রাজধানী শহরটি ছিল নদী ও খালের শহর। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যার সঙ্গে যুক্ত অসংখ্য খাল ঢাকার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার ভিত্তি ছিলো। কিন্তু এখন ঢাকার পানিবদ্ধতায় দায়ী প্রবাহমান খালের হারিয়ে যাওয়া। গত কয়েক দশকের অপরিকল্পিত নগরায়ন, ভূমিদস্যুদের দখল, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের ফলে একের পর এক খাল হারিয়ে গেছে। অনেক খাল মানচিত্রে থাকলেও বাস্তবে তাদের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া কঠিন। অনেক খালে গড়ে উঠেছে দশতলা ভবন।
১৯৮৮ সালে ওই পানিবদ্ধতা নিরসনে ঢাকার ২৬টি খালের দায়িত্ব ঢাকা ওয়াসাকে দেয় সরকার। তারপরও নগরের খালগুলো ক্রমেই বেদখল হয়ে যায়। অনেক খাল ভরাট করে গড়ে ওঠে বহুতল ভবন। ২০২১ সালে ওই খালগুলো সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করে ওয়াসা। মিরপুর, কালশী, বাড্ডা, আফতাবনগর, বনশ্রী, রামপুরা, মোহাম্মদপুর, যাত্রাবাড়ী, ডেমরা থেকে শুরু করে পুরান ঢাকার অনেক এলাকায় সামান্য বৃষ্টির পরই সৃষ্টি হয় দীর্ঘস্থায়ী পানিবদ্ধতা। একসময় যে খালগুলো বর্ষার অতিরিক্ত পানি দ্রুত নদীতে পৌঁছে দিত, সেগুলোর অনেকগুলো এখন সঙ্কুচিত, নর্দমায় পরিণত হয়েছে। কোথাও বাজার, কোথাও সড়ক বা বক্স কালভার্ট নির্মাণের কারণে খালের স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে।
নন্দীপাড়া, মান্ডা, মুগদা, শনির আখড়া, মোহাম্মদপুরসহ ঢাকার খালের পানিতে বাসার টয়লেটের লাইন যুক্ত করে দেয়া হয়েছে। এই দৃশ্য শুধু নির্দিষ্ট কোনো এলাকায়ই নয় পুরো ঢাকার খালের চিত্র এটি। অধিকাংশ বাড়ির টয়লেটের লাইন খালের সঙ্গে যুক্ত। মশা-মাছিতে জীবন অতিষ্ঠ করে তোলে নগরবাসীর। কালুনগর, জিরানি, মান্ডা ও শ্যামপুর খাল পুনরুদ্ধার, সংস্কার এবং নান্দনিক পরিবেশ তৈরির লক্ষ্য নিয়ে ২০২২ সালের অক্টোবরে প্রায় ৮৯৮ কোটি ৭৩ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রকল্পটি একনেক অনুমোদন পায়। ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। প্রকল্পের লক্ষ্য অনুযায়ী, খালগুলোর পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক করা, পানিবদ্ধতা কমানো এবং দুই পাড়ে ওয়াকওয়ে, বাইসাইকেল লেন, খেলার মাঠ, ফুডকোর্ট, নাগরিক সুবিধা ও সবুজায়নের মাধ্যমে আধুনিক জনপরিসর তৈরি করার কথা ছিল। কিন্তু দীর্ঘদিনেও সাফল্য আসেনি।
বাসাবো এলাকার বাসিন্দা কবির হোসেন বলেন, একসময় খাল ছিলো পানি ভরা। এখন খালের দুই পাড়ে আবর্জনার ভাগাড় থেকে ছড়িয়ে পড়া তীব্র দুর্গন্ধে এলাকাবাসীর টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছে। শুধু দূষণই নয়, খালের দুই পাশে অসংখ্য অবৈধ স্থাপনা গড়ে ওঠায় পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক জায়গায় খালের সীমানা ভরাট করে কার্যত ড্রেনে পরিণত করা হয়েছে। ঢাকার খাল এখন মশার প্রজনন ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
বাপার নির্বাহী সদস্য ও নগরায়ণ কমিটির আহ্বায়ক স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, বর্ষা এলেই যে ঢাকাবাসীকে পানিবদ্ধতার মুখে পড়তে হয় তার জন্য বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়হীনতা আর পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে। প্রতিটি বর্ষায় যে পানি জমে, সেটি শুধু আকাশের বৃষ্টির কারণে নয় আমাদের নিজেদের সিদ্ধান্তহীনতার ফল। ঢাকাকে বাঁচাতে হলে পানির স্বাভাবিক পথ ফিরিয়ে দিতে হবে। সমন্বিত পরিকল্পনা ও জবাবদিহির মাধ্যমে ঢাকাকে পুনর্জীবিত করা সম্ভব।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুস সালাম বলেছেন, পলিথিন, বালিশ পর্যন্ত ড্রেনের মধ্যে ফেলে রাখা হয়। এখন পানি নিষ্কাশনের একমাত্র ব্যবস্থা হলো ড্রেনেজ ব্যবস্থা। অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে ঢাকার খাল-বিল ভরাট হয়ে গেছে। তবে আমাদের নেতা তারেক রহমান রাষ্ট্রের দায়িত্ব নেয়ার পর খাল পুনঃখননের নির্দেশ দিয়েছেন। পর্যায়ক্রমে প্রতিটি খাল খনন করা হবে এবং পানি নিষ্কাশনের পথগুলো পুনরুদ্ধার করা হবে।