উচ্চ আদালতে রায় ও আদেশ লেখায় বাংলা ভাষার ব্যবহার বাড়ছে। মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসার টানে বাংলায় রায় লিখছেন বিচারপতিরা। তবে এ পর্যন্ত কত রায় বা আদেশ বাংলায় লেখা হয়েছে, সেই তথ্য পাওয়া যায়নি। বাংলায় রায় ও আদেশ লিখেছেন এমন অধিকাংশ বিচারপতি এখন সুপ্রিমকোর্টে নেই। কেউ গেছেন অবসরে, আবার কেউ করেছেন পদত্যাগ। ফলে বাংলায় রায় লেখার ক্ষেত্রে যে আগ্রহ ও ধারাবাহিকতা-তাতে কিছুটা ব্যত্যয় ঘটেছে। একজন বিচারপতি বলেন, উচ্চ আদালতে বাংলায় রায় লেখার ক্ষেত্রে আগ্রহের ঘাটতি নেই। বিচারাঙ্গণে অস্থিরতার কারণে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলায় রায় লেখার দিকে নজর কমেছে বলে মনে করেন একজন আইনজীবী। ইংরেজিতে দেওয়া আদালতের রায়গুলো সহজে বাংলায় অনুবাদ করার জন্য ২০২১ সালে ‘আমার ভাষা’ নামে একটি সফটওয়্যার চালু করা হয়। এরপর ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ২০২৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিমকোর্টের ওয়েবসাইটের ‘বাংলা সংস্করণ’ উদ্বোধন করা হয়।
জানা যায়, দেশের সর্বত্র বাংলা ভাষা চালুর লক্ষ্যে প্রায় ৩৯ বছর আগে ১৯৮৭ সালের ৮ মার্চ প্রণয়ন করা হয় ‘বাংলা ভাষা প্রচলন আইন’। এতে বলা হয়, ‘এই আইন প্রবর্তনের পর বাংলাদেশের সর্বত্র তথা সরকারি অফিস-আদালত, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বিদেশের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যতীত অন্য সব ক্ষেত্রে নথি ও চিঠিপত্র, আইন-আদালতের সওয়াল-জবাব এবং অন্যান্য আইনানুগ কার্যাবলি অবশ্যই বাংলায় লিখতে হবে। বাংলা ভাষা প্রচলন আইনের ভাষ্যেই রয়েছে বাংলায় আদালতের রায় লেখার বিষয়টি। যা নিু আদালতে শুরু থেকে অনুসৃত হয়ে আসছে। তবে উচ্চ আদালতে বাংলা ভাষার ব্যবহার ও রায় লেখা নিয়ে বিচারকরা একমত।
খোঁজ নিয়ে আরও জানা যায়, হাইকোর্টের দুজন বিচারপতি নিয়মিত বাংলায় রায় বা আদেশ দিয়ে যাচ্ছেন। ২০১০ সালের এপ্রিলে হাইকোর্ট বিভাগে নিয়োগ পাওয়ার পর থেকে বিচারপতি শেখ মো. জাকির হোসেন নিয়মিত বাংলায় রায় ও আদেশ দিচ্ছেন। সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর মামলায় ২০১৬ সালের ৫ মে হাইকোর্টের তিন বিচারপতি রায় দেন। তাদের মধ্যে বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল বাংলায় রায় লেখেন। এরপর থেকে তিনি বাংলায় রায় ও আদেশ দিচ্ছেন।
শুক্রবার সুপ্রিমকোর্টের ওয়েবসাইটে দেখা যায়, আপিল বিভাগে ১১টি এবং হাইকোর্ট বিভাগে ২৪টি রায় ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছে। উচ্চ আদালতে বাংলায় রায়-আদেশের সংখ্যা বাড়ায় বিচারপ্রার্থীদের বিড়ম্বনা কমেছে বলে মনে করছেন বিচারসংশ্লিষ্টরা।
সুপ্রিমকোর্টের পাবলিক রিলেশন অফিসার মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, বিচারপ্রার্থীদের কথা চিন্তা করে ইংরেজির পাশাপাশি বাংলায় রায়-আদেশ দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে সুপ্রিমকোর্ট। এ জন্য একটি সফটওয়্যার চালু করা হয়েছে।
ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আরশাদুর রউফ শুক্রবার যুগান্তরকে বলেন, ইংরেজির পাশাপাশি বাংলায় রায়-আদেশ দিচ্ছেন কোনো কোনো বিচারপতি। তিনি বলেন, সুপ্রিমকোর্টে বিচারের সময় বিচারক ও আইনজীবীরা তাদের যুক্তি-তর্ক ও বিচারের মধ্যে বিভিন্ন দেশের উদাহরণ টানেন। এগুলোর সবই ইংরেজিতে। আইনজীবীরা এখান থেকে উদ্ধৃত করে আদালতকে বলেন, বিচারকরাও তখন সেভাবেই তাদের নোট নিয়ে থাকেন।
তিনি বলেন, রায় লেখার সময় শুনানির বিষয় বিচারক ইংরেজিতে তুলে ধরেন। তবে অনেক সময় অনুবাদ করে বিচারক তার রায়ে এসব রেফারেন্সের কথা উল্লেখ করেন। এখানে যথাযথ অনুবাদের বিষয় আছে। অনুবাদের পর অর্থ ভিন্ন রকমের হয়ে যায় কিনা সেটা নিয়ে একটা উদ্বেগ থাকে। অনেক সময় দেখা যায়, একটি ইংরেজি শব্দের দুই তিনটি বাংলা আছে। তখন একটা ভয় হয় যে, অনুবাদ করলে অর্থটা অন্য রকম হয়ে যেতে পারে। ফলে একটা সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। এসব কারণেই তারা তাদের রায়ে ইংরেজিটা রাখার চেষ্টা করেন। তবে এখন অনেকেই বাংলায় রায় দিচ্ছেন।
জানা গেছে, সব ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার প্রচলনের বিষয় এবং বেতার-টেলিভিশনে বাংলা ভাষার বিকৃত উচ্চারণ ও দূষণ রোধে হাইকোর্টের রুলসহ নির্দেশনা রয়েছে। দুটি নির্দেশনাই এসেছে ফেব্রুয়ারি তথা ভাষার মাসে। একটি ২০১২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি, অন্যটি ২০১৪ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি। একটির ক্ষেত্রে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে, অন্যটিতে রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলায় আদেশ দেন হাইকোর্টের দুটি বেঞ্চ। কিন্তু এর বাস্তবায়ন এখনো কার্যত হয়নি।
১৯৯৯ সালে উচ্চ আদালতের কয়েকজন বিচারক বাংলায় রায় লেখার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ২০০৭ সাল থেকে হাইকোর্ট বিভাগে দেওয়ানি, ফৌজদারি ও রিট মামলায় কয়েকটি রায় বাংলায় দেওয়া হয়। সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক ২০০৭ সাল থেকে ২০১১ সালে অবসরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত প্রায় ২০০ রায় বাংলা ভাষায় লেখেন বলে জানা যায়।
প্রয়াত বিচারপতি এ আর এম আমীরুল ইসলাম চৌধুরী নব্বইয়ের দশকে হাইকোর্টে বাংলায় আদেশ দেওয়া শুরু করেন। এরপর সাবেক বিচারপতিদের মধ্যে কাজী এবাদুল হক, হামিদুল হক, আবদুল কুদ্দুছ, সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক ও আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী বেশ কয়েকটি মামলায় বাংলায় রায় দেন।
গাজীপুরে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যা মামলায় বিচারপতি ওবায়দুল হাসান (প্রধান বিচারপতি) ও বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথের (অবসরপ্রাপ্ত) সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ২০১৬ সালের ১৫ জুন বাংলায় রায় দেন।
পিলখানায় বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) হত্যা মামলায় হাইকোর্ট বিভাগে থাকাকালে বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী (বর্তমানে আপিল বিভাগে) বাংলায় ১৬ হাজার ৫৫২ পৃষ্ঠার রায় লেখেন।
বিভিন্ন সময়ে হাইকোর্ট বিভাগের বেশ কয়েকজন বিচারপতি বাংলায় রায় ও আদেশ দিয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন বিচারপতি নাইমা হায়দার, বিচারপতি মো. রুহুল কুদ্দুস, বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার, বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম, বিচারপতি আবু তাহের মো. সাইফুর রহমান, বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী, বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমান, বিচারপতি মো. আতোয়ার রহমান, বিচারপতি মো. রিয়াজ উদ্দিন খান, বিচারপতি মো. জাকির হোসেন ও বিচারপতি মো. বশির উল্লাহ।
২০২২ সালে ভাষার মাসে বাংলায় রায় ও আদেশ দেওয়া শুরু করেন বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিমের হাইকোর্ট বেঞ্চ। ওই বছর ভাষার মাসে তিনি বিভিন্ন মামলায় এক হাজার ১৭৫টি রায় এবং ৬৩৭টি আদেশ বাংলায় দেন।
হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি শেখ মো. জাকির হোসেন যোগদানের পর নিয়মিত বাংলায় রায় ও আদেশ দিয়ে যাচ্ছেন। এ পর্যন্ত ৩০ হাজারের বেশি মামলার রায় ও আদেশ বাংলায় দিয়েছেন এ বিচারপতি। তিনি বলেন, ২০১০ সালের ২২ এপ্রিল থেকে বাংলায় রায়-আদেশ দিয়ে যাচ্ছি। আদালতে বাংলা ভাষার ব্যবহার আরও বাড়ানোর সুযোগ আছে বলে মনে করেন তিনি।