Image description

ডিজেল ২০ টাকা বাড়তেই লঞ্চ-বাসভাড়ায় ধাক্কা 
 চট্টগ্রাম বন্দরের ২১ আইসিডিতে ৯.৮৫% চার্জ বৃদ্ধি 
 সেচ, কৃষি, শিল্প ও পরিবহনে নতুন চাপের আশঙ্কা 

এক লিটার ডিজেলের দাম এক লাফে ২০ টাকা বাড়ানোর ধাক্কা ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই দেশের পরিবহন, লজিস্টিকস ও উৎপাদন খাতে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। ঢাকা-বরিশাল নৌপথে লঞ্চের ভাড়া ১৭ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। দূরপাল্লা ও নগর বাসে কিলোমিটারপ্রতি ১৭ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে। এর পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দরের বেসরকারি ২১টি ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো বা আইসিডি ছয় ধরনের সেবার চার্জ ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বাড়িয়েছে। বন্দরকেন্দ্রিক অন্যান্য সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানও বাড়তি চার্জের দাবি তুলেছে। 

অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, ডিজেলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল কৃষির সেচ ও যান্ত্রিক চাষাবাদ, গ্যাস-বিদ্যুৎ সঙ্কটে ডিজেল জেনারেটরনির্ভর শিল্প এবং পণ্য পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত এর বিরূপ প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর। এটি মূল্যস্ফীতিতে নতুন করে বড় ধরনের চাপ তৈরি করবে। 

সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও ফ্রেইট (জাহাজ ভাড়া) ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) বিপুল লোকসান কমানো এবং প্রতিবেশী দেশে জ্বালানি পাচার ঠেকাতে এই মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। 
গত ২০ সেপ্টেম্বর জারি করা প্রজ্ঞাপনে সরকার প্রতি লিটার ডিজেল, অকটেন, পেট্রল ও কেরোসিনের দাম ২০ টাকা করে বাড়িয়েছে, যা ২১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হয়েছে। 

নৌ ও সড়ক পরিবহনে প্রথম ধাক্কা : জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে দ্রুত প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাতে। ঢাকা-বরিশাল নৌপথে ডেকের ভাড়া ৩০০ টাকা থেকে বেড়ে ৩৫০ টাকা হয়েছে (১৬.৭% বৃদ্ধি)। একক কেবিন এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টাকা এবং ডাবল কেবিন দুই হাজার থেকে দুই হাজার ৪০০ টাকায় উন্নীত হয়েছে (২০% বৃদ্ধি)। বিআইডব্লিউটিএর অনুমোদনসাপেক্ষে লঞ্চ মালিকরা আরো বেশি বাড়ানোর দাবি তুললেও সরকার আপাতত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখছে। 

অন্য দিকে সড়ক পরিবহনে মালিকরা কিলোমিটারপ্রতি ২০ পয়সা বাড়ানোর দাবি তুললেও সরকার জনস্বার্থ বিবেচনায় তা কমিয়ে ১৭ পয়সা নির্ধারণ করেছে। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি আদায় করলে রুট পারমিট বাতিলসহ কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে বাস্তবে নতুন ভাড়া কার্যকর হওয়ার আগেই অনেক রুটে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। 

বন্দরে খরচ বৃদ্ধি, কৃষিতে আঘাত ও শিল্পে দ্বিমুখী চাপ : চট্টগ্রাম বন্দরের রফতানি সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় বড় আঘাত এসেছে। বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোস অ্যাসোসিয়েশন (বিআইসিডিএ) ২১টি আইসিডিতে খালি কনটেইনার  পরিবহন, হ্যান্ডলিং, স্টাফিং এবং ওজন যাচাইসহ ছয়টি সেবায় ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ চার্জ বাড়িয়েছে। প্রতিদিন এসব ডিপো ৭০ হাজার লিটারের বেশি ডিজেল ব্যবহার করায় এই মূল্যবৃদ্ধি অনিবার্য ছিল বলে আইসিডি মালিকদের যুক্তি। শিল্প খাতের প্রায় ৯৩ শতাংশ রফতানি পণ্য এসব আইসিডির মাধ্যমে হ্যান্ডলিং হয়, যা মোটের ওপর রফতানি ব্যয় বাড়িয়ে দেবে। 

দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ সেচপাম্প ডিজেলচালিত। বোরো ধানসহ কৃষির মোট উৎপাদন ব্যয়ের ২০ থেকে ২৫ শতাংশই সেচ খাতে ব্যয় হয়। ১৭ শতাংশের বেশি ডিজেল মূল্যবৃদ্ধির ফলে সেচ, জমি চাষ (ট্রাক্টর ও পাওয়ার টিলার) এবং ফসল পরিবহনে খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। নওগাঁর কৃষক আহসান হাবিবের মতো প্রান্তিক চাষিরা বলছেন, ধানের বাজারদর এমনিতেই দুর্বল থাকায় এই বাড়তি উৎপাদন ব্যয় কৃষকের মুনাফা পুরোপুরি গ্রাস করবে। 
শিল্প খাতের অবস্থা আরো জটিল। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সঙ্কটের কারণে যেসব কারখানা ডিজেল জেনারেটরের ওপর নির্ভরশীল, তাদের উৎপাদন খরচ বাড়বে। এ ছাড়া কারখানার কাঁচামাল ও তৈরি পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়ায় প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকা রফতানিমুখী শিল্পের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। 
দক্ষিণ এশিয়ার বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান 

