Image description

বিশ্বের বিলুপ্তপ্রায় ও বিকাশমান ভাষা নিয়ে গবেষণার স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট (আমাই)। এটি বিশ্বের একমাত্র প্রতিষ্ঠান, যেখানে পৃথিবীর সব ভাষার নিদর্শন সংগ্রহ ও সংরক্ষণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। তবে প্রতিষ্ঠার দেড় দশক পার হলেও চরম অর্থসংকট, জনবল অভাব এবং গবেষণায় নামমাত্র বরাদ্দের কারণে প্রতিষ্ঠানটির মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এখন হিমাগারে। বিশেষ করে গত দেড় বছরে উদ্ভাবন ও গবেষণা কার্যক্রমে বড় ধরনের ধস নেমেছে।   

বরাদ্দ চিত্র: গবেষণার চেয়ে পরিচালনা ব্যয় বেশি 

প্রতি বছর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস এলে এই প্রতিষ্ঠানটির গুরুত্ব সামনে উঠে আসে সবার কাছে। তারপর বছরজুড়ে খুঁড়িয়ে চলতে থাকে সংস্থাটির গবেষণা। যেখানে মূল কাজ ভাষা নিয়ে গবেষণা ভাষার নির্দশন ও নমুনা সংগ্রহ—সেখানে গবেষণা ও উদ্ভাবনে বরাদ্দ পয়নি সংস্থটি।  

আমাই সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটির বাজেটের সিংহভাগই ব্যয় হচ্ছে কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা ও প্রশাসনিক কাজে। 

২০২৩-২৪ অর্থবছর: মোট বরাদ্দ ৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে গবেষণায় বরাদ্দ ছিল মাত্র ৬৫ লাখ এবং উদ্ভাবনে ৪ লাখ টাকা।

২০২৪-২৫ অর্থবছর: বরাদ্দ বেড়ে ৭ কোটি ৮৭ লাখ ৬৫ হাজার টাকা হলেও গবেষণায় উল্টো কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪৫ লাখ টাকায়। উদ্ভাবনে বরাদ্দ রাখা হয়েছে মাত্র ৫ লাখ। 

এদিকে ২০২৫ সালে নতুন করে সাত জন কর্মচারী নিয়োগ দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। 

গবেষকদের মতে, একটি আন্তর্জাতিক মানের ইনস্টিটিউটের জন্য এই বরাদ্দ ‘সমুদ্রের মাঝে একবিন্দু শিশির’। বাজেটের অভাবে বিদেশি বিশেষজ্ঞ আনা কিংবা বৈশ্বিক কোনও বিলুপ্তপ্রায় ভাষা নিয়ে কাজ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।   

ভাষা জাদুঘর: ১১২ দেশের সংগ্রহের গৌরব

সংকট সত্ত্বেও আমাই-এর ভাষা জাদুঘরে রয়েছে এক অনন্য সংগ্রহশালা। এখানে বাংলা ভাষার বিবর্তন থেকে শুরু করে বাংলাদেশের সব নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা এবং বিশ্বের ৬৬টি দেশের ভাষার নিদর্শন সংরক্ষিত আছে। এছাড়া আরও ৪৭টি দেশের নমুনা সংগ্রহের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। পর্যায়ক্রমে বিশ্বের ১৯০টি দেশের ভাষার নিদর্শন এক ছাদের নিচে আনার পরিকল্পনা রয়েছে সংস্থাটির।

বিপন্ন ভাষা সংরক্ষণে সীমাবদ্ধ উদ্যোগ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট বর্তমানে বাংলাদেশের ৭টি বিপন্ন ভাষার ডকুমেন্টেশনের কাজ করছে। 

এগুলো হলো—(১) রেংমিটচ্যা ভাষা: বান্দরবান জেলার আলিকদমে ব্যবহৃত; (২) খুমি ভাষা: বান্দরবান জেলায় ব্যবহৃত; (৩) পাত্র ভাষা: সিলেট ও মৌলভীবাজার জেলার কিছু অঞ্চলে ব্যবহৃত; (৪) কন্দ ভাষা: সিলেট ও মৌলভীবাজার জেলার কিছু অঞ্চলে ব্যবহৃত; (৫) মুণ্ডা ভাষা: খুলনা ও বাগেরহাট জেলার কিছু অঞ্চলে ব্যবহৃত; (৬) খাড়িয়া ভাষা: মৌলভীবাজার জেলার কিছু অঞ্চলে ব্যবহৃত; এবং (৭) কোডা ভাষা: দিনাজপুর জেলার বিরল উপজেলা এবং রাজশাহী জেলার তানোর ও বাগমারা অঞ্চলে ব্যবহৃত। 

তবে দেশীয় নৃ-ভাষার বাইরে আন্তর্জাতিক কোনও বিপন্ন ভাষা নিয়ে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছে না প্রতিষ্ঠানটি। 

এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “আমাদের মূল কাজ হলো বিশ্বের সব ভাষা নিয়ে গবেষণা, উন্নয়ন, প্রচার করা— বিভিন্ন ভাষা নিয়ে পরিকল্পনা করা ও ভাষার নীতি গ্রহণ করা। বিশেষ করে যেসব ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে সেসব ভাষার ডকুমেন্ট তৈরি করে সংগ্রহ করা, সংরক্ষণ করা। কিন্তু আমরা লোকবল ও গবেষক সংকটে জর্জরিত। বিদেশি গবেষক আনতে যে অর্থের প্রয়োজন, তার কোনও সংস্থান নেই। ফলে কাজগুলো খুবই সীমিত পরিসরে করতে হচ্ছে।” 

