Image description
নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে জরুরি ভিত্তিতে তিনটি পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। প্রথমটি হচ্ছে, বাজারে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির পেছনের কারণ শনাক্ত করা। দ্বিতীয়ত, বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকদের বাজার মনিটরিংয়ে সম্পৃক্ত করা এবং শেষটি হচ্ছে-টিসিবিকে আরও শক্তিশালী করা। এর মধ্যে বৃহস্পতিবার সব জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত তারা বাজার মনিটরিং করবেন। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

প্রসঙ্গত, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব গ্রহণের পর বুধবার প্রথম দিন মন্ত্রিসভার সদস্যদের দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন। একই দিন জাতির উদ্দেশে ভাষণে তিনি দ্রব্যমূল্য মানুষের নাগালের বাইরে যেন না যায়, সে ব্যাপারে ব্যবসায়ীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যদিও অনেকের মধ্যেই এ মাসটি (রমজান) ঘিরে অধিক মুনাফা লাভের প্রবণতা লক্ষণীয়। আপনাদের (ব্যবসায়ী) প্রতি আহ্বান, রমজানের পবিত্রতা রক্ষার স্বার্থে এ মাসটিকে ব্যবসার মুনাফা লাভের মাস হিসাবে পরিণত করবেন না।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, দ্রব্যমূল্য নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বেশকিছু পদক্ষেপ নিচ্ছে। এর মধ্যে যেসব কারণে বাজারে পণ্যের দাম বাড়ছে, সে কারণগুলো শনাক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আর এর অংশ হিসাবে বাজার বিশেষজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ, ক্রেতাদের সংগঠনসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে রোববার বৈঠক করবেন বাণিজ্যমন্ত্রী।

এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, যে কারণে পণ্যের দাম প্রতিনিতই বাড়ছে তা শনাক্ত না করা গেলে কোনো কর্মসূচি কাজে আসবে না। এজন্য যে কোনো কর্মসূচি নেওয়ার আগে কারণগুলো শনাক্ত করা হবে। এরপর মন্ত্রণালয় থেকে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে কর্মসূচি নেওয়া হবে।

জানতে চাইলে সাবেক বাণিজ্য ও অর্থসচিব (সিনিয়র) মাহবুব আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, নিত্যপণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে প্রথমে ঘাটে ঘাটে চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে। রংপুর থেকে ঢাকা পৌঁছতে ১০টি ঘাটে চাঁদা দিতে হয়। ব্যবসায়ীরা চাঁদার টাকা পণ্যের ওপর চাপিয়ে দেন। ফলে পণ্যের দাম বাড়ছে। চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে জিরো টলারেন্স থাকতে হবে পুলিশ প্রশাসনকে। এছাড়া মূল্য নিয়ন্ত্রণে দরকার মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতি সংকোচনমূলক রাখা। মুদ্রানীতি সংকোচনমূলক আছে। রাজস্বনীতিও করতে হবে। সরকারের অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমাতে হবে। নিত্যপণ্যের দাম কমাতে দোকানে দোকানে গিয়ে হুংকার দিলেও কমবে না। সরকারের পলিসিগুলো সমন্বয় করতে হবে। এছাড়া ক্রেতার ব্যবহারে পরিবর্তন আনতে হবে। হুজুগে বা মৌসুমে একসঙ্গে প্রয়োজনের বেশি পণ্য কেনার সংস্কৃতি থেকে ক্রেতাদের বেরিয়ে আসতে হবে। এসব পদক্ষেপ নিলে পণ্যের দাম কমে আসবে।

অবশ্য দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সাংবাদিকদের বলেছেন, দ্রব্যমূল্য নিয়ে কোনো ‘সাউন্ড বাইট’ নয়, বরং কাজের মাধ্যমে ফল দেখানো হবে। তিনি আরও বলেছেন, দেশে রমজানের পণ্যের পর্যাপ্ত মজুত ও সরবরাহ রয়েছে। পণ্য নিয়ে ভোক্তাদের আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। রমজান ও পরবর্তী সময়ের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যাপ্ত মজুত সরকারের হাতে রয়েছে এবং পাইপলাইনেও পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। ফলে বাজার নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। বাজার তদারকি ও সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।

