Image description
আইজিপির কাছে হোয়াটসঅ্যাপে তদবির

‘আসসালামু আলাইকুম স্যার। আমি মো. আব্দুস সাত্তার পাটোয়ারী... প্রধানমন্ত্রীর গবেষণা কর্মকর্তা, প্লিজ টেক্সট মি।’ কথাগুলো ভুয়া পরিচয় দেওয়া এক প্রতারকের। তিনি হোয়াটসঅ্যাপে এমন খুদে বার্তা দিয়েছেন খোদ পুলিশের আইজিকে। আবার একই প্রতারক পুলিশ প্রধানকে অপর একটি খুদে বার্তা দিয়ে লিখেছেন, ‘স্যার... আমার আত্মীয়। আপনার সদয় বিবেচনার অনুরোধ করছি।’ এভাবে একের পর এক এ ধরনের নানা তদবিরের খুদে বার্তা আইজিপির সরকারি মুঠোফোনে দেন তিনি। যিনি নিজেকে প্রধানমন্ত্রীর গবেষণা কর্মকর্তা বলে পরিচয় দিয়েছেন। সম্প্রতি এই প্রতারককে গ্রেফতার করেছে ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ।

প্রতারকের নাম নজরুল ইসলাম (৪২)। পিতা মৃত বদু মিয়া। গ্রামের বাড়ি নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ থানার চৌমুহনী পৌরসভায়। তাকে গ্রেফতারের পর চাঞ্চল্যকর এসব তথ্য বেরিয়ে আসে। এরপর এ সূত্র ধরে ডিজিটাল প্রতারকচক্রের অপর এক সদস্য আব্দুল্লাহ আল মামুন ওরফে এম মামুনকে (২৫) গ্রেফতার করা হয়। সূত্র বলছে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এদের কাছ থেকে চাঞ্চল্যকর অনেক তথ্য মিলেছে। ভুয়া পরিচয় দিয়ে তারা এভাবে হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তা পাঠিয়ে অনেক বড় কর্মকর্তাকে বোকা বানিয়ে কিছু তদবির করে নিতে সক্ষমও হয়েছে। তবে সবিস্তারে আরও তথ্য-উপাত্ত জানার জন্য তাদের মুঠোফোন সেট ফরেনসিক পরীক্ষা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রিপোর্ট এলে আশা করা হচ্ছে চাঞ্চল্যকর অনেক কিছু পাওয়া যাবে। বিশেষ করে কারা তাদের তদবিরের ফাঁদে পা দিয়েছেন এবং এ চক্রের আরও কতজন সদস্য সক্রিয় আছে- তাদের নাম-পরিচয়ও মিলতে পারে।

জানা গেছে, প্রতারকচক্রের সদস্যরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা এবং কিছু ক্ষেত্রে সরকারি দলের বিভিন্ন পর্যায়ের পদ-পদবি ব্যবহার করেছে। এমনকি কখনো তারা নিজেদের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব বলে পরিচয় দিতেন।

এদিকে এ বিষয়ে ইনস্পেকটর জেনারেল অব পুলিশ (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের বক্তব্য নিতে যুগান্তরের পক্ষ থেকে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। বিষয় উল্লেখ করে খুদে বার্তা পাঠালেও তিনি প্রতি-উত্তর দেননি।

সূত্র জানায়, তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় গত ৯ জুলাই রাতে রাজধানীর মতিঝিল থানার পোস্টাল কলোনির একটি বাসায় অভিযান চালিয়ে নজরুল ইসলামকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এ সময় তার কাছ থেকে একটি অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন, একটি নকিয়া বাটন ফোন, তিনটি সিম, দুটি ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের এটিএম কার্ড, বিভিন্ন ব্যাংকের একাধিক চেকের পাতা এবং ৫৪ হাজার টাকা জব্দ করা হয়। পরে তার মুঠোফোন সেটের হোয়াটসঅ্যাপ থেকে চাঞ্চল্যকর এসব খুদে বার্তা পাওয়া যায়। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, নজরুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে ভুয়া পরিচয়ে প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ঘনিষ্ঠ পরিচয় ব্যবহার করে যোগাযোগ গড়ে তোলেন। শুরুতে কুশল বিনিময়, পরে আত্মীয়তার দাবি, এরপর নানারকম ম্যাসেজ দিয়ে তদবির হাসিল করতেন। তাদের কাছ থেকে জব্দ করা অ্যান্ড্রয়েড ফোনের হোয়াটসঅ্যাপই ছিল এসব প্রতারণার সবচেয়ে বড় আলামত। সেখানে আইজিপিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে খুদে বার্তা বিনিময়ের তথ্য পাওয়া গেছে।

গ্রেফতারের সময়ও নজরুল একই কৌশল অবলম্বন করেন। তদন্ত কর্মকর্তাদের কাছে তিনি নিজেকে প্রধানমন্ত্রীর গবেষণা কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব পরিচয় দিয়ে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন। পরে জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেন, তিনি অজ্ঞাতনামা আরও তিন থেকে চার সহযোগীকে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ভুয়া পরিচয়ে এভাবে প্রতারণা করে আসছিলেন। তাকে রিমান্ডে নিয়েও পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করে। তবে শেষ পর্যন্ত আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেননি তিনি।

পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে নজরুল জানান, নোয়াখালীতে তার ‘নজরুল এন্টারপ্রাইজ’ নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সরকারি কাজ পাওয়ার আশায় ২০১৬ সালে ঢাকায় এসে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি দপ্তরে যাতায়াত শুরু করেন। সেই সময় শাহ জামাল কামাল ওরফে বাবর নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরে তারা একসঙ্গে বিভিন্ন দপ্তরে তদবির করে কাজ নেওয়ার চেষ্টা করতেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাবর নতুন সিম ব্যবহার করে ভিন্ন ভিন্ন পরিচয়ে তদবির চালিয়ে যেতে থাকেন বলে জানান নজরুল।

এছাড়াও মামলার তদন্তে আরও একজন সহযোগীর সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়। পুলিশ সদর দপ্তরের এলআইসি শাখার তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, আব্দুল্লাহ আল মামুন ওরফে এম সুমন নামের এক ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে একাধিক মোবাইল নম্বর থেকে হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব, ডিএমপির ডিবি প্রধানসহ বিভিন্ন শীর্ষ কর্মকর্তার ছবি ও পরিচয় ব্যবহার করে প্রতারণা করছিলেন। পরে সাতক্ষীরার দেবহাটা এলাকা থেকে তাকে আটক করে ডিবি। বর্তমানে দুজনই কারাগারে রয়েছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে এর আগেও নোয়াখালীতে একাধিক মামলা রয়েছে। এর মধ্যে নেগোশিয়েবল ইনট্রুমেন্টস অ্যাক্টের ১৩৮ ধারায় দুটি মামলা এবং দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারায় আরেকটি মামলা বর্তমানে বিচারাধীন। এছাড়া গত ৯ জুলাই মতিঝিল থানায় দায়ের করা মামলায় নজরুল ইসলাম ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১৭০, ৪১৯, ৪০৬ ও ৪২০ ধারায় প্রতারণা, ভুয়া পরিচয় ব্যবহার এবং বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে।

এদিকে সরকারি কর্মকর্তার নামে বার্তা এলে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে পুলিশ হেডকোয়র্টার্স। মঙ্গলবার এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পুলিশসহ সরকারি কর্মকর্তাদের নাম-পরিচয় ও ছবি ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অর্থ দাবি ও তদবিরের প্রতারণায় সবাই সতর্ক থাকুন। এছাড়া কোনো সরকারি কর্মকর্তার ছবি বা নাম ব্যবহার করা হলেও সেটি তার প্রকৃত নম্বর বা অ্যাকাউন্ট নাও হতে পারে। এ ধরনের বার্তায় সাড়া না দিয়ে ৯৯৯, সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার বা ডিএমপির ডিবিতে জানানোর অনুরোধ করেছে পুলিশ।

আগেও ঘটেছে এমন প্রতারণা : সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের পরিচয় ব্যবহার করে প্রতারণার ঘটনা নতুন নয়। ২০২৫ সালের ১৫ মার্চ রাজধানীর আগারগাঁও থেকে মো. আব্দুস সালামকে গ্রেফতার করা হয়। তিনি দীর্ঘদিন ধরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পার্সোনাল সেক্রেটারি (পিএস) পরিচয় দিয়ে নিয়োগ বাণিজ্য, অবৈধ আর্থিক লেনদেন ও বিভিন্ন তদবিরের নামে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করছিলেন। গোয়েন্দা সংস্থার ছয় ঘণ্টার অভিযানে তাকে আটক করা হয়।

২০২৫ সালের ১৭ জুলাই ফরিদপুরের ভাঙ্গা থেকে আতিয়ার দর্জিকে গ্রেফতার করে র‌্যাব-১০। অভিযোগ ছিল, তিনি সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নাম-ছবি ব্যবহার করে ভুয়া হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট খুলে তদবির, প্রভাব বিস্তার এবং অনৈতিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করতেন। তার কাছ থেকে সাতটি মোবাইল ফোন, একটি মাইক্রোবাস, এটিএম কার্ড ও নগদ টাকা জব্দ করা হয়।

এছাড়া এ বছরের প্রথম দিকে আর্মি, পুলিশ ও ডিজিএফআই কর্মকর্তাদের ছবি ব্যবহার করে ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপে প্রতারণার ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এবং সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার পৃথকভাবে সতর্কবার্তা দেয়। প্রতারকরা কখনো কর্মকর্তা পরিচয়ে ভয় দেখিয়ে, কখনো চাকরি, পোস্টিং ও তদবিরের প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে বলে সতর্কবার্তায় জানানো হয়।

সবশেষে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আশরাফ উদ্দিনের ছবি ও দাপ্তরিক পরিচয় ব্যবহার করে ভুয়া হোয়াটসঅ্যাপ আইডি থেকে অনৈতিক সুবিধা দাবি ও প্রতারণার অভিযোগে জনগণকে সতর্ক করতে আইএসপিআর সতর্কবার্তা দেয়। সংস্থাটি জানায়, সরকারি কর্মকর্তার ছবি বা পরিচয় ব্যবহার করে যোগাযোগ করা হলেও পরিচয় নিশ্চিত না হয়ে কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন বা তদবিরে সাড়া দেওয়া উচিত নয়।