সরকার জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির পক্ষে প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরেছে (টাকায় রূপান্তরিত) : 
 পাকিস্তান : ১৮৫.৪৮ টাকা
 শ্রীলঙ্কা : ১৭৯.৪২ টাকা
 ফিলিপাইন : ১৬৮.৫৩ টাকা
 মিয়ানমার : ১৬৪.৮৩ টাকা
 নেপাল : ১৬১.২৪ টাকা
 থাইল্যান্ড : ১৫১.২২ টাকা
 দুবাই : ১৪৪.৭৯ টাকা
 মালদ্বীপ : ১৪০.০০ টাকা
 ভিয়েতনাম : ১৩৭.০০ টাকা
 বাংলাদেশ : ১৩৫.০০ টাকা
 কলকাতা (ভারত) : ১৩৪.৭৬ টাকা

সরকারের যুক্তি, কলকাতার সাথে বাংলাদেশের দামের ব্যবধান মাত্র ২৪ পয়সা হওয়ায় এত দিন সীমান্ত দিয়ে জ্বালানি পাচারের বড় ঝুঁকি ছিল। নতুন দাম সেই পাচার রোধে সহায়ক হবে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, কর কাঠামো ও মাথাপিছু আয়ের তুলনামূলক বিচারে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য এক ধাক্কায় ২০ টাকা বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর গভীর চাপ সৃষ্টি করবে। 
প্রশ্ন উঠছে- দাম বাড়ানোই কি একমাত্র পথ? 

সরকারের যুক্তির একটি শক্ত ভিত্তি রয়েছে- বিপিসির দীর্ঘস্থায়ী বড় লোকসান এবং আন্তর্জাতিক বাজারের বাড়তি আমদানি ব্যয় রাষ্ট্রের অর্থায়নের ওপর চাপ তৈরি করে। একই সাথে কম অভ্যন্তরীণ দাম ও প্রতিবেশী দেশের দামের পার্থক্য থাকলে সীমান্তপথে পাচারের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। 
কিন্তু এর বিপরীত অর্থনৈতিক চাপও বাস্তব। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ম পরিবহন ভাড়া ম কৃষি উৎপাদন ব্যয় ম শিল্পের উৎপাদন ব্যয় ম বন্দর ও লজিস্টিকস চার্জ ম পণ্যের সরবরাহ ব্যয়- এই পুরো শৃঙ্খল একসঙ্গে সক্রিয় হচ্ছে। 
ফলে বিপিসির লোকসান কমানোর যে অর্থনৈতিক সুবিধা তৈরি হবে, তার একটি অংশ যদি পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনীতির অন্য খাতে ফিরে আসে, তাহলে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি ও প্রবৃদ্ধির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি হতে পারে। 

ব্যবসায়ী নেতারাও এই ঝুঁকির কথা বলছেন। তাদের বক্তব্য, উচ্চ সুদ, দুর্বল চাহিদা, জ্বালানি সঙ্কট ও বাড়তি লজিস্টিকস ব্যয়ের মধ্যেই শিল্প চলছে। নতুন জ্বালানি ব্যয় এই চাপ আরো বাড়াবে। 
‘২০ টাকার’ প্রভাব বড় হতে পারে, তিনটি বড় ঝুঁকি সামনে 
সরকার নির্ধারিত বাসভাড়া ১৭ পয়সা বাড়িয়েছে। লঞ্চে ১৭-২০ শতাংশ পর্যন্ত ভাড়া বেড়েছে। আইসিডি চার্জ বেড়েছে ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ। এগুলো অনুমোদিত বা ঘোষিত বৃদ্ধি। 
এর বাইরে যদি পরিবহন মালিক, পণ্যবাহী ট্রাক, লঞ্চ, বাজারের মধ্যস্বত্বভোগী ও ব্যবসায়ীরা নিজেদের মতো করে অতিরিক্ত ভাড়া বা চার্জ বাড়াতে থাকেন, তাহলে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির প্রকৃত অভিঘাত সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে। 
এ কারণে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে তিনটি বিষয়- প্রথমত, নির্ধারিত পরিবহন ভাড়া কার্যকর হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, পণ্য পরিবহনের বাড়তি ব্যয়কে অজুহাত করে অস্বাভাবিক বাজারমূল্য বাড়ানো হচ্ছে কি না, তা নজরদারি করা। তৃতীয়ত, কৃষকের সেচ ও উৎপাদন ব্যয় বাড়ার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়া। 

জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির পর বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অন্তত তিনটি ঝুঁকি এখন সামনে। এক. মূল্যস্ফীতি : পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়লে নিত্যপণ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়তে পারে। দুই. উৎপাদন ও রফতানি : ডিজেল জেনারেটরনির্ভর শিল্প এবং উচ্চ লজিস্টিকস ব্যয় শিল্পের মুনাফা ও রফতানি প্রতিযোগিতায় চাপ তৈরি করতে পারে। তিন. ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা : যাতায়াত ও নিত্যপণ্যের ব্যয় বাড়লে পরিবারের হাতে থাকা অর্থের একটি বড় অংশ প্রয়োজনীয় খরচে চলে যাবে। ফলে অপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবায় চাহিদা কমতে পারে। ব্যবসায়ী নেতারাও অভ্যন্তরীণ চাহিদা দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। 
বিপিসির লোকসান বনাম অর্থনীতির বাস্তব চিত্র 
মার্চ থেকে আগস্ট- এই ছয় মাসে বিপিসির লোকসান হয়েছে প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা (গড়ে মাসে প্রায় তিন হাজার ৮১৩ কোটি টাকা)। জ্বালানি ও ফ্রেইট ব্যয় বৃদ্ধি এবং ভর্তুকির চাপ থেকে বের হয়ে আসার জন্যই এই মূল্য সমন্বয়- এমনটিই সরকারের দাবি। 

তবে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি মানেই বহুমুখী মূল্যস্ফীতি। পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও লজিস্টিকস খাতের এই বর্ধিত ব্যয় শেষ পর্যন্ত ভোক্তার পকেট থেকেই কাটা যাবে। তাই বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিপিসির লোকসান কমানোর পাশাপাশি বাজার মনিটরিং জোরদার করা না হলে অসাধু চক্র এই সুযোগে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে কৃত্রিমভাবে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে। 
এখন দেখার বিষয়, সরকার ঘোষিত ভাড়ার কঠোর বাস্তবায়ন এবং কৃষিপণ্য ও নিত্যপণ্যের সরবরাহ চেইন সুরক্ষিত রাখতে কী ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ নেয়। 
অর্থনীতির অন্য প্রান্তের ব্যয়  
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তের পেছনে সরকারের হিসাব মূলত বিপিসির লোকসান, আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য এবং জ্বালানি পাচারের ঝুঁকি ঘিরে। সেই হিসাবের বাস্তব ভিত্তি আছে। কিন্তু অর্থনীতির অন্য প্রান্তে এর যে ব্যয় তৈরি হচ্ছে, সেটিও কম বাস্তব নয়। 

ডিজেলের দাম ২০ টাকা বাড়া মানে শুধু পাম্পে একজন মোটরসাইকেল চালকের অতিরিক্ত ২০ টাকা খরচ নয়। সেই ডিজেল দিয়ে সেচপাম্প চলে, ট্রাক চলে, লঞ্চ চলে, বাস চলে, বন্দরের যন্ত্রপাতি চলে, কারখানার জেনারেটর চলে। ফলে একই মূল্যবৃদ্ধি অর্থনীতির বহু স্তরে প্রবাহিত হয়। 
আজ (মঙ্গলবার) লঞ্চের ডেকভাড়া ৫০ টাকা বেড়েছে। বাসে কিলোমিটারপ্রতি ১৭ পয়সা যোগ হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের আইসিডিতে ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ চার্জ বেড়েছে। আগামী দিনগুলোতে কৃষকের সেচ বিল, শিল্পের উৎপাদন ব্যয় এবং বাজারে পণ্যের পরিবহন খরচে এর আরো প্রতিফলন দেখা যেতে পারে। 
তাই এখন সরকারের সামনে শুধু ‘তেলের দাম কত হবে’- এই প্রশ্ন নেই।

বড় প্রশ্ন হলো, এই বাড়তি জ্বালানি ব্যয় যাতে নিয়ন্ত্রণহীন মূল্যবৃদ্ধিতে রূপ না নেয়, সেই ব্যবস্থাপনা কতটা কার্যকর হবে। 
বিপিসির লোকসান কমানো যেমন প্রয়োজন, তেমনি কৃষক, শ্রমিক, ভোক্তা, শিল্প ও রফতানিকারকের ওপর নতুন ব্যয়ের অভিঘাত সীমিত রাখাও জরুরি। কারণ শেষ পর্যন্ত জ্বালানির মূল্য সমন্বয়ের সাফল্য শুধু বিপিসির লোকসান কমলো কি না মাপা যাবে না; দেখতে হবে দেশের উৎপাদন, বাজার, কর্মসংস্থান ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর এর মোট প্রভাব কতটা হলো।