি। তবে যতটুকু সহিংসতা হচ্ছে এটাকে কন্ট্রোল করতে হবে। আর এটা নিয়ন্ত্রণ না করতে পারলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থা থাকবে না। একইসঙ্গে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের মধ্যে অনেক গুজব ছড়িয়ে পড়ছে। সেগুলোকেও প্রতিহত করতে হবে। আসন্ন নির্বাচনের জন্য এগুলো একটা বড় চ্যালেঞ্জ। শুধু নির্বাচন কমিশন নয় সংশ্লিষ্ট সকলে সম্মিলিতভাবেই এইগুলো মোকাবিলা করতে হবে। তা না হলে নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষ আস্থা হারাবে। 

নির্বাচনী সহিংসতা নিয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা (অব.)  লেফটেন্যান্ট জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, এই সময় যে সহিংসতাগুলো হচ্ছে, তার অনেকটাই নিজেদের দলের ভেতরেই। একই দল বা একই সংগঠনের ভেতরের দ্বন্দ্ব থেকেই অনেক সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দল ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে আরও সচেতন হতে হবে। দেশের ১৮ কোটি লোকের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা অনেক ডিফিকাল্ট কাজ। তবে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে দেয়া হবে না। সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশ সমন্বিতভাবে কাজ করছে। নির্বাচনটা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডেই হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভালো প্রস্তুতি রয়েছে। তাদের প্রস্তুতি মতো কাজ এগিয়ে গেলে আমাদের নির্বাচনটা হবে খুবই সুষ্ঠু, উৎসবমুখর এবং একেবারে ফেয়ার হবে বলেও জানান তিনি।