এদিকে টিসিবিকে আরও শক্তিশালী করা হবে। বর্তমানে টিসিবির মাধ্যমে কোটি পরিবারকে ন্যায্যমূল্যে পণ্য দেওয়া হচ্ছে। এটি নতুন করে পর্যালোচনা করা হবে। এ কার্যক্রমের অংশ হিসাবে শনিবার টিসিবির ট্রাক সেল কার্যক্রম পরির্দশন করবেন বাণিজ্যমন্ত্রী।

সূত্র আরও জানায়, বৃহস্পতিবার বাজার মনিটরিংয়ের নির্দেশ দিয়ে দেশের সব ডিসিকে চিঠি দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি বিভাগীয় কমিশনারকেও দেওয়া হয়েছে চিঠি। ফলে এখন জেলা পর্যায়ে বাজার মনিটিরং চলবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, জেলা পর্যায়ে বাজার মনিটরিং কঠোরভাবে করতে হবে। কারণ, বিগত সময়েও এ ধরনের চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু উল্লেখ্যযোগ্য কার্যক্রম চোখে পড়েনি। সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকরা একে রুটিনওয়ার্ক হিসাবে ধরে নেন। কিন্তু বর্তমান সরকার যেহেতু বাজারে নিত্যপণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ চাচ্ছেন, তাই বিষয়টিকে জেলা প্রশাসকদের গুরুত্ব সহকারে নিতে হবে। অন্যথায় মনিটরিংয়ে দুর্বলতার সুযোগে অসাধু ব্যবসায়ীরা দাম বাড়িয়ে মুনাফা লুটে নেবেই।

বাজার পরিস্থিতি : এদিকে রোজা শুরুর সঙ্গে সঙ্গে সেই চিরচেনা চিত্র। সবকিছু, বিশেষ করে ইফতার ও সেহরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জিনিসপত্রের দামে রীতিমতো আগুন! এই বাড়তি দাম ‘জায়েজ’ করতে অন্তহীন অজুহাত। খুচরা বিক্রেতা পাইকারদের আর পাইকাররা আমদানিকারকদের দায়ী করছেন। রোজায় বেশকিছু দরকারি পণ্য বিশেষ করে লেবু, বেগুন, শসা, পেঁয়াজ, খেজুর, মুরগি, মাংস ও ফলের দাম লাগামহীন বেড়েছে।

এক সপ্তাহের ব্যবধানে কোনো কোনো পণ্যের দাম দ্বিগুণ বেড়েছে। রমজান সংযমের মাস হলেও বাজারে পণ্যের বাড়তি দর সাধারণ মানুষের জীবনে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে।

বাজার ঘুরে দেখা যায়, বেগুনের দাম দ্বিগুণ হয়ে প্রতি কেজি ১০০ থেকে ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দেশি শসা ১২০ থেকে ১৪০ টাকা কেজি। কাঁচা মরিচের কেজিও ২০০ থেকে ২৪০ টাকা। পাইকারি বাজারে দেশি পেঁয়াজের দাম এক সপ্তাহে কেজিতে ১০ টাকা বেড়েছে। বর্তমানে পাইকারিতে ৫৩ থেকে ৫৬ টাকা এবং খুচরায় ৬০ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ছোলার দাম কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা বেড়ে প্রতি কেজি ৯৫ থেকে ১০৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ছোট দানার মসুর ডাল কেজিতে ১৬০, মোটা দানার মসুর ডাল ১০০ এবং মাঝারি দানার মসুর ডাল ১১৫ থেকে ১২০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।

মুরগি ও মাংসে চাহিদার চাপ : রমজানে মুরগির চাহিদা বাড়ায় দামও বেড়েছে। সোনালি মুরগির কেজি মানভেদে ৩২০ থেকে ৩৪০ টাকা এবং ব্রয়লার মুরগি ২০০ থেকে ২১০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। খাসির মাংস কেজি ১৩০০ টাকা এবং গরুর মাংস কেজি ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

শুল্কছাড়েও বাড়ল খেজুরের দাম : দেশে পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও এবারও অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে খুচরা বাজারে খেজুরের দাম বেড়েছে। রাজধানীর খুচরা বাজারে গত দুই সপ্তাহে জাত ও মানভেদে বেশকিছু খেজুরের দাম কেজিতে ৫০ থেকে ১৫০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে। বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) খেজুর আমদানিতে শুল্ক ৪০ শতাংশ কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরও দাম কমেনি। বরং কিছু জাতের খেজুরের দাম বেড়েছে।