গত ১২ ফেব্রুয়ারি এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশের ওপর গণভোটও অনুষ্ঠিত হয়। ৬৮ শতাংশ ভোটার গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে সিল মেরেছেন। এতে করে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের ভিত্তিতে সংসদে ১০০ সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠনসহ জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন। জনগণ তাদেরকে দেশ পরিচালনায় ম্যান্ডেট দিয়েছেন। দলটির নির্বাচনী ইশতেহারে জাতীয় নির্বাচনে নিম্নকক্ষে প্রাপ্ত আসনের অনুপাতের ভিত্তিতে সংসদের উচ্চকক্ষ গঠনের কথা বলা হয়েছে।
আবার জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫-এ স্বাক্ষর করার আগেই বিএনপি উচ্চ কক্ষ গঠনের বিষয়সহ বেশ কয়েকটি বিষয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়ছিলো। সে কারণে, দলটির ভিন্নমতের বিষয়টি উল্লেখ করা হয় চূড়ান্ত জুলাই সনদে। সনদে বলা হয়, ‘কোন রাজনৈতিক দল বা জোট নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখ পূর্বক যদি জনগণের ম্যান্ডেট লাভ করে, তাহলে তারা সেই মতে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে।’
যেহেতু বিএনপি আগে থেকেই নিম্নকক্ষে নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতির ভিত্তিতে উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছে, সে কারণে তারা এখন ইশতেহার অনুযায়ী দলগুলোর প্রাপ্ত আসনের অনুপাতের ভিত্তিতে উচ্চ কক্ষ গঠন করতে চাইছে। অন্যদিকে জামায়াতসহ বেশ কিছু দল তাদের সুবিধাগত কারণে, প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতির ভিত্তিতে উচ্চকক্ষে আসন দাবি করছে। আবার উচ্চকক্ষ গঠন করবে সংবিধান সংস্কার পরিষদ। সেই সংস্কার পরিষদ গঠন ও সংস্কার পরিষদের শপথ গ্রহণের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এ কারণে সংসদে উচ্চক্ষ গঠন নিয়ে জটিলতা তৈরি হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর জুলাই জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরিত হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ–সভাপতি আলী রীয়াজসহ কমিশনের সদস্যরাও জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেন। আর বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ ২৫টি রাজনৈতিক দল ও জোট আনুষ্ঠানিকভাবে এতে স্বাক্ষর করে। জুলাই সনদ ৪৮টি প্রস্তাব রয়েছে। এসব প্রস্তাবের মধ্যে ৩০বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো ঐক্যমত্যে পৌঁছৈছে। বাকিগুলোতে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ (ভিন্নমত পোষণ) রেয়েছে। এই জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় তিনটি ধাপ নির্ধারিত আছে। প্রথম ধাপে আইনি ভিত্তি নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রপতি গত বছরের ১৩ নভেম্বর ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ জারি করেন।
সনদ বাস্তবায়নের গেজেটে বলা হয়েছে, গণভোট অনুষ্ঠানের পর, জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। পরিষদের প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ হতে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ এবং গণভোটের ফলাফল অনুসারে সংবিধান সংস্কারের কাজ শেষ করবে। সংবিধান সংস্কার হওয়ার ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে জাতীয় সংসদের নিম্ন কক্ষের নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে একটি উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে। এতে আরও বলা হয়েছে, নবনির্বাচিত প্রতিনিধিগণ সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণের পর একই শপথ অনুষ্ঠানে এই আদেশের তফসিল-১ অনুযায়ী পরিষদ সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন। সংসদ সদস্যদের যিনি শপথ পড়াবেন, তিনিই পরিষদ সদস্যদের শপথ পড়াবেন। অর্থাৎ আজ সংসদ সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠানে দুটি শপথ হওয়ার কথা। কিন্তু শুরুতেই সংবিধান সংস্কার পরিষদের এই শপথ গ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
গতকাল বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট সালাউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব হলো জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পরিচালনা করা। আগামীকাল (আজ) সকাল ১০টায় সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। সাংবিধানিকভাবে স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার অ্যাভেইলেবল না থাকলে বা অপারগ হলে বা তাঁদের মনোনীত প্রতিনিধি না থাকলে দ্বিতীয় বিকল্প হচ্ছে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পড়াবেন। সে হিসেবে আগামীকাল (আজ) সকাল ১০টায় জাতীয় সংসদে নির্বাচিত সদস্যদের শপথ হবে। এটা সিইসির সাংবিধানিক এখতিয়ার আছে। বিএনপির এই নেতা আরও বলেছেন, ‘এর বাইরে সংবিধান সংস্কার পরিষদ, এটা যদি কনস্টিটিউশনে (সংবিধান) ধারণ হয়, সেই মর্মে অ্যামেন্ডমেন্ট (সংশোধন) হয় এবং সেই শপথ পরিচালনার জন্য সংবিধানের তৃতীয় তফসিলে ফরম হয়, কে শপথ পাঠ করাবেন সেটা নির্ধারিত হয়—এতগুলো হয়–এর পরে তারপরে হলে হতে পারে।’
এ ব্যাপারে সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যেতির্ময় বড়ুয়া বলেছেন, ‘খুব বেআইনী ভাবে কিছু কাজ করা হয়েছে। আর দ্বিতীয় আরেকটি শপথের বিষয় জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে যুক্ত করা হয়েছে, যার কোন এখতিয়ারই নেই। তিনি বলেন, অন্তবর্তী সরকারের আমলে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ হিসেবে সবগুলো আইন প্রশ্নয়ন করেছেন। কিন্তু জুলাই সনদ স্বাক্ষরের পরে ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ’ নামে একটি আদেশ জারি করেছেন, যা এই আমলে একমাত্র আদেশ। এই আদেশে একটি শপথ যুক্ত করেছেন। কোন আদেশ দিয়ে এভাবে সংবিধানের বিধান পরিবর্তন করা যায় না। সংবিধানে রাষ্ট্রপতিকে এমন কোন আদেশ দিয়ে সংবিধানের মৌলিক পরিবর্তন হয়ে যায়, এমন কোন আদেশ দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। তিনি আরও বলেন, সংবিধান বাস্তবায়ন আদেশে তফসিল-১ বলে আরেকটি শপথ যুক্ত করেছেন। আলাদা একটি আদেশ দিয়ে এভাবে বিকল্প করা যায়? ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বলেন, সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদে তৃতীয় তফসিলে যে শপথের নমুন দেওয়া আছে, সে অনুযায়ী শপথ পাঠ করাবেন। কিন্তু এভাবে সংবিধানের মৌলিক পরিবর্তন করে এভাবে শপথ ঢুকাবেন? এভাবে দ্বিতীয় শপথের আদেশ, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের যে আদেশ, সেটাই তো অবৈধ।
এদিকে বিএনপি নিম্নকক্ষে প্রাপ্ত আসনের ভিত্তিতে উচ্চকক্ষ গঠনের কথা বলে আসছে। গত শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি চেয়ারপার্সন তারেক রহমান তার বক্তব্যে ‘নোট অব ডিসেন্টে’র কথা পুনর্বক্ত্য করেছেন। অন্যদিকে সংসদের আসনের অনুপাতে উচ্চকক্ষের আসন বণ্টনের চিন্তাকে নাকচ করেছে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ। তিনি বলেন, এই প্রশ্নই তো আসে না। জুলাই সনদে নানা বিষয়ে নানা দলের নোট অব ডিসেন্ট থাকার কারণেই তো গণভোট হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো যদি একমত থাকত, তাহলে তো গণভোটের প্রয়োজন হতো না। গণভোটে ৬৮ শতাংশ ভোট দিয়ে প্রথম আটটি সংস্কার প্রস্তাবে থাকা বিভিন্ন দলের নোট অব ডিসেন্টকে প্রত্যাখ্যান করেছে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফলাফলে দেখা গেছে, বিএনপি এককভাবে ২৯০ আসনে নির্বাচনে অংশ নিয়ে ৪৯.৯৭ শতাংশ, জামায়াত এককভাবে ২২৭ আসনে নির্বাচন করে ৩১.৭৬ শতাংশ ভোট পেয়েছে। তবে জোটবদ্ধ ভোটের হিসেবে বিএনপি ৫১ শতাংশের বেশি ও জামায়াত-এনসিপি জোট ৩৮ দশমিক ৫১ শতাংশ ভোট পেয়েছে। আবার আসন সংখ্যার হিসেবে বিএনপি জোট ২১২টি এবং জামায়াত- এনসিপি জোট জিতেছে ৭৭টি আসন। এখন আসন সংখ্যার হিসেবে যদি জাতীয় সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন করা হয়, তাহলে বিএনপি জোট ১০০টির মধ্যে ৭০টি, জামায়াতে ইসলামী অন্তত ২৬টি, এনসিপি ২টি আসন পেতে পারে। এর বিপরীতে ভোটের আনুপাতিক হারের বিবেচনায় উচ্চকক্ষ গঠন হলে বিএনপি জোটের আসন কমে হবে ৫২ থেকে ৫৩ টি, আর জামায়াত জোটের অন্তত ৩৮টি। জুলাই সনদে ভোটের আনুপাতিক হারে উচ্চকক্ষের আসন বণ্টন নিয়ে বলা হলেও এ নিয়ে আপত্তি ছিল বিএনপির। এর বিপরীতে বিএনপি তাদের ইশতেহারে বলেছে, তারা ক্ষমতায় গেলে উচ্চকক্ষ গঠন করবে আসন সংখ্যার ভিত্তিতে।
জানতে চাওয়া হলে জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশনের সদস্য ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, এখানে একটা অস্পষ্টতা রয়েছে বলে বিএনপি দাবি করতে পারে। জুলাই সনদে যে নোট অব ডিসেন্স রয়েছে, সেটা মাইনোরিটি ভিউ। এরপর যখন জণগণ এটা অনুমোদন করে, তখন তাদের জন্য এটা পালন করা একটা নৈতিক দায়িত্ব হয়ে যায়। তিনি বলেন, যেহেতু বিএনপি ৫০ শতাংশের উপর ভোট পেয়েছ, এখন তারা নিজেদের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন করতে পারবে। কিন্তু যেটা বিএনপির চিন্তা করার দরকার তারা তো আর চিরকাল কক্ষমতায় থাকবে না এবং এরপরে ভবিষ্যতে এই ৫০ শতাংশ ভোট পাওয়ার সম্ভাবনা খুব ক্ষীণ। যে কোন আইন সংবিধান পরিবর্তন করতে হলে যারাই ক্ষমতায় আছে তাদেরকে তো চিন্তা করা উচিত, যে তারা যখন ক্ষমতায় থাকবে না তখন কি হবে? অতীতের হিসাব থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রজ্ঞাপন সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, যেহেতু সংবিধান সংস্কারের জন্য নিম্ন কক্ষের ৩ ভাগের ২ ভাগ এবং উচ্চ কক্ষের মেজোরিটি বিএনপির আছে, তাই তারা চাইলে সংবিধান সংশোধন করতে পারবে। কিন্তু যদি ইনক্লুসিভ করতে হয়, শেখ হাসিনার আমলে যা ইচ্ছা তাই করেছে, বিরোধী দলের মতামত কিংবা অন্যদলের মতামত নিতো না, বিএনপিও যদি এটা করে তাহলে আমাদের পুরানো অবস্থায় বিরাজ করবে। আশা করি আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো সহনশীলতা, প্রজ্ঞা অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ এগুলো প্রদর্শন করবে।