প্রায় ২১ ঘণ্টা আলোচনার পর কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার প্রথম দফার শান্তি আলোচনা। ইসলামাবাদের সেরেনা হোটেলে ‘ইসলামাবাদ টকস’ শীর্ষক এই আলোচনা ব্যর্থ হওয়ায় পাকিস্তান ছেড়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদল। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় হওয়া এই আলোচনায় কয়েকটি বিষয়ে সমঝোতা হলেও হরমুজ প্রণালি ও পারমাণবিক ইস্যুতে দুই দেশের মতপার্থক্য দূর হয়নি।
ইরান বলছে, আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র এমন সব দাবি করেছে যা তারা যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জন করতে পারেনি। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানান, ইরানের কাছ থেকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার নিশ্চয়তা চায় যুক্তরাষ্ট্র। আলোচনা ব্যর্থ হলেও যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে। এ ছাড়া শান্তি আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইরান। পাকিস্তানও বলছে, শান্তি আলোচনার পরবর্তী ধাপের বৈঠক আয়োজনের জন্য ইসলামাবাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের সেরেনা হোটেলে ২১ ঘণ্টা ধরে শান্তি আলোচনা করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। ‘ইসলামাবাদ টকস’ শীর্ষক এই আলোচনায় কয়েক ধাপে কারিগরি ও আইনি বিশেষজ্ঞ টিম অংশ নেয়। একাধিক লিখিত বার্তাও বিনিময় করে ওয়াশিংটন-তেহরান। কয়েকটি বিষয়ে সমঝোতা হলেও প্রথম ধাপের আলোচনা কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়েছে। আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর গতকাল সকালে ইসলামাবাদ ত্যাগ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদল। ইরান বলছে, যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় এমন কিছু বিষয় দাবি করেছে, যা তারা যুদ্ধের মাধ্যমেও অর্জন করতে পারেনি। হরমুজ প্রণালি, শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক জ্বালানি কর্মসূচিসহ আরও বেশ কিছু বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চাভিলাষী শর্তগুলো তেহরান মেনে নেয়নি। এতে প্রথম দফার আলোচনা ভেস্তে যায়।
ইসলামাবাদ ছাড়ার আগে এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেন, ২১ ঘণ্টা আলোচনার পরও ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি। একে দুঃসংবাদ আখ্যা দিয়ে ভ্যান্স বলেন, যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলো স্পষ্টভাবে ইরানকে জানিয়েছে। তবে ইরান তাতে রাজি হয়নি।
সংবাদ সম্মেলনে ইরানের পরমাণু সক্ষমতা নিয়ে কিছু প্রশ্নের উত্তর দেন ভ্যান্স। ভাইস প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘ইরান যে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না, সে বিষয়ে তাদের কাছ থেকে একটি স্পষ্ট অঙ্গীকার প্রয়োজন। সহজ কথা হলো, আমাদের এমন একটি জোরালো প্রতিশ্রুতি দেখতে হবে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। এমনকি দ্রুত পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে সক্ষম-এমন কোনো সরঞ্জাম বা প্রযুক্তিও তারা অর্জনের চেষ্টা করবে না।’
এর পরপরই ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাগাই বলেন, ‘এ আলোচনা হয়েছে ৪০ দিনের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের পর, যেখানে চারদিকে শুধু অবিশ্বাস আর সন্দেহ। স্বাভাবিকভাবেই প্রথম বৈঠকেই কোনো চুক্তিতে পৌঁছানোর আশা আমাদের ছিল না। আর তেমনটা কেউ আশাও করেনি। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র বেশ কিছু বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছালেও গুরুত্বপূর্ণ দুই-তিনটি বিষয়ে এখনো মতপার্থক্য রয়েছে।’
এর আগে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, আলোচনার মূল বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল হরমুজ প্রণালি, পারমাণবিক ইস্যু, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ইরানের বিরুদ্ধে ও এই অঞ্চলে যুদ্ধের সম্পূর্ণ অবসান। এই কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার সাফল্য নির্ভর করছে প্রতিপক্ষের আন্তরিকতা ও সদিচ্ছার ওপর। পাশাপাশি তাদের অতিরিক্ত ও বেআইনি দাবি থেকে বিরত থাকা এবং ইরানের বৈধ অধিকার ও স্বার্থকে মেনে নেওয়ার ওপরও এটি নির্ভরশীল।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিরা ইসলামাবাদ ছেড়ে চলে যাওয়ার পর পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার সাংবাদিকদের বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যকার বৈঠক শেষ হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় দুই দেশ ভবিষ্যতেও ‘ইতিবাচক মনোভাব’ বজায় রাখবে। তিনি বলেন, ‘দুপক্ষের মধ্যে চলা কয়েক দফার নিবিড় ও গঠনমূলক আলোচনায় আমি নিজে এবং চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস ও সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল সৈয়দ আসিম মুনির মধ্যস্থতা করেছি। যুদ্ধবিরতি ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকার প্রশংসা করায় আমি উভয় পক্ষকে ধন্যবাদ জানাই। পুরো অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি ও সমৃদ্ধি ফিরিয়ে আনতে উভয় পক্ষ এ ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রাখবে।’
