Image description

২০১৬ সালের ২২শে মার্চ রাত সাড়ে ৯টায় ৫০-৬০ জন লোক এসে আমাকে হাতকড়া পরিয়ে ও চোখবেঁধে বাসার নিচে নামায়। সেখানে থাকা মাইক্রোবাসে উঠিয়ে জমটুপি পরিয়ে আমাকে জেআইসিতে নিয়ে যাওয়া হয়। গুমের সময় জমটুপি পরানোর আগে ডিজিএফআইয়ের লেফটেন্যান্ট কর্নেল মখছুরুল হককে চিনে ফেলেছিলাম। জেআইসিতে আমাকে দুই ২ হাজার ৯০৮ দিন আমি আকাশ দেখিনি, চাঁদ-সূর্য দেখিনি, মেঘ-বৃষ্টি দেখিনি, গাছ-মাটি দেখিনি।

এ ছাড়াও, সেলের চারদিকে ২৪ ঘণ্টা নানা রকমের আওয়াজের কারণে আমার সার্বক্ষণিক মাথাব্যথা থাকতো। যখন মসজিদে আজান কিংবা কোনো ঘোষণা দেয়া হতো, তখন নানা রকম মেশিন দিয়ে আওয়াজ বৃদ্ধি করা হতো বলে ট্রাইব্যুনালে আংশিক সাক্ষ্য দিয়েছেন গুমের শিকার অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আযমী। জেনারেল আযমী এ মামলার ৩ নম্বর সাক্ষী। মামলার পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আজ সোমবার দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল। রোববার বিকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে তিনি এই সাক্ষ্য দেন। 

জবানবন্দিতে আযমী বলেন, ২০০৯ সালের ২৪শে জুন আওয়ামী লীগ সরকার বিনা অপরাধে, বিনা তদন্তে, বিনা বিচারে সেনাবাহিনীর সকল রীতিনীতি ভঙ্গ করে নজিরবিহীনভাবে আমার পেনশনের সকল সুবিধা হরণ করে আমাকে চাকরি হতে বরখাস্ত করে। এরপর আমাকে সেনানিবাসে প্রবেশ নিষিদ্ধ করে। পরে ২০১৬ সালের ২২শে আগস্ট আমাকে অপহরণ করা হয়ে। পরে ২০২৪ সালের ২৬শে ডিসেম্বর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অবৈধ বরখাস্তের আদেশ বাতিল করে আমাকে অবসর প্রদান করে।

তিনি বলেন, আমাকে গুম করে জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেল (জেআইসি)তে নিয়ে যাওয়া হয়। ২৩শে আগস্ট ভোরে আমি সেলের দক্ষিণ দিকে দুটো ভেন্টিলেটর দিয়ে ডিজিএফআই কমপ্লেক্সের দক্ষিণে অবস্থিত ঢাকা স্টেশন অফিসার্স মেস-বি চিনতে পারি। আমি তখন ঢাকা ক্যান্টমেন্টে চাকরিরত ছিলাম এবং আমি ওই মেসের প্রথম বাসিন্দাদের মধ্যে একজন ছিলাম। তাই আমার জানা ছিল যে, মেসের উত্তর দিকে ডিজিএফআই কমপ্লেক্সের সর্বদক্ষিণে যেই ভবনটি অবস্থিত সেটা জেআইসি (জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেল)।