বর্তমান কার্যক্রম ও প্রকাশনা

প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আসাদুজ্জামানের তথ্যমতে, আমাই বর্তমানে ভাষা গবেষণা ও তথ্য সংরক্ষণে নিম্নোক্ত কাজগুলো করছে— 

গবেষণা ও ফেলোশিপ: এমফিল, পিএইচডি এবং পোস্ট ডক্টরাল ফেলোশিপের মাধ্যমে দেশি-বিদেশি গবেষকদের জ্ঞান বিনিময়ের প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা। 

প্রকাশনা: মাতৃভাষাপিডিয়া: বাংলা ও ইংরেজি দুই সংস্করণ। অভিধান: ১৬টি ভাষার বহুভাষী পকেট অভিধান ও বিভিন্ন নৃ-ভাষার অভিধান। সাময়িকী: মাতৃভাষা পত্রিকা, Mother Language Journal, এবং ত্রৈমাসিক ‘মাতৃভাষা-বার্তা’। 

আর্কাইভ ও ডাটা: ভাষা তথ্য-সংগ্রহ প্রতিবেদন এবং উপভাষাভিত্তিক কর্মশালার নথি তৈরি। 

ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা 

বিশ্বের ভাষাভাণ্ডার রক্ষা ও প্রসারে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট বেশ কিছু উচ্চাভিলাষী ও সময়োপযোগী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো বিলুপ্তপ্রায় ভাষাগুলোর ব্যাকরণ, ধ্বনিতত্ত্ব ও শব্দভান্ডার যথাযথভাবে নথিভুক্ত করার মাধ্যমে বিপন্ন ভাষা সংরক্ষণ করা। আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় অডিও, ভিডিও ও টেক্সট আর্কাইভ তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে, যা ভবিষ্যৎ গবেষণার এক বিশাল দ্বার উন্মুক্ত করবে। এছাড়া দেশের প্রতিটি অঞ্চলের আঞ্চলিক ও নৃ-ভাষাগুলোর প্রকৃত অবস্থা জানতে বৈজ্ঞানিক ‘লিঙ্গুস্টিক সার্ভে’ বা ভাষাতাত্ত্বিক জরিপ পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন ভাষার গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য ও তথ্য বিনিময়ের লক্ষ্যে একটি নিবেদিত ‘অনুবাদ সেল’ গঠনের পাশাপাশি বিশ্বের নামি ভাষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন এবং দ্বিপাক্ষিক গবেষণা চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে আমাই।

বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতা

সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও নানাবিধ আর্থিক ও প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতার কারণে বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির গতি কিছুটা শ্লথ হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে গবেষণা কাজের জন্য সরকারি অনুদান অত্যন্ত সীমিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বড় বড় প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরে বা দেশের বাইরে এই প্রতিষ্ঠানের কোনও শাখা খোলার পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়নি, যা এর কার্যপরিধিকে একটি নির্দিষ্ট গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ করে রেখেছে। একই সঙ্গে গত কয়েক বছরে নতুন কোনও আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে বড় ধরনের কোনও চুক্তির উদ্যোগ পরিলক্ষিত না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটিতে এক ধরনের কূটনৈতিক স্থবিরতা বিরাজ করছে, যা এর বৈশ্বিক লক্ষ্য অর্জনে অন্যতম অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট 

কানাডা প্রবাসী প্রয়াত রফিকুল ইসলাম ও আবদুস সালাম এবং তাদের প্রতিষ্ঠিত সংগঠন ‘Mother Language Lovers of the World Society’-এর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো একুশে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এই ঐতিহাসিক অর্জনের ওপর ভিত্তি করে বিশ্বের বিলুপ্তপ্রায় ও বিকাশমান ভাষাগুলোর মর্যাদা রক্ষা ও গবেষণার লক্ষ্যে ঢাকায় একটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। 

২০০১ সালের ১৫ মার্চ জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব কফি আনান এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকার সেগুনবাগিচায় এই প্রতিষ্ঠানের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ২০০৪ সালে ১২ তলাবিশিষ্ট ভবনের নির্মাণকাজ শুরু হলেও প্রাথমিকভাবে ছয়তলা সম্পন্ন হয়। ২০১০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ইনস্টিটিউটটি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। ২০১৬ সালের ১২ জানুয়ারি এটি ইউনেস্কো ক্যাটেগরি-২ প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা লাভ করে, যা একে বৈশ্বিক মানে উন্নীত করে। 

প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারি এলে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট আলোচনায় আসে। তাছাড়া বছরজুড়ে এটি অনেকটা ‘খুঁড়িয়ে চলা’ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। ইউনেস্কো ক্যাটাগরি-২ প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে এবং বাংলাসহ বিশ্বের সব ভাষার অধিকার রক্ষায় এই প্রতিষ্ঠানে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ ও মনোযোগ বাড়ানো জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।