ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের শুরুর দিনই সংসদ সদস্য (এমপি) ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দ্বৈত শপথকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হতে পারে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জয়ী দলগুলোর মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়া নিয়ে তীব্র মতবিরোধ দেখা দিয়েছে।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ও জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের পক্ষ থেকে এ নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। এমনকি মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠান বর্জনের মতো নজির স্থাপন হয়েছে। শুরুর দিনই পয়েন্ট অব অর্ডারে বিষয়টি নিয়ে উত্তপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে উভয় জোটের এমপিদের সূত্রে জানা গেছে।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সংসদ সচিবালয়ের শপথ কক্ষে নির্বাচিত এমপিরা শপথ নেন। বিদ্যমান সংবিধানে না থাকায় সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি বিএনপি ও তাদের শরিকরা। অন্যদিকে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে থাকায় একই সঙ্গে দুই শপথ নিয়েছে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোট। বিষয়টি নিয়ে দুই জোটের পক্ষ থেকে ভিন্ন ভিন্ন আইনি ব্যাখা দেওয়া হয়েছে। এ দ্বিমুখী অবস্থানের কারণে সংসদ অধিবেশন শুরুর দিনই উত্তপ্ত হতে পারে সংসদ। এ নিয়ে দুই জোটের এমপিরা প্রস্তুতিও নিয়েছেন।
আগামীকাল বেলা ১১টায় শুরু হচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন। এ ব্যাপারে পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়েছে সংসদ সচিবালয়। ২০২৪ সালের গণ অভ্যুত্থানে ক্ষতির শিকার হওয়া সংসদ ভবনের বেশির ভাগ সংস্কারের কাজ শেষ হয়েছে।
নির্বাচনের ঠিক এক মাসের মাথায় শুরু হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন। সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, এরই মধ্যে বিএনপি ও জামায়াতের কয়েকজন এমপি সংসদ সচিবালয়ের লাইব্রেরি ও গবেষণা কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। শপথ ইস্যুতে কার্যপ্রণালি বিধির কোন কোন পয়েন্টে সংসদ অধিবেশনে আলোচনা করা যায় কিংবা কীভাবে বিষয়টি সংসদের রেকর্ডে রাখা যায় তা নিয়ে জানতে চেয়েছেন। তবে বেশির ভাগ এমপি প্রশ্নোত্তর ও পয়েন্ট অব অর্ডারে শপথ ইস্যু নিয়ে অধিবেশন উত্তপ্ত করতে পারেন বলে জানান তারা। আবার কয়েকজন এমপি দুই শপথের বিষয়টি নোটিশ আকারে সংসদে উত্থাপনের পরিকল্পনা করেছেন।
‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫’ অনুযায়ী, নবনির্বাচিত এমপিদের দুটি শপথ নেওয়ার বিধান রাখা হয়। একটি সাধারণ সংসদ সদস্য হিসেবে এবং অন্যটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে। সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বিএনপি শুধু এমপি হিসেবে শপথ নিলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দ্বিতীয় শপথ নেয়নি। তাদের মতে, বিদ্যমান সংবিধানে এ পরিষদের কোনো আইনি ভিত্তি নেই এবং এটি সংসদীয় সার্বভৌমত্বের পরিপন্থি। অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) উভয় শপথই গ্রহণ করেছে। তারা বলছে, গণভোটের রায় অনুযায়ী সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হলে এ শপথ জরুরি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সংস্কার পরিষদের শপথ না নেওয়ায় এ পরিষদের কার্যকারিতা ও বৈধতা নিয়ে বড় ধরনের আইনি শূন্যতা তৈরির আশঙ্কা করা হচ্ছে। সংসদের ভিতরেই বড় দলগুলোর মধ্যে এ ইস্যুতে পাল্টাপাল্টি যুক্তি ও উত্তপ্ত বিতর্কের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। জামায়াত নেতারা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, বিএনপি দ্বিতীয় শপথ এড়িয়ে গেলে তা জুলাই বিপ্লবের আকাক্সক্ষার প্রতি অবিচার হবে। নিয়ম অনুযায়ী ১৮০ দিনের মধ্যে সংস্কার সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা থাকায় অধিবেশনের প্রথম দিন থেকেই এই ইস্যুতে চাপ বাড়বে। তাদের মতে, এবারের অধিবেশনে মূল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হতে যাচ্ছে ‘দুই শপথ’কেন্দ্রিক আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্ক।
জুলাই সনদ সংশ্লিষ্টরা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, রাষ্ট্রপতির জারি করা জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, গণভোটে হ্যাঁ বিজয়ী হলে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও কাজ করবেন। ৬০ সদস্যের কোরাম হলেই এ পরিষদ কাজ করতে পারে। ওই আদেশের ভিত্তিতে যে গণভোট হয়েছে, সেখানে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয় লাভ করেছে। বিএনপি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নিলেও জামায়াত-এনসিপির ৭৭ জন নির্বাচিত সদস্য একই সঙ্গে সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন। তারা বলেন, গণভোটের রায়ের কারণে যদি জুলাই আদেশ বাস্তবায়নযোগ্যই হয়ে যায়, তাহলে সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রয়োজনীয়তাই থাকে না। আবার অন্যদিকে যেসব সদস্যরা শপথ নিয়েছেন তারা নিজেরাই জুলাই আদেশ অনুযায়ী সংবিধান বানিয়ে ফেলতে পারেন। তাদের মতে, জুলাই আদেশে এ ধরনের সুযোগ থাকায় একে ঘিরে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।