ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ১২ মার্চ সংসদের অধিবেশন শুরু হচ্ছে। আর প্রথম অধিবেশনেই ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ ইস্যুতে উত্তপ্ত হতে পারে জাতীয় সংসদ। দলগুলোর বক্তব্য ও আইন বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যে এমন ইঙ্গিত মিলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন সংসদ-সদস্যদের (এমপি) শপথগ্রহণের পর থেকেই দেশে রাজনীতিতে কিছুটা উত্তাপ ছড়িয়েছে। তবে এই উত্তাপ সংকটে রূপ নেয় কি না, তা দেখার জন্য সংসদের প্রথম অধিবেশন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
কারণ, নির্বাচনের পর সরকারি দলের নির্বাচিতরা শুধু সংসদ-সদস্য হিসাবে শপথ নিয়েছেন। আর বিরোধী দলের সদস্যরা নিয়েছেন দুইটি শপথ। একটি সংসদ-সদস্য হিসাবে এবং অন্যটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে। তাদের মতে, একই দেশে দুই নিয়ম চলতে পারে না।
সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদের বিষয়টি গণভোটে স্বীকৃতি মিলেছে। গণভোটের মাধ্যমে জনগণের রায় সংবিধানের চেয়ে কম নয়। আমি মনে করি, আরও বেশি।’ সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেন, ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে শপথ না নিয়ে বিএনপির সংসদ-সদস্যরা সংবিধান-পরিপন্থি কোনো কাজ করেননি। যেহেতু সংবিধানে এখন নেই, তাই শপথ নেওয়ার প্রশ্ন আসে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আইনুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে সংকট তৈরি হয়েছে। আর এ সংকট কতটা ঘনীভূত হবে, সংসদ অধিবেশন শুরুর পর তা বোঝা যাবে। বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন বলেন, নির্বাচনের স্বার্থেই বিএনপি সংবিধান সংস্কার পরিষদ মেনে নিয়েছিল। এখন আমরা সংবিধানের বাইরে যেতে পারি না।
প্রসঙ্গত, ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে জাতীয় নির্বাচন ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ইস্যুতে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। গণভোটের ব্যালটে জুলাই সনদের ৮৪টি ধারা বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্ট ৫টি প্রশ্ন ছিল। এগুলো হলো-জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ পাশ, তত্ত্বাবধায়ক সরকারসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ, নির্বাচনে সাধারণ মানুষের ভোটের আনুপাতিক হার অনুসারে সংসদে উচ্চকক্ষ গঠন, জুলাই সনদে দলগুলো যেসব ইস্যুতে একমত হয়েছে সেগুলো বাস্তবায়ন এবং এর বাইরে সনদের অন্যান্য ধারা রাজনৈতিক দলগুলো তাদের প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করতে পারবে। আবার জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে উল্লেখ ছিল সংসদ-সদস্যরা দুটি শপথ নেবেন। প্রথমত সংসদ-সদস্য হিসাবে এবং দ্বিতীয় সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে। গণভোটে অংশ নেওয়া ভোটারদের মধ্যে ৬৮ শতাংশই ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে সমর্থন দিয়েছেন। অর্থাৎ তারা এসব প্রস্তাব সমর্থন করছেন। কিন্তু নির্বাচনের পর বিতর্ক শুরু হয়। বিএনপির সদস্যরা সংসদ-সদস্য হিসাবে শপথ নিলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেননি। তারা বলছেন, এ ধরনের কিছু বর্তমান সংবিধানে নেই। অপরদিকে জামায়াত ও এনসিপির সদস্যরা দুটিই শপথ নিয়েছেন। এ নিয়ে আগামী সংসদ উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার রোববার যুগান্তরকে বলেন, গণভোটের ব্যালটে জুলাই সনদের ৪৮টি ধারা এবং ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ’ সংযুক্ত করা আছে। ওই আদেশে বলা হয়েছে-নির্বাচিত সংসদ-সদস্যরা প্রথম ১৮০ কার্যদিবস ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ হিসাবে কাজ করবেন। আদেশের মধ্যে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ ছাড়াও এই পরিষদের সদস্যদের শপথে কী থাকবে এবং কে শপথ পড়াবেন, সেটিও উল্লেখ আছে। এরপর জনগণ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে জুলাই সনদ ও বাস্তবায়ন আদেশ অনুমোদন করেছে। অর্থাৎ গণভোটে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ পাশ হয়েছে। ফলে সংবিধান সংস্কার পরিষদের বিষয়টি গণরায়ে স্বীকৃতি মিলেছে। এই রায় না মেনে সরকারের সামনে আমি কোনো বিকল্প দেখছি না।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রের মালিক দেশের জনগণ। ফলে এই দেশ কীভাবে চলবে, জনগণই এই সিদ্ধান্ত নেবে। তার মতে, জনগণ তার নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন করে। জনগণের এই প্রতিনিধির নাম হলো ‘গণপরিষদ’। এই গণপরিষদ গঠনের মানে হলো জনগণ বলে দেয়, তারা আমাদের প্রতিনিধি এবং সংবিধান সংশোধন করবে। ফলে ‘গণভোটের মাধ্যমে জনগণের রায় সংবিধানের চেয়ে কম নয়; আমি মনে করি, আরও বেশি।’ সরকার এটি মানতে বাধ্য। শেষ পর্যন্ত এর সমাধান কী-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে আদালতে একটি রিট হয়েছে। এখন আদালত রায় দেবে। রায়ের পর বোঝা যাবে বিষয়টি কোনদিকে যাচ্ছে।
