Image description
দরিদ্র নারীর সুরক্ষায় ফ্যামিলি কার্ড

দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী নারীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুরক্ষা জোরদারে নতুন উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। পরীক্ষামূলকভাবে (পাইলট প্রকল্প) দুই উপজেলায় চালু হচ্ছে ‘ফ্যামিলি কার্ড’। সেগুলো হচ্ছে-বগুড়ার গাবতলী ও দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে। প্রাথমিকভাবে এ দুটি উপজেলার ১৫ হাজার নারীকে এ সুবিধার আওতায় আনা হচ্ছে। এ কর্মসূচির আওতায় সম্ভাব্য নগদ দুই হাজার টাকা বা সমপরিমাণ অর্থের খাদ্যপণ্য দেওয়া হবে। অর্থ দেওয়া হবে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে। প্রকল্পের পরিধি পর্যায়ক্রমে বাড়বে। দেশব্যাপী ৫ কোটি নারীকে এ সুবিধার আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।

ফ্যামিলি কার্ডসংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে রোববার পাইলট কর্মসূচির এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে আর্থিক সহায়তার বিষয়টি খসড়া পর্যায়ে আছে। চূড়ান্ত পর্যায়ে অর্থের পরিমাণ না বাড়লে জনপ্রতি দুই হাজার টাকাই বহাল থাকবে। সরকারের গঠিত কমিটি মঙ্গলবার ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর কাছে ফ্যামিলি কার্ড সংক্রান্ত চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেবে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

ফ্যামিলি কার্ড মূলত একটি বিশেষ ডেটাবেজ-ভিত্তিক পরিচয়পত্র-যার মাধ্যমে যোগ্য পরিবারগুলো নিয়মিত সরকারি আর্থিক অনুদান পাবে। সমাজকল্যাণমন্ত্রী জেডএম জাহিদ হোসেন জানিয়েছেন, এই কার্ডের অর্থ সরাসরি পরিবারের গৃহকর্ত্রীর হাতে তুলে দেওয়া হবে, যা নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করবে। সরকার আগামী ৩ থেকে ৬ মাসের মধ্যে দেশের ৫০ শতাংশের বেশি যোগ্য পরিবারকে এ প্রকল্পের আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

সূত্রমতে, ফ্যামিলি কার্ডসংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় অর্থ মন্ত্রণালয়ে। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সেখানে মহিলা ও শিশুবিষয়কমন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর ও উপদেষ্টা সদস্য মাহ্দী আমিন উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে ফ্যামিলি কার্ডের পাইলট প্রকল্পের ওপর একটি ধারণাপত্র উপস্থাপন করা হয়।

বৈঠকে ছিলেন এমন শীর্ষ পর্যায়ের এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে জানান, এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে যে অর্থের প্রয়োজন হবে, সেটি চলতি অর্থবছরের বাজেটের অপ্রত্যাশিত খাত এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বাজেট থেকে দেওয়া হবে। চার হাজার কোটি টাকার থোক বরাদ্দ আছে অপ্রত্যাশিত খাতে। ফলে অর্থ নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধাভোগী নারী নির্বাচনে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। নির্বাচনের প্রক্রিয়া হিসাবে সরকারের খানা জরিপ এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ডাটাবেজ ব্যবহার করা হবে। সেখান থেকে প্রকৃত এবং উপযুক্ত সুবিধাভোগীকে শনাক্ত এবং এনআইডি কার্ডের মাধ্যমে উপযুক্ত ব্যক্তিকে তালিকাভুক্ত করা হবে।

সূত্র জানায়, বর্তমান সরকারের সামাজিক নিরাপত্তার একাধিক কর্মসূচি চলমান আছে। এদের মধ্য থেকেই অনেকে ফ্যামিলি কার্ড পাওয়ার যোগ্য হবেন। ফলে তাদের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ভাতার পরিমাণ বেড়ে যাবে। উদাহরণস্বরূপ, গাবতলী উপজেলার একজন বয়স্ক নারী বিধবা ভাতা পাচ্ছেন। তিনি দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করায় এখন ফ্যামিলি কার্ডও পাবেন। তার বিধবা ভাতার অর্থ ফ্যামিলি কার্ডের মধ্যে সমন্বয় হবে। এতে ওই নারীর ভাতার পরিমাণ আগের তুলনায় বেড়ে যাবে।

এদিকে ফ্যামিলি কার্ডসংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির কার্যপরিধিতে প্রাথমিক পর্যায়ে দেশের ৮টি বিভাগের প্রতিটিতে ১টি করে উপজেলায় ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রবর্তনের ব্যবস্থার কথা বলা আছে। কিন্তু রোববারের বৈঠকে প্রাথমিকভাবে বগুড়ার গাবতলী এবং দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলা দুটিতে পাইলট প্রকল্প শুরুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকারের দারিদ্র্য মানচিত্রের হিসাবে গাবতলীতে মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে। দিনাজপুরে নবাবগঞ্জ উপজেলার দারিদ্র্যসীমার হার সর্বশেষ সরকারি (২০২২) তথ্যে পৃথকভাবে তুলে আনা হয়নি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৬ সালের হিসাবে নবাবগঞ্জ উপজেলায় দারিদ্র্যের হার ৩৯ দশমিক ৬ শতাংশ ছিল। সূত্র আরও জানায়, ওই বৈঠকে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বাস্তবায়নের একটি উপযুক্ত ডিজাইন নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

বিএনপি সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে দেশের ৫ কোটি নারীকে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। সে প্রেক্ষাপটে সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর ১৯ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার ‘ফ্যামিলি কার্ড প্রদানসংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি’ গঠন করে ২৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে রিপোর্ট দেওয়ার সময় বেঁধে দেওয়া হয়।

জানতে চাইলে সাবেক সিনিয়র অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, দেশের সবচেয়ে বেশি দারিদ্র্যপীড়িত দুটি উপজেলায় এ কর্মসূচি চালু করা গেলে ভালো হবে। দ্বিতীয়ত, এ কর্মসূচি পরিচালনার জন্য চলতি বাজেট থেকে অর্থ বরাদ্দ সঠিক হবে। কিন্তু কোনোভাবে টাকা ছাপিয়ে এ ধরনের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা ঠিক হবে না। কারণ, এতে মূল্যস্ফীতি আরেক দফা বেড়ে যাবে। সীমিত পরিসরে এ কর্মসূচি চালু হচ্ছে এটিও ঠিক আছে। তবে দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে আবার পরিবারের ছেলেমেয়ে স্কুলে যাচ্ছে সে পরিবারকে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে।

অবশ্য সরকারি হিসাবে মোট জনসংখ্যার ১৯.২ শতাংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে। ওই হিসাবে ৩ কোটি ২০ লাখ মানুষ গরিব আছে।