নতুন সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্যগণ বঙ্গভবনের দরবার হলে শপথ নেবেন। এটিই রীতি। মহামান্য প্রেসিডেন্ট বঙ্গভবনের দরবার হলে ভাবগম্ভীর পরিবেশে শপথ বাক্য পাঠ করান সব সময়। এমন একটি গৌরবময় মুহূর্তের জন্য অপেক্ষায় থাকেন নতুন মন্ত্রিপরিষদ সদস্যগণ। অপেক্ষায় থাকেন দেশের মানুষও। বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ সকল গণমাধ্যমে এ দৃশ্য সরাসরি প্রত্যক্ষ করেন। এটিই হয়ে আসছে বাংলাদেশ সৃষ্টির পর থেকে।
কিন্তু এর ব্যত্যয় ঘটিয়ে খোলা আকাশের নিচে, জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় মন্ত্রিপরিষদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের আয়োজন করেছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এতে নাকি জনসম্পৃক্ততা বাড়বে। ১ হাজার অতিথির উপস্থিতিতে পড়ানো হবে এই শপথ। সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মহামান্য প্রেসিডেন্ট মো: সাহাবুদ্দিন নতুন সরকারের শপথ বাক্য পাঠ করাবেন। বলাবাহুল্য, এ শপথ অনুষ্ঠানের প্রধান ফোকাসই হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণকারী তারেক রহমান। বিদায়ী কোনো সরকার প্রধান নয়।
গতকাল অন্তর্বর্তী সরকারের আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল নিজেই এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীসহ নতুন মন্ত্রিপরিষদ সদস্যদের শপথ জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত হবে। মঙ্গলবার সকাল ১০টায় নতুন সংসদ সদস্যদের শপথবাক্য পাঠ করাবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। একই দিনে প্রেসিডেন্ট মো: সাহাবুদ্দিন বিকাল ৪টায় মন্ত্রীদের শপথবাক্য পাঠ করাবেন।
প্রশ্ন হচ্ছে, এমন কী মাহাত্ম রয়েছে যে, রীতি ও ঐতিহ্যের ব্যত্যয় ঘটিয়ে মন্ত্রিপরিষদের শপথ উন্মুক্ত জায়গায় হতে হবে? ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি’ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ট দল হিসেবে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। গণতান্ত্রিক উত্তরণের মহান এই অগ্রযাত্রা কেন উন্মুক্ত প্রান্তর থেকে হবে? সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় নতুন সরকারের শপথ পাঠ করানোর মধ্যে মাজেজাটাই বা কী? সরকারের এই উদ্ভট চিন্তায় নাগরিক মনে নানা প্রশ্নের জন্ম নিয়েছে।
প্রশ্ন দেখা দিয়েছে এ কারণে যে, বঙ্গভবনে শপথ গ্রহণের একটি প্রতীকী মূল্য রয়েছে। বঙ্গভবনের দরবার হলে সব সময় ভাবগম্ভীর ও আড়ম্বরপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয় শপথ অনুষ্ঠানে। বিদেশি কূটনীতিক, দেশি-বিদেশি সম্মানিত অতিথি, সামরিক বাহিনীর পদস্থ কর্মকর্তা ও শ্রেণি-পেশার আমন্ত্রিত অতিথিগণ উপস্থিত থাকেন শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান। বাংলাদেশ সৃষ্টির পর থেকে বঙ্গভবনেই হয়ে আসছে এ অনুষ্ঠান। বঙ্গভবনে শপথ গ্রহণকে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও সম্মানজনক বলে মনে করেন শপথগ্রহকারীরা। কারণ এটি দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রাচার, রীতি ও ঐতিহ্য। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, বেগম খালেদা জিয়াসহ প্রায় সকল প্রধানমন্ত্রী-মন্ত্রিপরিষদ,প্রেসিডেন্টগণ শপথ গ্রহণ করেন বঙ্গভবনের মখমলের গালিচা আচ্ছাদিত দরবার হলে। ১৯৭১ সালের ১২ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমানও বঙ্গভবনে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। এমনকি ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারও বঙ্গভবনেই শপথ নিয়েছেন। এটি দেশের প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবন এবং কার্যালয়ই নয়। এটি শতাব্দীপ্রাচীন বর্ণাঢ্য ঐতিহ্যেরও ধারক-বাহক। ঢাকার দিলকুশা এলাকায় অবস্থিত এই প্রাসাদটি কেবল একটি ভবনই নয়। বরং বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও গৌরবের প্রতীক।
১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম’ প্রদেশের লেফটেন্যান্ট গভর্নরের বাসভবন হিসেবে এর যাত্রা শুরু ভবনটির। শুরুতে এটি ‘গভর্নমেন্ট হাউজ’ নামে পরিচিত ছিলো। ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর সময়কালে এর নাম বদলে ‘বঙ্গভবন’ রাখা হয়।