সুপ্রিমকোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেন, ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে শপথ না নিয়ে বিএনপির সংসদ-সদস্যরা সংবিধান-পরিপন্থি কোনো কাজ করেননি। কারণ, সংবিধানে বলা আছে কে শপথ নেবে, কীভাবে শপথ নেবে, কার কাছে শপথ নেবে। কিন্তু বর্তমান সংবিধানে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ বলে কিছু নেই। সংবিধানে যদি এই পরিষদ যোগ করা হয়, তখন শপথ নেওয়ার প্রশ্ন আসবে। যেহেতু সংবিধানে এখন নেই, তাই শপথ নেওয়ার প্রশ্ন আসে না। ফলে বিএনপির অবস্থান ঠিক আছে। তিনি বলেন, ‘যারা বলছেন সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে শপথ না নিয়ে বিএনপির সংসদ-সদস্যরা জুলাইয়ের চেতনার পরিপন্থি কাজ করেছেন, তারা বলতে পারেন। কিন্তু চেতনা-পরিপন্থি হলে তো আর সংবিধান-পরিপন্থি হয় না। আর চেতনা তো একটা আপেক্ষিক বিষয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদের ধারণাটা মূল্যহীন। কারণ, সংসদই সংবিধান সংস্কার করতে পারে। এই সংসদই পারবে। সেজন্য সংবিধান সংস্কার পরিষদ বলে আলাদা একটা বিষয়ের কেন দরকার পড়ল, সেটা আমার কাছে বোধগম্য হচ্ছে না।
ড. শাহদীন মালিক বলেন, অনেকে বলছে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জিতে যাওয়ায় সংস্কার করতে হবে। তাহলে তো বলতে হবে, সংস্কার গণভোটের মধ্য দিয়েই হয়ে গেছে। আবার সংবিধান সংস্কার পরিষদ লাগবে কেন?
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আইনুল ইসলাম রোববার যুগান্তরকে বলেন, বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে সংকট তৈরি হয়েছে। বিএনপি বলছে, যে অধ্যাদেশের কারণে গণভোট হয়েছে, সেই অধ্যাদেশ এখনো সংসদে আইন আকারে পাশ হয়নি। ফলে শপথ নেওয়ার বিষয়টি এখনো আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নয়। অধ্যাদেশটি আগে সংসদে পাশ হবে। এরপর সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হবে, তারপর তারা শপথ নেওয়ার বিষয়টি ভাববে। অন্যদিকে ইতোমধ্যে গণভোট হয়ে গেছে। এটি জনগণের মতামতের বহিঃপ্রকাশ। ফলে জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপিসহ বিরোধী দল বলছে, শপথ নেওয়া আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক। তিনি বলেন, যেহেতু এখনো এ বিষয়টি আইনে পরিণত হয়নি; তাই বিএনপির অবস্থানটিও একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। অন্যদিকে সব দল একমত হয়ে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য যে অঙ্গীকার করেছে, তার ভিত্তিতেই গণভোট হয়েছে। সেক্ষেত্রে গণভোটের রায় অনুসারে শপথ নেওয়া যেতে পারে। ফলে দুই ধরনের বক্তব্যই প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেন, ১২ মার্চ সংসদ বসলে সেখানে অধ্যাদেশগুলো উত্থাপন করা হবে। অধ্যাদেশগুলোয় কোনো ধরনের কাটাছেঁড়া ছাড়া পাশ হলে বিএনপি শপথ নেওয়ার জন্য সাংবিধানিকভাবে একরকম বাধ্য হবে। কিন্তু বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা ইতোমধ্যে বলা শুরু করেছেন, শপথ নেওয়ার কিছু নেই। ফলে একধরনের সংকটের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। বাকিটা ৮ থেকে ১০ দিন পর বোঝা যাবে। অর্থাৎ অধ্যাদেশ পাশ হলে বোঝা যাবে আগামী দিনে সংকট কতটা ঘনীভূত হবে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন যুগান্তরকে বলেন, বর্তমান সংবিধান অনুসারে বিএনপি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে শপথ নিতে বাধ্য নয়। কারণ, আমরা নির্বাচিত হয়েছি সংসদ-সদস্য হিসাবে, সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে নয়। আর আমরা সংবিধান অনুসারেই চলব। এর বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, শুধু নির্বাচনের স্বার্থে বিএনপি এ বিষয়ে আগে কোনো কথা বলেনি। জুলাই সনদ না মানলে নির্বাচন না হওয়ার আশঙ্কা ছিল কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অবশ্যই আশঙ্কা ছিল। কারণ, একটি পক্ষ নির্বাচন বাতিলের চেষ্টা করেছে। তারা চায়নি দেশে নির্বাচন হোক, দেশ একটি গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে আসুক। তাই গণতন্ত্রের স্বার্থে বাধ্য হয়েই বিএনপি ওই সময় সবকিছু মেনে নিয়েছে। কিন্তু এখন আমরা সংবিধানের বাইরে যেতে পারি না।