Image description
রাজধানীতে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে গতি নেই

রাজধানীতে কিউলেক্স মশার প্রকোপ ভয়ালরূপ ধারণ করেছে। বাসা-বাড়ি, অফিস, রাস্তাঘাট সর্বত্র এই মশার উৎপাত। পাশাপাশি ডেঙ্গু ভাইরাসবাহিত এডিস মশার প্রকোপও বাড়ছে। তবে দুই ধরনের মশা নিয়ন্ত্রণে যে ধরনের কাজ করা দরকার দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা তা করছে না বলে অনেকের অভিযোগ।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সর্বত্র কিউলেক্স মশার দাপট চলছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব বলছে-বৃষ্টিপাতহীন মৌসুমেও নতুন বছরের প্রথম ৫০ দিনে ডেঙ্গুজ্বর নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন। অর্থাৎ দৈনিক রোগী ভর্তির হার ২৮ জন। এ অবস্থার মধ্যেও জনপ্রতিনিধি শূন্য ঢাকার দুই নগর সংস্থার কার্যক্রমে বেহাল বিরাজ করছে। কিছু রুটিন কার্যক্রম হলেও তাতে মশা নিয়ন্ত্রণে আসছে না। এ অবস্থা চলতে থাকলে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে রাজধানী ঢাকায় ডেঙ্গুর প্রকোপ ভয়াবহ মাত্রায় পৌঁছাবে। এতে আবার অনেক মানুষের মৃত্যু হবে। গত বছর এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু ভাইরাসে ৪১৩ জন মারা গিয়েছিল।

রাজধানীর বসিলার বাসিন্দা বিলকিস খাতুন বলেন, ‘আমরা ১০ তলায় থাকি। তারপরও মশার উৎপাত। কয়েল জ্বালিয়েও মশা থেকে নিস্তার পাচ্ছি না। মশার কামড়ে দেড় বছরের মেয়ের শরীরে অনেক জায়গায় গোটা গোটা হয়ে গেছে।’

হাজারীবাগের কোম্পানি ঘাটের বাসিন্দা ও মাংস বিক্রেতা সাফায়েত হোসেন বলেন, ‘মশার উপদ্রবে দোকানে বসতে পারি না। সারাদিন দোকানে কয়েল জ্বালিয়ে রাখতে হয়। তবুও মশার কামড় থেকে বাঁচতে পারছি না। আর সন্ধ্যা নামলে ঝাঁকে ঝাঁকে মশা মানুষের ওপর হামলে পড়ে।’

তিনি বলেন, ‘এই এলাকায় সিটি করপোরেশনের পক্ষে মশার ওষুধ ছিটাতে দেখি না। মেয়র ও কাউন্সিলর না থাকায় মশা নিয়ন্ত্রণে দায়িত্বপ্রাপ্তরা খেয়ালখুশিমতো চলছেন।’

এ প্রসঙ্গে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব প্রিভেন্টিভ অ্যান্ড সোশ্যাল মেডিসিন (নিপসম)-এর কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ড. মো. গোলাম সারোয়ার যুগান্তরকে বলেন, ‘শীতের শেষে প্রকৃতিতে তাপমাত্রা বেড়ে যায়। এই আবহাওয়াটা কিউলেক্স মশার প্রজননের জন্য সহায়ক। বাধাহীনভাবে প্রজননের সুযোগ পেলে অল্প সময়ে বিপুলসংখ্যক কিউলেক্স মশা জন্ম লাভ করে। এ বছর তেমনটা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে যেখানে-সেখানে পানি জমে থাকার অনেক উৎস রয়েছে। সেসব উৎসে কিউলেক্সের প্রজনন ঘটছে। বিশেষ করে নগরের লেক ও ড্রেনেজগুলোতে পানি কমে যাওয়ায় ময়লা আবর্জনা বেশি পরিমাণে বেড়ে গিয়ে মশার প্রজনন ঘটছে।’

