Image description
সাক্ষীর জবানবন্দি

চোখের সামনে গুলিবিদ্ধ হয়ে কাতরাচ্ছিলেন স্বজন। বাঁচানোর আশায় তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসা মেলেনি। পরে ঢাকায় নেওয়ার পর মারা যান তিনি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া সাক্ষ্যে নিজের চোখের সামনে ঘটে যাওয়া ঘটনার এভাবেই বর্ণনা দিয়েছেন এন আর বি মামুন নামে একজন সাক্ষী। চব্বিশের গণ অভ্যুত্থানের সময় নারায়ণগঞ্জে ১০ জনকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দ্বিতীয় সাক্ষী হিসেবে গতকাল ট্রাইব্যুনাল-১ এ জবানবন্দি দেন তিনি। পরে এ মামলার পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য ১২ আগস্ট দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল। এ মামলার সব আসামিই পলাতক। তাই জবানবন্দি শেষে এ সাক্ষীকে জেরা করেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন, আলী হায়দার ও মুসতাভী হাসান রাতুল। প্রসিকিউশনের পক্ষে ছিলেন প্রসিকিউটর আবদুস সাত্তার পালোয়ান, সহিদুল ইসলাম সরদার, আবদুল্লাহ আল নোমানসহ অন্যরা।

সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমান ছাড়া অন্য আসামিরা হলেন, শামীম ওসমানের ছেলে ইমতিনান ওসমান অয়ন, ভাতিজা আজমেরী ওসমান, অয়নের শ্যালক মিনহাজ উদ্দিন আহমেদ ভিকি, নারায়ণগঞ্জ রাইফেলস ক্লাবের সাবেক সভাপতি তানভীর আহমেদ টিটু, ডিবিসির নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি রাজু আহমেদ, ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর আবদুল করিম বাবু, ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর কামরুল হাসান মুন্না, নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক শাহ নিজাম উদ্দিন আহমেদ, যুবলীগ নেতা শাহাদাত হোসেন সাজনু, ছাত্রলীগ নেতা হাবিবুর রহমান রিয়াদ ও সোহানুর রহমান শুভ্র।

৪১ বছর বয়সি মামুন জবানবন্দিতে জানান, তিনি ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। একই সঙ্গে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদলের রাজনীতির সঙ্গেও সম্পৃক্ত। সাক্ষ্যে তিনি বলেন, ২০২৪ সালে কোটাবিরোধী আন্দোলন শুরুর পর ১২ জুলাই থেকে আন্দোলনে যোগ দেই। ১৬ জুলাই রংপুরে আবু সাঈদ হত্যার পর নারায়ণগঞ্জে আন্দোলন তীব্র হয়। ১৯ জুলাই বিকাল ৩টার দিকে নারায়ণগঞ্জের লিংক রোডের জালকুড়ি এলাকায় সহযোদ্ধাদের সঙ্গে অবস্থান নেওয়ার সময় তৎকালীন সংসদ সদস্য শামীম ওসমান, তার ছেলে অয়ন ওসমান, ভাতিজা আজমেরী ওসমানসহ আওয়ামী লীগের প্রায় ১০০ নেতা-কর্মী আমাদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালান। এতে অনেকে আহত হন এবং আমি নিজেও গুলিবিদ্ধ হই। আমার পাশে থাকা আদিল ও ইয়াসিন ঘটনাস্থলেই গুলিতে মারা যান।

মামুন জানান, আহত অবস্থায় সহযোদ্ধারা তাকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান। একদিন বিশ্রামের পর ২১ জুলাই আবার আন্দোলনে যোগ দেন তিনি। ওই দিন সাইনবোর্ড থেকে চিটাগাং রোডের দিকে যাওয়ার সময় মা হাসপাতালের সামনে অবস্থান নেন। তখন বাজারের গলি থেকে শামীম ওসমান, শাহ নিজাম, ফাইজুল ইসলাম, কমিশনার রুহুলসহ প্রায় ১৫০ জন সশস্ত্র লোক তাদের ওপর হামলা চালায়। হামলা থেকে বাঁচতে দৌড়ানোর সময় তিনি ডিএনডি খালে পড়ে যান এবং তার ওপরের মাড়ির একটি দাঁত ভেঙে যায়।

জবানবন্দিতে ৫ আগস্টের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে মামুন জানান, ওই দিন সকাল থেকেই তারা খণ্ড খণ্ড মিছিল করছিলেন। দুপুর দেড়টার দিকে শামীম ওসমানের নেতৃত্বে অয়ন ওসমান, আজমেরী ওসমান, শাহ নিজাম, ফাইজুল ইসলামসহ প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ জন সশস্ত্র ব্যক্তি চাষাঢ়া মোড়ে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালায়। আওয়ামী লীগের ধাওয়া খেয়ে তারা ল্যাবএইড হাসপাতালের গলিতে ঢুকে পড়েন। তখন তার চোখের সামনে অয়ন ওসমানের গুলিতে স্বজন নামে এক যুবক আহত হন।

তিনি বলেন, তিন-চারজন মিলে স্বজনকে ধরে সমবায় মার্কেটের নিচে নিয়ে পানি খাওয়াই। পরে রিকশায় করে তাকে নারায়ণগঞ্জ ভিক্টোরিয়া হাসপাতালে নেওয়া হয়। তবে সেখানে তাকে কোনো চিকিৎসা দেওয়া হয়নি। মামুনের দাবি, আন্দোলনে আহতদের চিকিৎসা না দিতে আগে থেকেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। পরে স্বজনকে তার বড় ভাইয়ের কাছে বুঝিয়ে দিয়ে ঢাকায় নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। ৬ আগস্ট বিজয় উদযাপনের সময় তিনি স্বজনের মৃত্যুর খবর পান। সাক্ষ্য শেষে স্বজনসহ অন্যদের হত্যার সঙ্গে জড়িতদের বিচার দাবি করেন এই সাক্ষী।