Image description

গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলায় শীতলক্ষ্যা নদীর ওপর রানীগঞ্জ-সনমানিয়া সেতু নির্মাণ শুরুর পর সাত বছরেও কাজ শেষ হয়নি। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি ও নানা সীমাবদ্ধতা এবং ডিজাইন পরিবর্তনের কারণে সেতুটির নির্মাণ কাজ এগোচ্ছে ধীরগতিতে। প্রায় সাত বছরে দুই দফায় দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজের অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৩০ শতাংশ। আগামী ডিসেম্বর মাসে সেতুর নির্মাণ কাজ শেষ করার কথা রয়েছে।

তবে সেতুর নির্মাণ কাজটির কাক্সিক্ষত অগ্রগতি না হওয়ায় ঠিকাচুক্তি বাতিলের জন্য সদর দপ্তরে প্রস্তাব প্রেরণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর গাজীপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল মান্নান। অপরদিকে ডিজাইন পরিবর্তনসহ নানা কারণে বেশ কিছুদিন কাজ বন্ধ থাকলেও ‘এখন পুরো উদ্যমে কাজ চলছে’ বলে দাবি করেছেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রজেক্ট ইঞ্জিনিয়ার।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাজধানী ঢাকা, গাজীপুর জেলা শহর, কাপাসিয়া উপজেলার সনমানিয়া, ঘাগুটিয়া ও আড়ালিয়া, নরসিংদীর মনোহরদী, লাখপুর ও শিবপুর উপজেলার এবং সিলেট অঞ্চলের মানুষের সহজে যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনের সুবিধার্থে কাপাসিয়া উপজেলার রানীগঞ্জ বাজার এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদী ও পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের সংযোগস্থলে একটি সেতু নির্মাণের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের পল্লী সড়কে গুরুত্বপূর্ণ সেতু নির্মাণ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) তত্ত্বাবধানে গাজীপুরের কাপাসিয়ার রানীগঞ্জ-আড়ালিয়া-লাখপুর সড়কের শীতলক্ষ্যা নদীর ওপর ২০১৯ সালের ২২ মে সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। ৫৮৪ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৯ দশমিক ৮ মিটার প্রস্থ্য বিশিষ্ট এ সেতুতে ১৯ মিটার করে ৮টি ভায়াডাক ও ৪৮ মিটার করে ৯টি স্প্যান থাকবে।

 সেতুটির নির্মাণ কাজ পায় ‘নাভানা কনস্ট্রাকশন লিমিটেড’। ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিমূল্য হয় ৬৮ কোটি ৩৬ লাখ ৬৯ হাজার ৭৩৬ টাকা। প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২২ সালের ২২ মে। সেতু নির্মাণের নির্ধারিত তিন বছর সময়ে মাত্র ১৫ শতাংশের বেশি কাজ শেষ করতে না পারায় এবং নানা ত্রুটি বিচ্যুতির কারণে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘নাভানা কনস্ট্রাকশন লিমিটেড’-কে জরিমানা করে তাদের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে এলজিইডি। পরবর্তীতে নতুন করে দরপত্র আহ্বান করে ৭২ কোটি ৯৫ হাজার ৮৫৬ টাকা চুক্তিমূল্যে ‘এম এম বিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড’ এবং ‘কনফিডেন্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড’কে যৌথভাবে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। তারা ২০২৩ সালের ১২ জানুয়ারি নতুন করে কাজ শুরু করে এবং তাদেরকে এ সেতুটি ২০২৬ সালের ১৮ জানুয়ারির মধ্যে শেষ করার সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়। কিন্তু ওই সময়েও নির্মাণ কাজ শেষ না হওয়ায় ঠিকাদারদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তা ২০২৬ সালের ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়।

সেতুর বিষয়ে গাজীপুর-৪ (কাপাসিয়া) আসনের সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আইউবী বলেন, ‘কাপাসিয়ার শীতলক্ষ্যা নদীর ওপর রানীগঞ্জ-সনমানিয়া ব্রিজ নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো চলাচলের উপযোগী হয়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই ব্রিজ দ্রুত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আমি স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করে কথা বলেছি। তিনি এ বিষয়ে দ্রুত উদ্যোগ গ্রহণের ব্যাপারে আশ্বস্ত করেছেন। এ ছাড়াও সংসদের ৭২ বিধি অনুযায়ী এ বিষয়টি নিয়ে আমি সংসদে কথা বলেছি। রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর নির্ধারিত বক্তব্যে আমি কাপাসিয়ার উন্নয়ন নিয়ে কথা বলেছি, তখন আবার এ বিষয়টি পুনরুল্লেখ করা হয়েছে। এই সেতুটি দ্রুত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এরই মধ্যে আমি চেষ্টা করেছি, আমার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। আশা করি সেতুটি দ্রুত বাস্তবায়ন হবে এবং কাপাসিয়ার গুরুত্বপূর্ণ এই এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা খুব শিগগিরই পূরণ হবে ইনশাল্লাহ।’

কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রজেক্ট ইঞ্জিনিয়ার অয়াহিদুল ইসলাম বলেন, ‘নদীর মাঝখানে একটি পিলারের জন্য ১ হাজার ৫০০ মিলিমিটার গভীরতার দুটি পাইলিং করতে গিয়ে দুই দফায় মাটি ধসে যাওয়ার কারণে খাঁচা নামানো হলেও পুরো ঢালাই করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে এ ব্যাপারে এলজিইডির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে নতুন করে ডিজাইন পরিবর্তন করে ১ হাজার মিলিমিটার পাইলিংয়ের অনুমোদনের জন্য আবেদন করা হয়। পরে গত বছরের নভেম্বর মাসে কর্তৃপক্ষের অনুমোদন পাওয়ায় আবার পাইলিংয়ের কাজ শুরু করা হয়েছে। এখন নদীর ভিতরে ২ নম্বর পিলারের মাটি কাটার কাজ, ভায়াডাকের সাটারিংয়ের কাজ চলমান রয়েছে। কাজের গতি আগের চেয়ে বেড়েছে। আশা করছি নির্দিষ্ট সময়েই সেতুর নির্মাণ কাজ শেষ হবে।’ এ পর্যন্ত সেতুর ৩০ শতাংশেরও বেশি কাজ সমাপ্ত হয়েছে বলে এই প্রকৌশলী জানান।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর গাজীপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল মান্নান বলেন, ‘আগে ডিজাইনগত যে সব পরিবর্তন ছিল, তা এরই মধ্যে সংশোধন করে দেওয়া হয়েছে। তারপরেও কাজের গতি কম হওয়ার কারণে বারবার ঠিকাদারকে তাগাদা দেওয়া সত্ত্বেও কাজটি কাক্সিক্ষত অগ্রগতি না হওয়ায় ঠিকাচুক্তি বাতিলের জন্য সদর দপ্তরে প্রস্তাব প্রেরণ করা হয়েছে। সদর দপ্তরের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ পর্যন্ত সেতুর ৩০ শতাংশ কাজ সমাপ্ত হয়েছে।’