যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যুদ্ধবিরতিতে হঠাৎ করেই এখন ব্যাপক আলোচিত হচ্ছে পাকিস্তানের নাম। কারণ, দেশটির মধ্যস্থতায় ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের শান্তি আলোচনা শেষ পর্যন্ত কোনও সমঝোতায় গড়ায়নি। শান্তি আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার ও মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। আর ইরানের পক্ষ থেকে ছিলেন পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি।
২১ ঘণ্টা আলোচনায় কোনও সমঝোতা না হওয়ার পর দুই দেশের প্রতিনিধিরাই ইসলামাবাদ ছেড়েছেন। কিন্তু, প্রশ্ন হচ্ছে—এই আলোচনা কেন পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত হলো?
এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ যে, প্রায় ৪০ দিন যুদ্ধের পর শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের মধ্যস্থতায়ই গত মঙ্গলবার দুই সপ্তাহের একটি যুদ্ধবিরতি শুরু হয়। ওই সময়ই শান্তি আলোচনায় বসার সিদ্ধান্তও হয়। ফলে শান্তি আলোচনা ইসলামাবাদে হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি ছিল। এছাড়া আরও কিছু কারণ তো রয়েছেই।
প্রথমত, পাকিস্তানের সঙ্গে ইরানের প্রায় ৫০০ মাইল দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে, যা নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উভয় দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তানের ভৌগোলিক অবস্থানই তাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূ-কৌশলগত কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলেছে।
দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং মধ্য এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থান করার ফলে এই দেশটি বহু আঞ্চলিক ইস্যুর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। এই ভৌগোলিক নৈকট্য আলোচনার ক্ষেত্রে একটি বাস্তব সুবিধা দেয়—বিশেষ করে যখন বিষয়টি সীমান্ত নিরাপত্তা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বা জ্বালানি রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত।
দ্বিতীয়ত, পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান—দুই দেশের সঙ্গেই সম্পর্ক বজায় রাখে। এছাড়াও কিছু স্বার্থ জড়িত আছে। যেমন, পাকিস্তানে প্রায় ২০ শতাংশ শিয়া জনগোষ্ঠী রয়েছে। ইরান একটি শিয়া রাষ্ট্র। যদি শিয়া শরণার্থীরা পাকিস্তানে প্রবেশ করে, তাহলে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে বিভাজন তৈরি হতে পারে। এছাড়া পাকিস্তান ও ইরানের মধ্যে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য এবং অন্যান্য চুক্তি রয়েছে।
আবার পাকিস্তানকে পুরোপুরি নিরপেক্ষ বলা না গেলেও, বাস্তবতা হলো—এই দেশটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য পাকিস্তান নতুন কোনও অংশীদারও নয়। দীর্ঘদিনের সামরিক সহযোগিতা, গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে সমন্বয়ের কারণে ওয়াশিংটনের কাছে ইসলামাবাদ একটি পরিচিত ও কার্যকর যোগাযোগ চ্যানেল। একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইরানের সঙ্গে আলোচনায় গেলে যে রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়—বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে—পাকিস্তানের মতো তৃতীয় পক্ষ সেই চাপ কিছুটা কমাতে পারে।
তৃতীয়ত, পাকিস্তান হলো প্রথম মুসলিম দেশ যা পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। এটি ইরানের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, বিশেষ করে তাদের ইসলামী শাসন ব্যবস্থার জন্য। তারা দীর্ঘদিন ধরে এই সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করছে এবং এ ক্ষেত্রে পাকিস্তানের সঙ্গে কাজও করেছে।
এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ইরান একটি প্রভাবশালী শক্তি, আর যুক্তরাষ্ট্র সেখানে দীর্ঘদিন ধরে সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে সক্রিয়। এই দুই শক্তির মধ্যে উত্তেজনা শুধু দ্বিপাক্ষিক নয়; বরং এর প্রভাব পড়ে পুরো অঞ্চলে—বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চল, আফগানিস্তান, এমনকি দক্ষিণ এশিয়াতেও। তাই ইরান–যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা প্রশমনে ভূমিকা রাখা পাকিস্তানের নিজের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গেও যুক্ত।
আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের গুরুত্ব বাড়ানো, ‘শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী’ হিসেবে ইমেজ তৈরি করা—এই ধরনের আলোচনার মাধ্যমে সম্ভব। আর তাই একটি সফল আলোচনার আয়োজন পাকিস্তানের জন্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করে।
চতুর্থত, ইরানের জন্যও পাকিস্তান একটি পরিচিত প্রতিবেশী রাষ্ট্র। যদিও দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক রাজনীতি নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। তবুও সম্পূর্ণ শত্রুতাপূর্ণ সম্পর্ক নয়। তাছাড়া ইরান এমন একটি ভেন্যু চায়, যেখানে তার কূটনৈতিক মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকে। পাকিস্তান সেই দৃষ্টিকোণ থেকে একটি গ্রহণযোগ্য বিকল্প।
পঞ্চমত, ইরান–যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার ক্ষেত্রে কাতার, ওমান বা সুইজারল্যান্ডের মতো দেশগুলো ঐতিহ্যগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বিশেষ করে ওমান বহু বছর ধরে নীরব মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পরিচিত। তবে, প্রতিটি আলোচনার প্রেক্ষাপট ভিন্ন। কখনও কখনও রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার জন্যও ভেন্যু নির্বাচন করা হয়। পাকিস্তানকে বেছে নেওয়া মানে হতে পারে—আঞ্চলিক শক্তিগুলোর ভূমিকাকে গুরুত্ব দেওয়া, অথবা নতুন কূটনৈতিক পথ খোঁজার চেষ্টা করা।
এছাড়া কোনও আলোচনার স্থান নির্বাচন শুধু বাস্তব সুবিধার জন্য নয়; এটি একটি প্রতীকী বার্তাও দেয়। পাকিস্তানে আলোচনার আয়োজন একদিকে আঞ্চলিক কূটনীতিকে সামনে নিয়ে আসে, অন্যদিকে এটি ইঙ্গিত করে যে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো নতুন ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম খুঁজছে। এসব কারণেই পাকিস্তান—যে নিজেও আঞ্চলিক শান্তি বজায় রাখতে চায়—এই আলোচনার আয়োজন করেছে। সব মিলিয়ে, পাকিস্তানকে আলোচনার ভেন্যু হিসেবে বেছে নেওয়া একটি সুপরিকল্পিত কূটনৈতিক পদক্ষেপ।
তবে, আলোচনার সাফল্য বা ব্যর্থতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আপসের মানসিকতা এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গির ওপর। ভেন্যু পরিবর্তন হতে পারে, মধ্যস্থতাকারী বদলাতে পারে, কিন্তু মূল দ্বন্দ্বের সমাধান ছাড়া শান্তির পথ সহজ হয় না।
এই বাস্তবতায় পাকিস্তানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও, তা মূলত সহায়ক—চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের নিয়ন্ত্রণ এখনও ওয়াশিংটন ও তেহরানের হাতেই রয়ে গেছে।