বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ একটি অবিস্মরণীয় দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। দীর্ঘ ১৮ বছরের প্রতীক্ষা, সীমাহীন জল্পনা-কল্পনা ও লাখো কোটি মানুষের আবেগ-উৎকণ্ঠার অবসান ঘটিয়ে সেদিন প্রিয় জন্মভূমিতে পা রাখেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এই প্রত্যাবর্তন কেবল একজন রাজনৈতিক নেতার স্বদেশে ফেরা নয়; বরং এটি ছিল গণতন্ত্রকামী জনতার দীর্ঘ সংগ্রামের প্রতীকী বিজয় এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
তারেক রহমানের আগমনকে কেন্দ্র করে সারাদেশে যে আবেগঘন প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে, তা স্পষ্ট করে দেয়—তিনি এখন আর শুধু একটি দলের নেতা নন, বরং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। দীর্ঘদিন ধরে যেসব মানুষ ভোটাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য লড়াই করে এসেছেন, তাদের কাছে এই দিনটি ছিল আশা ও প্রত্যয়ের নতুন আলো।
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অবদান অনস্বীকার্য। দেশমাতা বেগম খালেদা জিয়া একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, নানা রাজনৈতিক সংকট ও দমন-পীড়নের কারণে সেই পথচলা আজও অসম্পূর্ণ। তাঁর সেই অসমাপ্ত কাজের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নতুন করে গণতন্ত্র, সাম্য ও মানবিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে একটি ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করছেন বিএনপি ও সমমনা রাজনৈতিক শক্তিগুলো।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি এখন নতুন এক আদর্শিক ও কৌশলগত পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের মূল ভিত্তি—বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং জনগণের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা। এই দর্শনের আলোকে আজ দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে সহনশীলতার অভাব ও পারস্পরিক অবিশ্বাস। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংকট, একতরফা নির্বাচন ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে দুর্বল করে তুলেছে। এর ফলে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ছে, বিনিয়োগ কমছে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া কোনো দেশই টেকসই উন্নয়নের পথে এগোতে পারে না। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হলে আগে প্রয়োজন রাজনৈতিক আস্থা ও ন্যায্য প্রতিযোগিতার নিশ্চয়তা। সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা থাকলে বিদেশি ও দেশীয় বিনিয়োগকারীরা আস্থা পায়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এবং অর্থনীতি গতিশীল হয়। অন্যথায় উন্নয়ন কেবল সংখ্যার খেলায় সীমাবদ্ধ থাকে, মানুষের জীবনে তার প্রতিফলন ঘটে না।
এই প্রেক্ষাপটে রাজনীতিতে সহনশীলতার প্রশ্নটি নতুন করে সামনে এসেছে। গণতন্ত্র ও সহনশীলতা পরস্পরবিরোধী নয়; বরং একটি অন্যটির পরিপূরক। সহনশীলতা ছাড়া গণতন্ত্র কেবল একটি শব্দমাত্র হয়ে পড়ে। মতের ভিন্নতা থাকবেই—কিন্তু সেই ভিন্নতাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করার মানসিকতাই একটি পরিপক্ব গণতান্ত্রিক সমাজের পরিচয়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে, সহনশীলতার অভাবে গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, প্রতিপক্ষকে দমন করার প্রবণতা এবং প্রশাসনের দলীয়করণ দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ফলে গণতন্ত্র হয়ে পড়েছে পঙ্গুর মতো—যেমন একজন পঙ্গু মানুষ স্বাভাবিকভাবে চলতে পারে না, তেমনি সহনশীলতাহীন পরিবেশে গণতন্ত্রও সামনে এগোতে পারে না।
চলমান রাজনৈতিক সংকটের কারণে দেশের জনগণের মূল লক্ষ্য—উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থান—সবকিছুই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। রাজনীতি যখন সংঘাতমুখী হয়ে ওঠে, তখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, কর্মসংস্থানের সংকট ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা রাজনৈতিক অস্থিরতার সরাসরি ফল।
এমন বাস্তবতায় সকল রাজনৈতিক দলের মধ্যে সংলাপ, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে। গণতন্ত্রের মূল স্তম্ভ হচ্ছে রাজনীতি—আর সেই রাজনীতিকে যদি জনগণের স্বার্থের ঊর্ধ্বে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করা হয়, তবে গণতন্ত্রের ভিত দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই রাজনৈতিক সংকট নিরসনে ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগই হতে পারে একমাত্র পথ।
তারেক রহমানের সাম্প্রতিক বক্তব্য ও রাজনৈতিক অবস্থান বিশ্লেষণ করে অনেকেই মনে করছেন, তিনি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরির ওপর জোর দিচ্ছেন। যেখানে ভিন্নমত থাকবে, কিন্তু দমন-পীড়ন নয়; প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু প্রতিহিংসা নয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
গণতন্ত্রের বিকাশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। ভোটাধিকার ছাড়া গণতন্ত্র কল্পনাই করা যায় না। জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারই পারে প্রকৃত অর্থে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে। একতরফা বা প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন কেবল রাজনৈতিক সংকটই বাড়ায়, সমাধান আনে না।
বাংলাদেশের জনগণ এখন এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রত্যাশা করছে, যেখানে ভোট হবে উৎসবের মতো, ভয়ের নয়; যেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, দমন নয়; যেখানে বিরোধী দলকে শত্রু নয়, গণতন্ত্রের অংশ হিসেবে দেখা হবে। এই প্রত্যাশা পূরণ করতে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও পারস্পরিক সহনশীলতার বিকল্প নেই।
বিএনপির নেতারা বলছেন, দেশমাতা বেগম খালেদা জিয়ার অসমাপ্ত গণতান্ত্রিক স্বপ্ন বাস্তবায়নে তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন করে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। এই আন্দোলনের লক্ষ্য কোনো ব্যক্তি বা দলের বিরুদ্ধে নয়, বরং একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা—যেখানে আইনের শাসন থাকবে, মানবিক মূল্যবোধ রক্ষা পাবে এবং সকল নাগরিক সমান অধিকার ভোগ করবে।
রাজনীতিতে ঐক্য মানে মতের একরূপতা নয়, বরং লক্ষ্য ও মূল্যবোধে ঐক্য। সেই লক্ষ্য যদি হয় গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও জনগণের কল্যাণ—তবে ভিন্ন পথের মানুষও এক কাতারে দাঁড়াতে পারে। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় সেই ঐক্যই সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
সবশেষে বলা যায়, তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় সৃষ্টি করেছে। এটি সফল পরিণতি পাবে কি না, তা নির্ভর করবে রাজনৈতিক সহনশীলতা, সংলাপ এবং একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর। জনগণ এখন তাকিয়ে আছে একটি ঐক্যবদ্ধ, গণতান্ত্রিক ও মানবিক বাংলাদেশের দিকে—যেখানে রাজনীতি হবে মানুষের জন্য, ক্ষমতার জন্য নয়।
লেখক: রাজীব কুমার ঘোষ
সহ-ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী কৃষক দল, কেন্দ্রীয় সংসদ