Image description
দুই মন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলন

‘অন্তর্বর্তী সরকারের তড়িঘড়ি করে জারি করা কিছু অধ্যাদেশ নিয়ে বিরোধী দল রাজনীতি করতে চাচ্ছে। না বুঝে বিরূপ মন্তব্য করছে এবং ভুল তথ্য ছড়াচ্ছে।’ গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এমন দাবি করেছেন। জাতীয় সংসদে উত্থাপিত ১৩৩টি অধ্যাদেশের বিষয়ে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনিও উপস্থিত ছিলেন।

দুই মন্ত্রী বলেন, দু-একটি বাদে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সব কর্মকান্ডকে বৈধতা দিতে যাচ্ছে বিএনপি সরকার। গুম, মানবাধিকার, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ নিয়ে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে আরও ভালো আইন করা হবে।

সংবাদ সম্মেলনের মূল বক্তব্যে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়কমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদের বিধান মোতাবেক সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা থাকার কারণে, বিগত অন্তর্বতী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ আমরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করেছিলাম। উপস্থাপনের পর অধ্যাদেশগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য জাতীয় সংসদ সর্বসম্মতিক্রমে গঠিত সংসদীয় বিশেষ কমিটির কাছে প্রেরণ করে। বিশেষ কমিটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ করে ২ এপ্রিল জাতীয় সংসদের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করে। এই প্রতিবেদনের আলোকে বিগত কয়েক দিন ধরে সংসদে সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশগুলো বিল আকারে উত্থাপিত হয়, যার ওপর প্রাণবন্ত আলোচনা হয়েছে।

তিনি বলেন, উত্থাপিত অধ্যাদেশগুলোর মধ্যে ৯৭টি অধ্যাদেশ হুবহু বিল আকারে আইনে রূপান্তর করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৩টি অধ্যাদেশ সংশোধনীসহ আইনে রূপান্তর করা হয়েছে। সাতটি অধ্যাদেশ রহিতকরণ ও হেফাজত করা হয়েছে। বাকি ১৬টি অধ্যাদেশ বিশেষ কমিটির প্রতিবেদন মোতাবেক পরবর্তী সময়ে অধিকতর যাচাইবাছাই করে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যা বিশেষ কমিটির প্রতিবেদনেও উল্লেখ আছে।

আইনমন্ত্রী বলেন, জাতীয় সংসদে ৩-৪টি অধ্যাদেশের ওপর অনেক প্রাণবন্ত আলোচনা ও যুক্তিতর্ক উপস্থাপিত হয়েছে। বিশেষ করে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে আলোচনা হয়েছে। তিনি বলেন, যারা বলছেন, আমরা শক্তিশালী মানবাধিকার কমিশন চাই না, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় চাই না কিংবা বিচারপতি নিয়োগে স্বচ্ছতা চাই না, তাদের জন্য এটি একটি স্পষ্ট বার্তা যে, বিএনপি তার নির্বাচনি অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে এই আইনগুলোকে আরও বেশি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং যুগোপযোগী করতে চায়। জনগণের যে কোনো যৌক্তিক দাবি বিএনপির কাছে সবচেয়ে বেশি বিবেচনার দাবি রাখে।

তিনি বলেন, যারা বলছেন আমরা এগুলো (অধ্যাদেশগুলো) করিনি, বাদ দিয়েছি, তারা মূলত এটা নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন। তিনি বলেন, আইনগুলোর প্রস্তাবনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকলেও অনেকে তা উপেক্ষা করছেন। এ বিষয়ে বিভ্রান্তি না ছড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছি। গুম-সংক্রান্ত আইন প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী বলেন, গুমের সংজ্ঞা ও বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে অধ্যাদেশে কিছু অস্পষ্টতা রয়েছে, যা ভবিষ্যতে আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে। এ কারণে বিষয়টি আরও বিশদভাবে পর্যালোচনা প্রয়োজন। একইভাবে মানবাধিকার কমিশন আইনের কিছু ধারা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে, বিশেষ করে তদন্ত, জরিমানা ও ক্ষতিপূরণের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট নির্দেশনার অভাব রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। তিনি বলেন, এসব বিষয় নিয়ে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করতে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে।

