রাজনীতিতে বিরল নজির গড়লেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ভূমিধস বিজয়ের পর নিজেই ছুটে গেলেন প্রতিদ্বন্দ্বী দলের প্রধানদের বাসায়। সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান ও এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের সঙ্গে। দেশের রাজনীতিতে এমন ঘটনা এর আগে ঘটেনি। ’২৪ পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতিতে এটি পরিবর্তনের বড় এক ইঙ্গিত বলে মনে করা হচ্ছে।
গতকাল সন্ধ্যায় প্রথমে রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমানের বাসায় যান বিএনপি চেয়ারম্যান। এসময় ডা. শফিকুর রহমান বিএনপি’র চেয়ারম্যানকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। ঘণ্টাখানেক অবস্থানের পর জামায়াতের আমীরের বাসভবন থেকে বের হন তারেক রহমান। সেখান থেকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের বাসায় যান তারেক রহমান। রাত সাড়ে আটটার দিকে রাজধানীর বেইলি রোডে নাহিদের বাসায় পৌঁছান। এ সময় বিএনপি’র চেয়ারম্যানকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান নাহিদ ইসলাম। ঘণ্টাখানেক অবস্থানের পর নাহিদের বাসভবন ত্যাগ করেন বিএনপি’র চেয়ারম্যান।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বড় জয় পেয়েছে বিএনপি। এ নির্বাচনে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসনে জয় পায় বিএনপি’র একসময়ের জোটসঙ্গী জামায়াতে ইসলামী। জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়ে এনসিপি ৬টি আসনে জয় পায়। মূলত সৌজন্য সাক্ষাৎ করতেই জামায়াতের আমীর ও এনসিপি’র আহ্বায়কের বাসায় যান বিএনপি’র চেয়ারম্যান। সেখানে কুশলাদি বিনিময় ছাড়াও সমসাময়িক বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে পারে বলে দলগুলোর নেতারা জানিয়েছেন।
ওদিকে জামায়াত আমীর এবং এনসিপি’র আহ্বায়কের বাসায় প্রবেশের সময় ছোট শিশুরা তারেক রহমানকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। তারেক রহমানও তাদের সঙ্গে হাসিমুখে কুশলাদি বিনিময় করেন।
তারেক রহমানের সঙ্গে ছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, যুগ্ম মহাসচিব হাবিব- উন-নবী খান সোহেল, চেয়ারম্যানের প্রেস সচিব সালেহ শিবলী। ওদিকে জামায়াত আমীরের সঙ্গে ছিলেন দলের নায়েবে আমীর সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, মিডিয়া ও প্রচার বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জোবায়ের। ওদিকে নাহিদের সঙ্গে ছিলেন এনসিপি’র সদস্য সচিব আখতার হোসেন, উত্তরাঞ্চলীয় মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানকে জামায়াত আমীরের অগ্রিম অভিনন্দন: ওদিকে বিএনপি চেয়ারম্যানের সাক্ষাতের পর জামায়াত আমীর নিজেই ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন। সেখানে তিনি লেখেন, জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)’র চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অগ্রিম অভিনন্দন জানাচ্ছি। তিনি আজ আমার আবাসিক কার্যালয়ে এসেছিলেন। তার এই আগমন আমাদের জাতীয় রাজনীতির জন্য এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। আমি তার এই আগমনকে স্বাগত জানাই এবং প্রত্যাশা রাখি, সংলাপ ও দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে এটি রাজনৈতিক পরিপক্বতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে।
আমি এমন এক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখি যা হবে ফ্যাসিবাদমুক্ত, সার্বভৌম এবং ইনসাফ ও ন্যায়বিচারের ওপর প্রতিষ্ঠিত। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ১১ দলীয় জোটের সঙ্গে মিলে একটি সমৃদ্ধ, স্থিতিশীল ও আধুনিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং সাংবিধানিক শাসনের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হবে। আমাদের আলোচনায় তিনি আশ্বস্ত করেছেন যে, নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা এবং বিরোধী দলের কর্মী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর যেকোনো হামলা রোধে তিনি কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন। আমি এই আশ্বাসকে সাধুবাদ জানাই। আমাদের প্রত্যাশা, কোনো নাগরিকই যেন ভয়ভীতি বা নিরাপত্তাহীনতার শিকার না হয়।
ডা. শফিকুর রহমান লেখেন, জাতীয় স্বার্থের বিষয়ে আমরা নির্বাচিত সরকারকে পূর্ণ সহযোগিতা প্রদান করবো, তবে একটি আদর্শিক বিরোধী দল হিসেবে আমাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে আমরা আপসহীন থাকবো। সরকারের জনকল্যাণমূলক কাজে আমাদের সমর্থন থাকবে, কিন্তু যেখানেই জবাবদিহিতার প্রয়োজন হবে, সেখানে আমরা সোচ্চার থাকবো। আমাদের উদ্দেশ্য সংঘাত নয় বরং সংশোধন; বাধা দেয়া নয় বরং পর্যবেক্ষণ। দেশের মানুষ এমন একটি সংসদ প্রত্যাশা করে, যা ন্যায়বিচার ও নাগরিক অধিকার রক্ষা করবে এবং স্থিতিশীলতার সঙ্গে রাষ্ট্রকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
এদিকে তারেক রহমানের সঙ্গে জামায়াত আমীরের সৌজন্য সাক্ষাতের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় দলটির নায়েবে আমীর ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের বলেন, আমরা সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাকে স্বাগত জানাই। তিনি বলেন, আমাদের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। আমরা দেশের কল্যাণমূলক কাজে সরকারকে সহযোগিতা করবো। তবে দেশের স্বার্থবিরোধী কিছু দেখলে প্রতিবাদ করবো। তিনি বলেন, আমরা দুই দলই ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন করেছি। এখন হয়তো বিরোধী দলে আছি। তবে আমাদের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক অব্যাহত থাকবে। কোনো বিষয়ে ব্যতিক্রম হলে আমরা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করবো বলে একমত হয়েছি। এক প্রশ্নের জবাবে আবদুল্লাহ তাহের বলেন, আমরা জাতীয় সরকারের অংশ নেয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেইনি। আমরা শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে সংসদে ভূমিকা রাখতে চাই।
দেশের প্রশ্নে আমরা একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নেবো
এদিকে নাহিদ ইসলামের সঙ্গে তারেক রহমানের সাক্ষাতের বিষয়ে দলটির সদস্য সচিব আখতার হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, তারেক রহমানের রাজনৈতিক সৌজন্যতাকে স্বাগত জানাই। রাজনৈতিক মতবিরোধ সত্ত্বেও আমরা কীভাবে একত্রে দেশের জন্য কাজ করতে পারি সেগুলো নিয়ে আমরা কথা বলেছি। বাংলাদেশের সংস্কারের যে প্রশ্ন তা কীভাবে সুরাহা করা যায় এবং বিচারের যে প্রশ্ন সেই বিষয়গুলো নিয়ে আমরা কথা বলেছি। নাহিদ ইসলামের সঙ্গে তারেক রহমানের সৌজন্যমূলক সাক্ষাৎ বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তনের আভাস দেয়। আমরা মনে প্রাণে চাই- এই বাংলাদেশ রাষ্ট্রে আমাদের রাজনৈতিক মতবিরোধ থাকবে। কিন্তু দেশের প্রশ্নে বাংলাদেশের সকল রাজনৈতিক দল একসঙ্গে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারবো সে ধরনের পরিবেশ অটুট থাকবে সেটাই আমাদের প্রত্যাশা। তিনি আরও বলেন, নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতার বিষয়গুলো তারেক রহমানকে জানিয়েছি। তাদের দলের তরফ থেকে সে বিষয়গুলোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
তিনি আরও জানান, তারেক রহমানকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানানোর পাশাপাশি এনসিপি’র প্রতীক শাপলা কলি ও শহীদের হাতের লেখা চিঠি উপহার হিসেবে দিয়েছেন নাহিদ ইসলাম।