অধ্যাপক গোলাম সারোয়ার জানান, শীতের শেষে এবং বসন্তের শুরুতে হঠাৎ করে কিউলেক্স মশার উপদ্রব লক্ষ করা যাচ্ছে। এক্ষেত্রে কিউলেক্স মশার ঘনত্ব কমানোর জন্য অবশ্যই ময়লা আবর্জনা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নসহ বন্ধ ড্রেনগুলোকে পরিষ্কার করে সব সময় পানির প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। এডাল্টিসাইড স্প্রে করার সঙ্গে সঙ্গে বেশি বেশি করে নিয়মমাফিক লার্ভিসাইড প্রয়োগ করতে হবে যাতে ড্রেনের মধ্যে জন্মানো মশার লার্ভা অতি সহজে নিয়ন্ত্রণে আনা সহজ হয়।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ঢাকার দুই সিটিতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে অনেক জলাশয় রয়েছে। সরকারি খাল ও ডোবানালা রয়েছে। এসব নিয়মিত পরিষ্কার করা সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব। কিন্তু তা হচ্ছে না। দৈনিক রুটিন মেনে সকালে ওষুধ ছিটানো হয়-মশার লার্ভা ধ্বংস করতে। আর বিকালে অ্যাডাইটি সাইট ওষুধ প্রয়োগ করা হয়-উড়ন্ত মশা মারতে। এটি মূলত ফগিং মেশিনের সাহায্যে ধোঁয়া সৃষ্টি করে করা হয়। কিন্তু এসব কার্যক্রম রুটিন মেনে হচ্ছে না। ভিআইপিদের বসবাস এলাকায় নিয়মিত ওষুধ প্রয়োগ করা হলেও সাধারণ মানুষের বসবাস যেসব এলাকায় সেখানে ওষুধ ছিটানো হচ্ছে না। মেয়র ও কাউন্সিলরা থাকতে নিজ নিজ এলাকায় তারা মশার ওষুধ ছিটানোর কাজের তদারকি করতেন। এখন সেসব হচ্ছে না। তবে নগরবাসীর প্রত্যাশা নতুন সরকার নাগরিক সেবা নিশ্চিতে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করবে।

বিশেষজ্ঞ অভিমত : সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. আহমেদ নওশের আলম বলেন, এখন কিউলেক্স ও অ্যানোফিলিস মশার উপদ্রব লক্ষ করা যাচ্ছে। এসব মশায়ও বিভিন্ন রোগ ছড়ায়। বিশেষ করে অ্যানোফিলিস মশার কামড়ে ম্যালেরিয়া রোগ বেশি হয়। রাজশাহী, রংপুর ও পার্বত্য অঞ্চলে ম্যালেরিয়া বেশি দেখা যায়। ম্যালেরিয়া, ফাইলেরিয়া ও কালাজ্বর নির্মূলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের স্বতন্ত্র কার্যক্রম রয়েছে। আর কিউলেক্স মশার কামড়েও ফাইলেরিয়া বা গোদ রোগ হয়ে থাকে। তিনি বলেন, এডিস মশা থেকে ডেঙ্গু ভাইরাস ছড়িয়ে থাকে। দেশে প্রতিবছর জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চে ডেঙ্গুর প্রকোপ কম থাকে। মে ও জুন মাসে ডেঙ্গু আক্রান্তের মাত্রা অনেকাংশে বেড়ে যায়। বিগত বছরগুলোর মতো এবারও এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আসন্ন বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে এখন থেকে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে বিশেষ জোর দিতে হবে।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ (সিডিসি) শাখার ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. মো. হালিমুর রশীদ যুগান্তরকে বলেন, ‘মশার উপদ্রব বেশি হলে মশাবাহিত রোগ বাড়ার সম্ভাবনাও বেশি থাকে। মশার উপদ্রব নিয়ে সিটি করপোরশেন এবং আইডিসিআর কাজ করে। (সিডিসি) রোগীর চিকিৎসা এবং প্রতিরোধ নিয়ে কাজ করে। দেশে কিউলেক্স মশার কামড়ে ফাইলেরিয়া (গোদরোগ), জাপানি এনসেফালাইটিসের প্রকোপ খুবই কম। স্ত্রী অ্যানোফিলিস মশার কামড়ে ম্যালেরিয়া হয়। কিন্তু ঢাকায় এ রোগী কম।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য : এ প্রসঙ্গে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহানে ফেরদৌস বিনতে রহমান যুগান্তরকে বলেন-মশা নিয়ন্ত্রণে রুটিন কাজ চলমান রয়েছে। সব এলাকায় কাজের তদারকি করা হচ্ছে। কিউলেক্স পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু ভাইরাসের লাগাম টেনে ধরতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের কথা ভাবছে কর্তৃপক্ষ।

এ বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) উপপ্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. ইমদাদুল হক যুগান্তরকে বলেন-এখন কিউলেক্স মশার প্রজনন মৌসুম চলছে। এজন্য সর্বত্র কিউলেক্সের প্রকোপ দেখা যাচ্ছে। কিউলেক্স ও এডিস দুই ধরনের মশা নিয়ন্ত্রণে তৎপরতা চলমান রয়েছে। আশা করা যায় সপ্তাহের ব্যবধানে কিউলেক্স নিয়ন্ত্রণে আসবে। আর এডিস মশার নিয়ন্ত্রণে পরিকল্পিত কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।