উদাহরণ হিসেবে সংবাদ সম্মেলনে আইনমন্ত্রী বলেন, ২০০৭ থেকে ২০০৯ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় জারি হওয়া ১২২টি অধ্যাদেশের মধ্যে মাত্র ৫৪টি আইনে পরিণত হয়েছিল, বাকিগুলো বাতিল হয়ে যায়। তুলনামূলকভাবে বর্তমান সরকার অধিকসংখ্যক অধ্যাদেশ আইনে রূপান্তর করেছে। তিনি বলেন, যেসব অধ্যাদেশ এখনো আইনে পরিণত হয়নি, সেগুলোর ক্ষেত্রেও আমাদের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ও সদিচ্ছা রয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ তাঁর বক্তব্যে বলেন, সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা ও দেশের আইনি কাঠামোর ধারাবাহিকতা রক্ষায় অত্যন্ত স্বল্প সময়ের মধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে ১৩৩টি অধ্যাদেশ নিষ্পত্তির মাধ্যমে সরকার সংসদীয় গণতন্ত্রের এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে।

মন্ত্রী বলেন, সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ অধিবেশন শুরুর ৩০ দিনের মধ্যে পূর্ববর্তী সরকারের আমলের অধ্যাদেশগুলো নিষ্পত্তির আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল। পবিত্র ঈদুল ফিতর ও শবেবরাতের দীর্ঘ ছুটির কারণে কার্যদিবস কম থাকলেও সংসদ সচিবালয়, আইন মন্ত্রণালয়, বিজি প্রেস ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দিনরাত পরিশ্রমে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সম্পন্ন হয়েছে।

তিনি উল্লেখ করেন, সময়ের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বিধি মোতাবেক জাতীয় সংসদের স্পিকারের বিশেষ এখতিয়ারে বিলগুলো উত্থাপন ও নিষ্পত্তি করা হয়েছে।

জাতীয় সংসদে উত্থাপিত বিল সংখ্যা নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতার প্রশ্ন ও ভুল বোঝাবুঝির জবাবে মন্ত্রী বলেন, আইনমন্ত্রী ফ্লোরে জবাব দিয়েছেন যে, ৯১টার মধ্যেই কিন্তু বাকি ১৭টা অন্তর্ভুক্ত। কারণ কোনো কোনো অধ্যাদেশ জারি হওয়ার ১৫-২০ দিন, এক মাস, দুই মাস পরে দ্বিতীয় সংশোধনী আনা হয়েছে, কোথাও কোথাও তৃতীয় সংশোধনীও আনা হয়েছে। মূলত অধ্যাদেশ একটাই। যখন বিল আকারে উত্থাপন করা হয় জাতীয় সংসদে, সব অধ্যাদেশকে এক করে একটা বিল আকারেই উত্থাপন করা হয়েছে। এটা হয়তো বিরোধীদলীয় নেতা খেয়াল করেননি।

গুম কমিশন, মানবাধিকার কমিশন ও আইসিটি আইন প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, আমি নিজে গুমের শিকার। আমরা চাই না তাড়াহুড়ো করে কোনো ত্রুটিপূর্ণ আইন পাস হোক যাতে অপরাধীরা আইনি ফাঁকফোকর দিয়ে পার পেয়ে যায়। কিছু অসঙ্গতি দূর করে সব স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এই আইনগুলোকে আরও আধুনিক ও শক্তিশালী করা হবে যাতে ভুক্তভোগীদের জন্য সর্বোচ্চ ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংসদীয় সংস্কৃতি অনুযায়ী বিরোধী দল বিধি মোতাবেক ওয়াকআউট করতেই পারে। তবে সংসদের বাইরে গিয়ে অসত্য তথ্য বা বিভ্রান্তিকর বক্তব্য প্রচার করা হলে তা জাতির সামনে পরিষ্কার করা সরকারের দায়িত্ব।