ইরানি প্রতিনিধিদের আস্থা অর্জনে যুক্তরাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে-তেহরান : ইসলামাবাদে আলোচনা শেষ হওয়ার পর প্রথম আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, এ দফার আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানি প্রতিনিধিদের আস্থা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রয়োজনীয় সদিচ্ছা ছিল। কিন্তু আগের দুটি যুদ্ধের (গাজায় ইসরায়েলি হামলা ও গত বছর ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা) অভিজ্ঞতার কারণে প্রতিপক্ষের ওপর কোনো আস্থা ছিল না। শেষ পর্যন্ত তারা ইরানি প্রতিনিধিদলের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।’ তবে আলোচনার পরিবেশ তৈরি এবং তা সহজতর করার জন্য ভ্রাতৃপ্রতিম রাষ্ট্র পাকিস্তানের প্রচেষ্টার প্রশংসা করেছেন গালিবাফ। তিনি সে দেশের জনগণের প্রতি শুভেচ্ছা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন।
ইরানকে নৌ-অবরোধের মাধ্যমে কোণঠাসা করার ইঙ্গিত ট্রাম্পের : ইসলামাবাদে ইরানের সঙ্গে শান্তি আলোচনা ভেস্তে যাওয়া নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেননি। তবে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ একটি নিবন্ধের লিঙ্ক শেয়ার করেছেন তিনি। ট্রাম্পের শেয়ার করা নিবন্ধের শিরোনাম, ‘ইরান নতি স্বীকার না করলে প্রেসিডেন্টের হাতে থাকা ট্রাম্প কার্ড : নৌ-অবরোধ’। প্রবীণ মার্কিন সাংবাদিক জন সলোমনের লেখা নিবন্ধটি তাঁর রক্ষণশীল ওয়েবসাইট ‘জাস্ট দ্য নিউজ’-এ প্রকাশিত হয়েছে। নিবন্ধে বিশেষজ্ঞদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, ইরান যদি হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ না ছাড়ে, তবে ট্রাম্প পাল্টা বড় ধরনের নৌ-অবরোধের মাধ্যমে দেশটিকে কোণঠাসা করে ফেলতে পারেন।
হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি ইরানের নিয়ন্ত্রণে, টোল দিতে হবে রিয়ালে : ইরানের পার্লামেন্টের ডেপুটি স্পিকার হাজি বাবেয়ি বলেছেন, হরমুজ প্রণালি তেহরানের জন্য একটি রেড লাইন বা চূড়ান্ত সীমা। প্রণালিটি পুরোপুরি ইরানের নিয়ন্ত্রণে আছে এবং এখান দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য অবশ্যই ইরানি মুদ্রা রিয়ালে টোল পরিশোধ করতে হবে।
ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের শান্তি আলোচনা কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়েছে। আলোচনার অন্যতম প্রধান বাধা ছিল কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি। এ জলপথ দিয়ে বিশ্বের মোট ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ ও এলএনজি পরিবহন করা হয়।
এর আগে, ট্রাম্প দাবি করেন, এ জলপথ ‘শিগগিরই খুলে দেওয়া’ হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, তাদের দুটি সামরিক জাহাজ ইতোমধ্যে প্রণালিটি অতিক্রম করেছে। সমুদ্র থেকে মাইন অপসারণের একটি ব্যাপক অভিযানের অংশ হিসেবে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান এখনো শেষ হয়নি, নেতানিয়াহু : ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, ‘ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান শেষ হয়নি। আমরা এখনো তাদের বিরুদ্ধে লড়ছি। এখনো আরও অনেক কিছু করার আছে।’ গতকাল এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, লেবাননের সঙ্গে শান্তি আলোচনার জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বিবৃতিতে তিনি সামরিক অভিযানে ইসরায়েলের কিছু সাফল্যের তালিকাও দিয়েছেন। এতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
২১ ঘণ্টা আলোচনার পরও কেন হলো না চুক্তি : প্রায় ২১ ঘণ্টা বিশ্বের নজর ছিল ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার ম্যারাথন আলোচনায়। এটি ছিল ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে গত ৫০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের আলোচনা। তবে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও পারমাণবিক ইস্যুতে দুই দেশের মতপার্থক্যে চুক্তির আলোচনা ভেস্তে যায়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, আলোচনায় মূল মতপার্থক্য ছিল হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ দাবি এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ত্যাগে অস্বীকৃতি নিয়ে। এই দুই বিষয়ই চুক্তির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
আলোচনা শেষে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানান, আলোচনা অচল হয়ে পড়া যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ইরানের জন্য বেশি খারাপ খবর। যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরান স্পষ্টভাবে প্রতিশ্রুতি দিক যে তারা কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না বা দ্রুত তা তৈরির সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করবে না, এটাই আলোচনার প্রধান লক্ষ্য।
অন্যদিকে ইরান মনে করছে এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পালা যুক্তরাষ্ট্রের। তেহরান বলছে, তারা আলোচনায় যৌক্তিক প্রস্তাব দিয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাগাই বলেন, অগ্রগতি নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্রের সদিচ্ছা এবং ইরানের বৈধ অধিকার ও স্বার্থের স্বীকৃতির ওপর। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোও আলোচনা ভেস্তে যাওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছে। অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং দুই পক্ষকে যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা ও আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন। ব্রিটেনের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং বলেন, ‘এখনো কোনো অগ্রগতি বা টেকসই সমাধান না আসাটা অবশ্যই হতাশাজনক। কূটনীতিতে এমনই, সফল না হওয়া পর্যন্ত আপনি ব্যর্থ হচ্ছেন। তাই এই আলোচনা সফল না হলেও চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার গুরুত্ব কমে না।’