Image description

দুই দশক পর রাষ্ট্র ক্ষমতায় বিএনপি। জনতার বিপুল সমর্থনে দুই তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে সরকার গঠন করেছে দলটি। ইতিমধ্যে ৬০ সদস্যের মন্ত্রিপরিষদও গঠন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দায়িত্ব নেয়ার পরদিনই ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তবে নতুন সরকারের সামনে রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ।

অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরানো, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং শিক্ষা খাতে শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা- এই তিনটি বড় চ্যালেঞ্জকে গুরুত্ব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এ ছাড়া জনতুষ্টিবাদী পদক্ষেপ এড়িয়ে ব্যয়ে সংযম, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি ও মব জাস্টিস বন্ধ এবং কাঠামোগত সংস্কারে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার তাগিদ দেয়া হয়েছে। একইসঙ্গে অর্থনৈতিক দায়-দেনা ও পূর্ববর্তী চুক্তি পর্যালোচনা করে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)’র ফেলো ও এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফরমের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, নতুন সরকারের যাত্রা শুরু হচ্ছে- তিনটি বড় কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের মুখে। এগুলো হলো- পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের রেখে যাওয়া অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যা, অন্তর্বর্তী সরকারের অসমাপ্ত সংস্কার প্রক্রিয়া এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা।
সম্প্রতি ‘নতুন সরকারের সূচনাবিন্দু: অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন। ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য আরও বলেন, এ বাস্তবতায় সরকারকে এখনই জনতুষ্টিবাদী কোনো উদ্যোগ নেয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। ব্যয়ের ক্ষেত্রে সংযম ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেন তিনি। সরকার ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা ঘোষণার কথা বলেছে। তবে আর্থিক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে তাড়াহুড়া না করে ধৈর্য ধরতে হবে। চলতি অর্থবছরে বড় কোনো নতুন উদ্যোগ না নিয়ে বরং আগামী অর্থবছরের জন্য সুপরিকল্পিত প্রস্তুতি নেয়াই হবে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ। এতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণসহ সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন সহজ হবে।
দ্রব্যমূল্য পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তথ্য অনুযায়ী রমজানের প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ যথেষ্ট রয়েছে। তবে নিত্যপণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খলে রাজনৈতিক প্রভাবাধীন সিন্ডিকেটের অস্তিত্ব রয়েছে- যা ভাঙার প্রতিশ্রুতি নতুন সরকারি দলের নেতারা দিয়েছেন।

নতুন সরকারের অগ্রাধিকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এসব লক্ষ্য অর্জনে কার্যকর কৌশল নির্ধারণ জরুরি। তিনি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, মব সৃষ্টি, জবরদস্তি ও ঘুষের মাধ্যমে হয়রানিমূলক অর্থ আদায় বন্ধ করতে হবে; এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক তাৎপর্য গভীর।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিদেশের সঙ্গে সম্পাদিত বিভিন্ন চুক্তি খতিয়ে দেখার সুপারিশও করেন তিনি। দায়-দেনা পরিস্থিতি পর্যালোচনা এবং চুক্তিগুলোতে নিয়ম-নীতির ব্যত্যয় ঘটেছে কিনা তা যাচাইয়ের ওপর জোর দেন। ঋণ পরিস্থিতি নিয়ে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার যে অবস্থায় অর্থনীতি পেয়েছিল, তার চেয়ে দুর্বল অবস্থায় রেখে গেছে। রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি ও ব্যয় সংকোচনে ব্যর্থতা এ পরিস্থিতির কারণ হতে পারে। এ প্রেক্ষাপটে তিনি নতুন সরকারকে একটি ‘উত্তরণকালীন দল’ গঠনের পরামর্শ দেন। দলটি বিগত সরকারগুলোর আর্থিক ব্যবস্থাপনার ফরেনসিক পর্যালোচনা করে একটি দলিল তৈরি করবে, যার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হবে। পাশাপাশি আগামী মার্চের মধ্যে জাতীয় সংসদে একটি আর্থিক বিবৃতি দেয়ার আহ্বান জানান তিনি, যা আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন তিনি।

সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস)’র নির্বাহী পরিচালক, অর্থনীতিবিদ পারভেজ করিম আব্বাসী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শুরুতেই যেসব ইস্যু নিয়ে কথা ক্যাবিনেটে কথা বলেছেন, এসব বিষয় অনুসরণ করতে পারলে ভালো হবে। প্রথম কাজ হওয়া উচিত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি সাধন করা। দ্বিতীয়ত: রমজান মাসে খাদ্যমূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা। তৃতীয় হচ্ছে: চাঁদাবাজি রুখতে হবে। রমজান মাসেই যদি চাঁদাবাজি রুখতে পারে তাহলে মানুষের আস্থা অর্জন করা সম্ভব হবে। প্রথম ধাপে এই তিনটি বিষয় গুরুত্ব দেয়া উচিত। তিনি বলেন, সরকার ১৮০ দিনের যে প্রকল্প দিয়েছেন এটা ভালো। পাশাপাশি সামাজিক কিছু কাজ করতে হবে। খাল খনন, গাছ লাগানো এগুলো নিয়েও ভাবতে হবে বা দৃশ্যমান করতে হবে। এ ছাড়াও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যে একটা দূরত্ব তৈরি হয়েছে এই বিষয়টিতে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করতে হবে। তাহলে বিনিয়োগ হবে।

এ ছাড়াও শিক্ষার বিষয়ে তিনি বলেন, শিক্ষায় গত দেড় বছরে ব্যাপক অস্থিরতা ছিল। যার কারণে গুণগতমানে ব্যাপক ভুগতে হয়েছে। বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী (ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন) আগেও এই সেক্টরে প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। তার একটা সুনাম আছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে একটা নৈরাজ্য আছে। এগুলোকে থামাতে হবে। এটা প্রথম কাজ হওয়া উচিত। এরপর শিক্ষার চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে উন্নতি করতে হবে। গবেষণার দিকে নজর দিতে হবে।

শিক্ষার বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী বলেন, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় অরাজকতা বিরাজ করছে। শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংসের মুুখে। ১৭ বছর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নষ্ট রাজনীতি হয়েছে। দলীয়করণ হয়েছে। এখন এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য জরুরি ভিত্তিতে শিক্ষা সংস্কার কমিশন গঠন করা উচিত। শিক্ষা হতে হবে আমাদের একমুখী, কর্মমুখী এবং গণমুখী। স্থায়ী বা অস্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠন করে দ্রুত শিক্ষার হাল ফেরাতে হবে। তাদের সুপারিশগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।