ইরানের ওপর চলমান মার্কিন হামলার মধ্যে আজকে 'সবচেয়ে শক্তিশালী ও তীব্র হামলা' করা হবে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। এদিন সবচেয়ে বেশি যুদ্ধবিমান, বোমারু বিমান দিয়ে ইরানে আক্রমণ পরিচালিত হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। খবর বিবিসি।
পেন্টাগনে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে হেগসেথ বলেন, ‘আজকের দিনটি হবে ইরানে আমাদের সবচেয়ে ভয়াবহ হামলার দিন—সবচেয়ে বেশি যুদ্ধবিমান, বোমারু বিমান এবং সবচেয়ে বেশি সংখ্যক আক্রমণ আজ চালানো হবে।’
তিনি আরও জানান, এই সামরিক অভিযানের লক্ষ্য ও শেষ পরিণতি কী হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ব্রিফিংয়ে হেগসেথ বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় ইরান যুদ্ধ শুরুর পর সবচেয়ে কম সংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে, যা মার্কিন অভিযানের কার্যকারিতার প্রমাণ বলে দাবি করেন তিনি।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, ‘এটি ২০০৩ সাল নয়; বুশ বা ওবামা আমলের মতো আমরা কোনো অন্তহীন দেশ গঠনের চোরাবালিতে আটকা পড়ছি না।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘গত ৪৭ বছর ধরে ইরানের এই বর্বর শাসকগোষ্ঠী তাদের সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে আমাদের ভাইদের হত্যা করেছে। এখন তারা পারমাণবিক বোমা বানিয়ে বিশ্বকে জিম্মি করার প্রতিযোগিতায় নেমেছে। আমাদের প্রজন্ম এই লড়াইটা বোঝে।’
ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে হেগসেথ বলেন, ইরানি নেতারা এখন ‘বেপরোয়া ও দিশেহারা’, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ‘জিতছে’। তবে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির আহত হওয়ার খবর নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।
একই ব্রিফিংয়ে মার্কিন জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন জানান, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইতোমধ্যে ৫ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ অভিযানের ফলে ইসরায়েল এবং পারস্য উপসাগরীয় মিত্রদের ওপর ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সক্ষমতা প্রায় ৯০ শতাংশ কমে গেছে।
কেইন বলেন, ‘ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রবণতা ক্রমাগত কমছে। যুদ্ধ শুরুর তুলনায় বর্তমানে এই হামলা ৯০% কমে গেছে। এছাড়া ড্রোন হামলার পরিমাণ কমেছে ৮৩%।’
তিনি জানান, মার্কিন অভিযানের তিনটি প্রধান লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এগুলো হলো—ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা ধ্বংস করা, ইরানি নৌবাহিনীর ওপর আঘাত হানা এবং দেশটির সামরিক ও শিল্প ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা।
উল্লেখ্য, মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার প্রথম দিনেই আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর তার দ্বিতীয় ছেলে মোজতবা খামেনিকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা ঘোষণা করা হয়। তবে এই পরিবর্তনে অসন্তোষ প্রকাশ করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফক্স নিউজকে বলেন, ‘আমার মনে হয় না সে শান্তিতে থাকতে পারবে।’
যুদ্ধের পরিস্থিতি নিয়ে ভিন্ন বার্তাও পাওয়া যাচ্ছে। সোমবার সিবিএস নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘সামরিক দিক থেকে বলতে গেলে ইরান আর অবশিষ্ট নেই, এই যুদ্ধ প্রায় শেষ।’
তবে একই সময়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর সামাজিক মাধ্যমে একটি ভিডিও পোস্ট করে জানায়, ‘আমরা কেবল লড়াই শুরু করেছি।’
‘৬০ মিনিটস’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হেগসেথ বলেন, ট্রাম্প যে ‘বিনা শর্তে আত্মসমর্পণের’ কথা বলছেন, তার অর্থ হলো—‘আমরা জেতার জন্যই লড়ছি এবং শর্তগুলো আমরাই নির্ধারণ করব। শত্রু পক্ষ তেহরান স্কয়ারে দাঁড়িয়ে আত্মসমর্পণ করবে কি না, সেটা তাদের ব্যাপার।’
এদিকে যুদ্ধের মধ্যে ইরানও পাল্টা হামলা অব্যাহত রেখেছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সোমবার পিবিএস নিউজকে বলেন, ‘যতদিন প্রয়োজন আমরা ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যেতে প্রস্তুত।’
মঙ্গলবার ইরান উপসাগরীয় আরব দেশগুলোতে নতুন করে হামলা চালিয়েছে বলে জানা গেছে। অন্যদিকে ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ ও পূর্ব লেবাননে আক্রমণ চালিয়েছে।
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও উদ্বেগ বাড়ছে। ইতোমধ্যে এই সংঘাতে সাতজন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। তাদের আত্মত্যাগের জন্য গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন জেনারেল ড্যান কেইন।
অন্যদিকে সম্ভাব্য আরেকটি বড় ঝুঁকি হিসেবে উঠে এসেছে হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল সরবরাহ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরান যদি এই প্রণালী বন্ধ করে দেয়, তবে সেটি দখলের সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেছেন ট্রাম্প।
কেইন জানান, হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে মার্কিন সামরিক পাহারায় পার করে দেওয়ার বিষয়টি নিয়েও বিভিন্ন বিকল্প খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এই অনিশ্চয়তার কারণে বিশ্ব তেলের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১১৯ ডলারে পৌঁছায়, যা ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর সর্বোচ্চ।a