তিনি বলেন, আমাকে ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট ওই সেলেই রাখা হয়েছিল। তবে অপহরণের পরদিন আমি অজ্ঞান হয়ে গেলে সেই সেলের উত্তরে অবস্থিত মেডিকেল রুমে (যা আমি পরে জানতে পেরেছি) স্থানান্তর করা হয়েছিল। আনুমানিক ৬/৭ দিন পর আমাকে আগের সেলে ফিরিয়ে আনা হয়। এই সেলটি ১১ নম্বর সেল হিসাবে চিহ্নিত এবং চাবির রিংয়ে আমি ১১ ও ভিআইপি লেখা দেখতে পেয়েছি। এরপরে আরও দু’বার আমাকে কয়েকদিনের জন্য অন্য একটি সেলে স্থানান্তর করা হয়েছিল। প্রথমবার ২০২২-এ, এক সপ্তাহের জন্য, সম্ভবত ফেব্রুয়ারি মাসে আরেকটি সেলে নিয়ে যায় এরপর ২০২৩ সালের জুন মাসে দু’দিনের জন্য ওই সেলে নিয়ে যায়। এ ছাড়া বাকি সময় (০৫ই আগস্ট ২০২৪ পর্যন্ত) আমি ১১ নম্বর সেলে ছিলাম।

তিনি আরও বলেন, আমি যে ডিজিএফআই’র কচুক্ষেত কমপ্লেক্সের জেআইসিতে ছিলাম তা আমি আরও অন্যান্যভাবে নিশ্চিত হয়েছিলাম। প্রথমত, আমি নিয়মিত আমার সেল থেকে দুটো আজান শুনতে পেতাম যার একটি ছিল বিএনএস হাজী মহসিন থেকে আরেকটি ছিল মেসের দক্ষিণে অবস্থিত অফিসারদের বাসভবন এলাকার মসজিদ থেকে। এ ছাড়া ঢাকা বিমানবন্দর (হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর) থেকে বিমান উড্ডয়নের সময় কচুক্ষেতের ওপর দিয়েই উড়ে যাওয়ার আওয়াজ আমি সেখান থেকে শুনতে পেতাম।

তিনি বলেন, মাঝে মাঝেই সেই এলাকা থেকে এম্বুলেন্সের সাইরেনের আওয়াজ পেতাম। স্টেশন মেস-বিতে সেনাবাহিনীর প্রথা অনুযায়ী বিভিন্ন পার্টিতে যে ধরনের ব্যান্ড বাজানো হয় সেই ব্যান্ডের আওয়াজও আমি শুনতে পেতাম। উপরন্তু, ১৯৮২-৮৩ সালে আমি মেস-বিতে থাকাকালীন পূর্বদিকে বনানী এমপি চেকপোস্টের পাশ দিয়ে নিয়মিত যে ট্রেন চলাচলের আওয়াজ পেতাম জেআইসি সেলে থাকাকালীন অবস্থাতেও ঠিক একই দিক থেকে আমি নিয়মিত সেই আওয়াজ পেতাম। এ ছাড়াও, সেলে যারা ডিউটি করতে আসতো, এমওডিসি (মিনিস্ট্রি অব ডিফেন্স কন্সট্যাবুলারি) এর সিপাহী, তাদের মধ্যে থেকেও কয়েকজন আমাকে নিশ্চিত করেছে যে, আমাকে কচুক্ষেতে অবস্থিত ডিজিএফআই কমপ্লেক্সের ভেতরে জেআইসিতে রাখা হয়েছে।

আযমী বলেন, আটক থাকাকালীন আমার খাদ্য, চিকিৎসা এবং অন্যান্য নানা বিষয়ে সীমাহীন নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। সেলে কোনো প্রাকৃতিক আলো বাতাস ছিল না। এই দীর্ঘ আট বছর কোনোদিন তৃপ্তি করে পেট ভরে খেতে পারিনি। কখনো একবেলা খেয়েছি, কখনো দুই বেলা খেয়েছি। খাবার এত নিম্নমানের ছিল যে, কখনো কখনো সামান্য ভাত খেয়েই থেকেছি। চিকিৎসা সেখানে অত্যন্ত অপ্রতুল ছিল। আমার চোখ, কান, দাঁতের সমস্যাসহ চর্মরোগ ও পেটের পীড়ায় সম্পূর্ণ সময় আমাকে ভুগতে হয়েছে। আমি বহুবার আমার চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করলেও আমাকে হাসপাতালে নেয়া হয়নি।