মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে দুটি বাঘের দেখা মিলেছে। গত ২৬ জুলাই পূর্ব সুন্দরবনে সকাল ১০টার দিকে শরণখোলা রেঞ্জের কচিখালী অভয়ারণ্য কেন্দ্রের টাইগার পয়েন্ট এলাকার নদীতে সাঁতার কাটতে দেখা যায় একটি রয়েল বেঙ্গল টাইগারকে।
বনকর্মীদের মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় ধরা পড়া এসব দৃশ্য জানান দিচ্ছে সুন্দরবনে বাঘের অস্তিত্ব। সর্বশেষ ক্যামেরা ট্র্যাপিং জরিপ বলছে, সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা বেড়ে ১২৫টি হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আজ ২৯ জুলাই বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে বিশ্ব বাঘ দিবস। এ উপলক্ষে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি পরিবেশবাদী সংগঠন ও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়েছে।
সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা বাড়ার এই অগ্রগতি বন বিভাগের কাছে সংরক্ষণ কার্যক্রমের সাফল্যের প্রতীক। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, কেবল সংখ্যা বাড়লেই বিপদ কেটে যায় না। জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, চোরাশিকার এবং খাদ্যসংকটের মতো চ্যালেঞ্জ এখনো সুন্দরবনের বাঘের ভবিষ্যেক অনিশ্চিত করে রেখেছে। বাঘ সুরক্ষায় যথাযথ পদক্ষেপের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তাঁরা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিবছর ২৯ জুলাই আন্তর্জাতিক বাঘ দিবস উপলক্ষে নানা কর্মসূচি নেওয়া হলেও অধিকাংশ উদ্যোগ এক দিনের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকে।
এ বিষয়ে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, বনের পার্শ্ববর্তী এলাকায় অসংখ্য শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে। এসব কারখানার তরল বর্জ্য নদীতে ফেলা হচ্ছে, যা নদীকে দূষিত করছে। এই দূষণ বাঘের জন্য ক্ষতিকর। আবার কিছু জেলে বিষ দিয়ে মাছ ধরছেন। এটিও বাঘের জন্য হুমকি। সুন্দরবনে হরিণ শিকার পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। অথচ বাঘের প্রধান খাদ্য হরিণ ও বন্যশূকর। এই বাস্তবতা বাঘ সংরক্ষণের জন্য বড় হুমকি।
ড্রিম রিসার্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান গবেষক মীর মোহাম্মদ আলী। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, সুন্দরবনের আশপাশের হাজারো মানুষ জীবিকার প্রয়োজনে নিয়মিত বনে প্রবেশ করেন। এতে বাঘের আবাসস্থলে মানুষের চাপ বাড়ছে। গবেষণা, পর্যবেক্ষণ, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ এবং পর্যাপ্ত অর্থায়ন ছাড়া এই অর্জন ধরে রাখা কঠিন হবে।
পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বাঘ সংরক্ষণকে আরো কার্যকর করতে নতুন একটি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ করছে বন বিভাগ। এতে স্মার্ট পেট্রোলিং ও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, ক্যামেরা ট্র্যাপ নেটওয়ার্ক সমপ্রসারণ, বাঘের খাদ্যপ্রাণী সংরক্ষণ, মানব-বাঘ সংঘাত কমাতে দ্রুত ব্যবস্থা, সুন্দরবনসংলগ্ন জনগোষ্ঠীর বিকল্প জীবিকা, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় অভিযোজন এবং গবেষণা ও দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রয়েল বেঙ্গল টাইগার শুধু বাংলাদেশের জাতীয় প্রাণী নয়, সুন্দরবনের সুস্থ বাস্তুতন্ত্রেরও প্রতীক। তাই বাঘ রক্ষা মানে শুধু একটি প্রজাতিকে টিকিয়ে রাখা নয়; বরং বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন, উপকূলীয় পরিবেশ এবং দেশের জীববৈচিত্র্যের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখা।
বাঘের সাম্প্রতিক ভিডিও বিশ্লেষণ করে বন কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, চাঁদপাই রেঞ্জে দেখা যাওয়া বাঘটি গত ১৩ জুলাই অবমুক্ত করা আহত বাঘিনী নয়; বরং অন্য একটি পূর্ণবয়স্ক বাঘিনী। ঘটনাটি প্রমাণ করে, ওই এলাকায় এখন একাধিক বাঘের বিচরণ রয়েছে।
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী কালের কণ্ঠকে জানান, সমপ্রতি আট কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বসানো ২০টি ক্যামেরা ট্র্যাপে নতুন করে আরো তিনটি বাঘের ছবি শনাক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি বন টহলের সময় আগের তুলনায় বাঘের পায়ের ছাপও বেশি দেখা যাচ্ছে।
খুলনার বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, ২০১৪ সালের জরিপে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ছিল ১০৬টি। ২০১৮ সালে তা বেড়ে হয় ১১৪টি। সর্বশেষ ২০২৪ সালের জরিপে বাঘের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২৫টিতে। অর্থাৎ এক দশকে ১৯টি বাঘ বেড়েছে। বন বিভাগের ভাষ্য, এটি সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র এখনো বাঘের প্রজননের জন্য অনুকূল রয়েছে তারই ইঙ্গিত।
বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদের ভাষ্য, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় সুন্দরবনের ভেতরে ২০টি মাটির কিল্লা বা উঁচু আশ্রয়স্থল নির্মাণ করা হয়েছে। জোয়ার কিংবা ঘূর্ণিঝড়ের সময় বাঘ, হরিণসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণী সেখানে আশ্রয় নিতে পারে। পাশাপাশি এসব স্থানের পাশে মিঠাপানির পুকুর খনন করা হয়েছে। যাতে লবণাক্ত পরিবেশেও প্রাণীগুলো সুপেয় পানি পায়।
সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুজ্জামান বলেন, ‘বাঘ যদি নিরাপদ আবাসস্থল না পেত, তাহলে তাদের সংখ্যা বাড়ত না। গত ১০ বছরে প্রায় ৯.৬২ শতাংশ বাঘ বেড়েছে। এটিই প্রমাণ করে সুন্দরবনের পরিবেশ এখন তাদের প্রজননের জন্য উপযোগী।’
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, অপরাধপ্রবণ ২৫টি স্থানে ক্যামেরা বসিয়ে বন অপরাধ পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি স্মার্ট পেট্রোলিং, ড্রোন নজরদারি, পদচারণভিত্তিক টহল এবং গোপন তথ্যদাতাদের মাধ্যমে চোরাশিকারিদের দমন কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। এসব উদ্যোগের ফলে বন্যপ্রাণী হত্যার হার আগের তুলনায় কমেছে বলে দাবি করছে বিভাগ।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. মো. ওয়াসিউল ইসলাম বলেন, বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি অবশ্যই ইতিবাচক। নিয়মিত বাঘের শাবক দেখা যাওয়াও প্রমাণ করে যে প্রজনন স্বাভাবিকভাবে হচ্ছে।
বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধির পরিসংখ্যানকে এখনই পুরোপুরি স্বস্তির বার্তা হিসেবে দেখতে রাজি নন সুন্দরবন একাডেমির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির। তাঁর মতে, সংখ্যা বৃদ্ধি অবশ্যই ইতিবাচক; কিন্তু বাঘ ও বাঘিনীর অনুপাতও প্রকাশ করা জরুরি। কারণ প্রজনন ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে এই অনুপাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
খুলনা বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের কর্মকর্তা মো. মফিজুর রহমান চৌধুরীর দেওয়া তথ্য মতে, বন্যপ্রাণী উদ্ধারে এখনো আধুনিক যানবাহন, বিশেষায়িত খাঁচা ও স্বয়ংক্রিয় অবমুক্তি প্রযুক্তির ঘাটতি রয়েছে। তিনি বলেন, এসব সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে পারলে ভবিষ্যতে আরো কার্যকরভাবে বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও সংরক্ষণ সম্ভব হবে।