সুলতানি আমলে এই স্থানে সুফিসাধক হযরত শাহজালাল দখিনি (র.) বাস করতেন। তার মাজার এখনো এখানে অবস্থিত। ব্রিটিশ আমলে এটি এক আর্মেনীয় জমিদার ‘মানুক’র সম্পত্তি ছিল, যা পরে ঢাকার নবাব আব্দুল গনি কিনে ‘দিলকুশা উদ্যান’ নির্মাণ করেন। এটি ভিক্টোরীয় স্থাপত্যের সাথে মুঘল ও বাঙালি শৈলীর এক অনন্য সংমিশ্রণ। ১৯৬১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে ভবনটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে পরে আধুনিকায়ন ও পুনঃনির্মাণ করা হয়।
এখানে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসের মতো গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানগুলো উদযাপিত হয়। এছাড়া নবনিযুক্ত রাষ্ট্রদূতদের পরিচয়পত্র গ্রহণ এবং বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানদের আতিথেয়তার কেন্দ্র হিসেবে বঙ্গভবন ব্যবহৃত হয়। বঙ্গভবনের তোশাখানা জাদুঘরে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধানদের দেয়ার উপহার এবং ঐতিহাসিক আলোকচিত্র সংরক্ষণ করা হয়। নানামাত্রিক বিশেষত্বের কারণে বঙ্গভবনেই প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিপরিষদ, প্রধান বিচারপতিগণ শপথ নিয়ে আসছেন।
বিশ্বের উন্নতদেশগুলোতেও এ ধরনের মর্যাদাপূর্ণ ভবনে শপথ অনুষ্ঠিত হয়। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর শপথ অনুষ্ঠিত হয় বাকিংহাম প্যালেসে রাজা-রানীর সঙ্গে সাক্ষাতের মধ্য দিয়ে। প্যালেস থেকে ফেরার পর নতুন প্রধানমন্ত্রী তার সরকারি বাসভবন ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের সামনে দাঁড়িয়ে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। এটি একটি প্রথা।
অনুরূপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের শপথ অনুষ্ঠিত হয় ওয়াশিংটন ডিসি’র ইউএন ক্যাপিটলে। সর্বশেষ ডোনাল্ড ট্রাম্পের শপথ অনুষ্ঠিত হয় ক্যাপিটাল রোটুন্ডায়। তীব্র শীত ও হিমাঙ্কের নিচে তাপমাত্রা থাকায় ৪০ বছরের মধ্যে এ ব্যত্যয় ঘটিয়ে ক্যাপিটল রোটুন্ডায় ইনডোর শপথ হয়। উপমহাদেশের মধ্যে ভারতে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠিত হয় নয়াদিল্লির রাষ্ট্রপতি ভবনের ফোরকোর্টে। এটি একটি প্রথা। মর্যাদার সর্বোচ্চ স্থান। এ কারণেই বিশ্বের সভ্য দেশগুলোতে মর্যাদাপূর্ণ ভবনে শপথ অনুষ্ঠিত হয়।
কিন্তু কী ধরনের বিবেচনা থেকে এবার ব্যত্যয় ঘটিয়ে অবিসংবাদিত দলের নেতা তারেক রহমানকে উন্মুক্ত স্থানে শপথ দেয়া হচ্ছেÑ সেটি অনেকেরই বোধগম্য নয়। গত দেড় বছরে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস সম্পর্কে মানুষের এই ধারণা সৃষ্টি হয়েছে যে, তিনি প্রচারে বিশ্বাসী। লোক দেখানো আনুষ্ঠানিকতার এক ধরনের মোহ তার রয়েছে। এমন বেশ কয়েকটি ঘটনা বিগত দেড় বছরে উৎকটভাবে ধরা পড়েছে।
তিনি জাতীয় ঐকমত্যের নামে একটি সংলাপ চালিয়েছেন মাসের পর মাস। সেটি আবার লাইভ দেখিয়েছেন বিটিভিতে। নিজেকে ‘মেঠো’ ও ‘সাদাসিধে’ প্রমাণের এমন চেষ্টা সব সময়ই লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু ‘গণতন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দু’ হিসেব শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানকে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় টেনে নেয়ার মাঝে কী এমন ‘গণতন্ত্র’ এবং ‘জনসম্পৃক্তা’ নিহিত সেটির তেমন ব্যাখ্যা নেই। জন সম্পৃক্ততাই যদি উদ্দেশ্য হয, তাহলে ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন ‘ব্যতিক্রমী’ অন্তর্বর্তী সরকারের শপথ কেন বঙ্গভবনের বাইরে হলো না। সেক্ষেত্রে ‘ব্যত্যয়’ ঘটনানোর সুযোগ তিনি কেন হাতছাড়া করলেন? বরং তিনি জাতীয় জুলাই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানকেও তিনি সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় টেনে নিয়ে সম্মানিত অতিথিদের বৃষ্টিতে ভেজানো, কাঁদা-পানিতে মাখামাখি, সম্মানিত অতিথিদের চেয়ার না পাওয়া, বিদ্যুৎ বিভ্রাট, সাউন্ড সিস্টেমের যান্ত্রিক ত্রুটি, সর্বোপরি ওই এলাকায় যানজন সৃষ্টির ঘটনা ওই অনুষ্ঠানে অংশ নেয়ার বিষয়টি অনেকেরই মনে রয়েছে। তদুপরি সেটি কোনো রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান ছিলো না। ছিলো ড. মুহাম্মদ ইউনূসের খেয়াল-খুশির বিষয়। পক্ষান্তরে, নতুন সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান একটি রাষ্ট্রীয় অনুুষ্ঠান। চিরাচরিত এই প্রথা কেন তারেক রহমানের মতো বিপুল বিজয়ী গণমানুষের নেতাকে দিয়েই ভাঙতে হবে? এ প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই।