সদ্য সমাপ্ত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নতুন মন্ত্রীদের বরণে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে সরকারের শীর্ষ প্রশাসনিক দফতর বাংলাদেশ সচিবালয়। নতুন সরকারের মন্ত্রীরা দায়িত্ব নিতে আসার আগেই সচিবালয়জুড়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক সংস্কার ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম। এ নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে দারুণ চাঞ্চল্য লক্ষ করা গেছে। সচিবালয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ঘুরে এসব দৃশ্য চোখে পড়েছে।
সচিবালয়জুড়ে সাজ সাজ রব
রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) সচিবালয় ঘুরে দেখা গেছে, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের জন্য নির্ধারিত কক্ষগুলো নতুন করে সাজানো হচ্ছে। গত চারদিনের ছুটি শেষে আজ অফিস খোলার পর থেকেই গণপূর্ত অধিদফতরের কর্মচারীরা ধোয়ামোছা, পুরোনো আসবাবপত্র ও লাইট-এসি পরিবর্তনের কাজে ব্যস্ত। বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের নামফলক সরিয়ে সেখানে নতুন মন্ত্রীদের নামফলক স্থাপনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। বারান্দা ও করিডোরে বসানো হচ্ছে নতুন ফুলের টব।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সচিবালয়ের অভ্যন্তরে গণপূর্ত বিভাগের প্রকৌশলী মো. সেলিম উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, নতুন মন্ত্রীদের রুমগুলো ঠিক করা, রুমের এসি, বাতিসহ আনুষঙ্গিক আসবাবপত্রগুলো ঠিক করা এবং মন্ত্রীদের নামফলক তৈরি করার কাজে ব্যস্ত রয়েছেন এই দফতরের সবাই। স্বাভাবিক নিয়মেই নতুন মন্ত্রীরা প্রথম দিনের জন্য সচিবালয়ের মেহমান আর পরবর্তীতে ৫ বছরের জন্য মন্ত্রণালয়গুলোর অভিভাবক। তাদের আন্তরিকতার সঙ্গে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্বাগত জানানোর ক্ষেত্রে যেন কোনও ত্রুটি না হয় সেদিকে নজর রাখা হচ্ছে।
শপথ অনুষ্ঠান: প্রথা ভেঙে এবার সংসদ ভবনে
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বিএনপি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আগামী ১৭ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার বিকাল চারটায় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠান আয়োজিত হবে। গতানুগতিকভাবে বঙ্গভবনে এই অনুষ্ঠান হওয়ার কথা থাকলেও এবারই প্রথম বিশেষ ব্যবস্থায় সংসদ এলাকায় এ আয়োজন করা হচ্ছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নতুন সচিব মোহাম্মদ সিরাজ উদ্দিন মিয়া এই শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করবেন এবং রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন নতুন প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের শপথ পাঠ করাবেন।
একটি দায়িত্বশীল সূত্র বাংলা ট্রিবিউনকে নিশ্চিত করেছে, বিএনপির উচ্চপর্যায়ের নেতাদের আগ্রহেই বঙ্গভবনের পরিবর্তে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় এই আয়োজন করছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। যে কারণে গতকাল বিকালেই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে বঙ্গভবন কর্তৃপক্ষকে মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠান আয়োজন করতে নিষেধ করা হয়েছে বলে বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছে সরকারের একটি দায়িত্বশীল সূত্র।
একই দিন মঙ্গলবার সকালে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন।
পদায়নের অপেক্ষা ও গুঞ্জন
কে কোন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাচ্ছেন, তা নিয়ে সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কৌতূহলের শেষ নেই। মন্ত্রীর নামের বানান কী হবে—এ নিয়েও আলাপ আলোচনা করতে দেখা গেছে।
এ প্রসঙ্গে বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, “নতুন মন্ত্রী মহোদয়ের জন্য অপেক্ষা করছি। কে হবেন এই মন্ত্রণালয়ের অভিভাবক তা এখনও আমরা জানি না। তবে যিনিই হোক আমরা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে তার নির্দেশেই কাজ করবো।”
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ সরকারি পরিবহন পুল ইতোমধ্যে নতুন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের জন্য ৫০টি গাড়ি ও চালক প্রস্তুত রেখেছে। প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে এই ৫০টি গাড়ির চালকদেরও। শপথের দিন কোন গাড়ি, কোন চালক, কোন মন্ত্রীকে আনতে যাবেন তা এখনও নির্ধারণ হয়নি। সেটি নির্ধারণ হবে মন্ত্রিসভায় কারা যুক্ত হচ্ছেন সেটি নিশ্চিত হওয়ার পর। এটি নিশ্চিত হওয়ার জন্য হয়তো মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে বলে জানিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সংশ্লিষ্টরা।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শপথ গ্রহণ শেষে বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) সকালে নতুন মন্ত্রীরা নিজ নিজ দফতরে আসবেন। সচিবরা তাদের ফুল দিয়ে বরণ করে নেবেন এবং এরপরই তারা কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরিচিতি ও কর্মপরিকল্পনা নিয়ে বৈঠকে বসবেন। এর পরপরই হয়তো মন্ত্রীরা অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলবেন, প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করবেন, আবার কেউ কেউ কর্মপরিকল্পনাও শেয়ার করবেন বলে জানা গেছে।
সচিবালয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থা
বাংলাদেশ সচিবালয়ের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত একজন পুলিশ কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, সব সময়ই পুরো সচিবালয় নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে রাখা হয়। বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) নতুন মন্ত্রীদের আগমনকে কেন্দ্র করে এবারও এর ব্যত্যয় হবে না। প্রচলিত নিয়মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্টিকার ছাড়া সচিবালয়ে কোনও গাড়ি প্রবেশের অনুমতি নেই। এদিন সচিবালয়ের ভেতরে এবং বাইরে যাতে কোনও যানজট সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিরাপত্তা শাখা থেকে এরই মধ্যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ফলে নতুন মন্ত্রীদের দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিন সচিবালয়ের পরিবেশ হবে অন্যান্য দিনের তুলনায় একেবারেই ভিন্ন।
কর্মচারীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া
দীর্ঘদিন পর রাজনৈতিক সরকার আসার খবরে সচিবালয়ে কর্মচারীদের মধ্যে বিভাজন ও বিবাদের খবরও পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে ‘সুবিধাবাদী’, ‘হাইব্রিড’ ও ‘ফ্যাসিবাদের দালাল’ তকমা নিয়ে জাতীয়তাবাদী চেতনায় বিশ্বাসী বিভিন্ন স্তরের কর্মচারীদের মধ্যে ছোটখাটো বাগবিতণ্ডা ও উত্তেজনা দেখা গেছে। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সচিবালয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
পুনর্গঠনের প্রস্তুতি
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের পর আগামী সপ্তাহেই একনেক, অর্থনৈতিক-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা, ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা, জাতীয় পুরস্কার-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা ও আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি পুনর্গঠন করা হবে। এছাড়া নতুন মন্ত্রীদের ব্যক্তিগত কর্মকর্তাদের (পিএস, এপিএস) নিয়োগ এবং সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতে দাফতরিক ফাইলগুলোও দ্রুত প্রস্তুত করা হচ্ছে।
সবকিছু ঠিক থাকলে ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে যাচ্ছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান, যার হাত ধরে দীর্ঘ সময় পর দেশে একটি নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করতে যাচ্ছে।