Image description

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট শেষ হয়েছে। রাষ্ট্র সংস্কারের প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের পথ উন্মুক্ত করে বিপুল ব্যবধানে জিতেছে ‘হ্যাঁ’ ভোট। বৃহস্পতিবার নির্বাচনের সঙ্গে একইদিন জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে গণভোটও অনুষ্ঠিত হয়। একদিন পর গণভোটের বেসরকারি ফলাফল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। এখন প্রশ্ন, গণভোটে হ্যাঁ জিতলো, এরপর কী হবে? কী পরিবর্তন হবে?

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখের কিছু বেশি। দেশ জুড়ে অনুষ্ঠিত এই গণভোটে মোট প্রদত্ত ভোটের হার ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ। গণভোটের বেসরকারি ফলাফল ঘোষণা করে ইসি সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানান, গণভোটে পরিবর্তনের পক্ষে অর্থাৎ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯ জন ভোটার। বিপক্ষে অর্থাৎ ‘না’ ভোট দিয়েছেন ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭ জন। নির্বাচনের একদিন পর শুক্রবার রাতে নির্বাচন কমিশনের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ একইসঙ্গে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের গেজেট জারি করেন।

জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫-এ বলা আছে, গণভোটে উপস্থাপিত প্রশ্নের উত্তরে প্রদত্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে ইতিবাচক (হ্যাঁ সূচক) হলে- এই আদেশ জারির অব্যবহিত পর অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিগণের সমন্বয়ে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে, যা সংবিধান সংস্কার বিষয়ে সাংগঠনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে। উক্ত নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ একইসঙ্গে জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে এবং এই আদেশ অনুসারে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। পরিষদের প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ হতে ২৭০ দিনের মধ্যে জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে এই আদেশের তফসিল-১ এ বর্ণিত জুলাই জাতীয় সনদ অনুসারে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন করবে এবং তা সম্পন্ন করার পর পরিষদের কার্যক্রম সমাপ্ত হবে।

দুদক সংস্কার কমিশনের প্রধান ও ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ড. ইফতেখারুজ্জামান মানবজমিনকে বলেন, দেশের সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমি মনে করি, যে সনদের গণভোটে রায় হয়েছে, সেই সনদ অনুযায়ী যে অঙ্গীকারগুলো আছে সেগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। এর মধ্যে তো একাধিক বিষয় আছে। একটা হচ্ছে সংবিধান সংস্কারের বিষয়। সেগুলোকে কেন্দ্র করে যে অঙ্গীকারগুলো আছে, যেগুলোতে শতভাগ মানে ঐকমত্য ছিল না, মেজরিটি ডিসিশন ছিল, সেগুলোর ক্ষেত্রে কোনো দ্বিমত নেই, এ সংস্কারগুলো হবে।

তিনি বলেন, জনপ্রতিনিধিদলগুলো তাদের পক্ষ থেকে যেগুলো নোট অব ডিসেন্ট নেই, ঐকমত্য আছে, সেগুলো অতিদ্রুত সংস্কার সম্পন্ন করবে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে। পাশাপাশি যে বিষয়গুলো নোট অব ডিসেন্ট আছে, সেগুলো নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে, পর্যালোচনা করে সমঝোতায় আসার চেষ্টা করবে। এর বাইরে যদি আরও কিছু আসে আমি যখন বলি সংবিধান সংস্কার ছাড়াও বাইরে কিন্তু বিশাল প্রশাসনিক সংস্কারের প্রস্তাবগুলো আছে। সেগুলো বাস্তবায়ন করা বর্তমান সরকার এবং নতুন সরকারের অন্যতম দায়িত্ব বলে আমি মনে করি।
‘হ্যাঁ’- জেতায় কি পরিবর্তন আসছে?

সংস্কার কমিশনের রিপোর্ট, দফায় দফায় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠকের পর জুলাই সনদে মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে ৪৭টি প্রস্তাবনা সাংবিধানিক এবং ৩৭টি সাধারণ আইন বা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করার কথা রয়েছে। গণভোটের ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব থাকলেও এর মধ্যে কিছু কিছু বিষয়ে রাজনৈতিক দলের নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে। প্রথমে প্রস্তাবনা ছিল যে সব প্রশ্নে যে রাজনৈতিক দলের নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে সেই দল ক্ষমতায় গেলে ওই প্রস্তাবনাগুলো বাস্তবায়ন করতে বাধ্য থাকবে না। পরে এনিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে গণভোটের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।

তিন ধাপে সংবিধান সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়ন করা হবে। প্রথমত, আইনি ভিত্তি দিতে আদেশ জারি; দ্বিতীয়ত, বাস্তবায়নের জন্য গণভোট এবং সর্বশেষ গণভটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়া এবং তৎপরবর্তী কাজ।
জুলাই সনদ অনুযায়ী, জরুরি অবস্থা জারি করতে হলে মন্ত্রিসভার অনুমোদন লাগবে। সেই সভায় বিরোধী দলীয় নেতা/উপনেতাও উপস্থিত থাকতে হবে। অন্যদিকে জরুরি অবস্থার সময় সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মৌলিক অধিকারসমূহ খর্ব করা যাবে না। যদিও প্রচলিত নিয়মে জরুরি অবস্থা জারি হয় প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষরে। আবার বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয় সংসদ সদস্যদের ভোটে। এই ভোট দিতে হয় প্রকাশ্যে। নতুন নিয়মে গোপন ব্যালটে উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হবেন রাষ্ট্রপতি।

সংবিধানে বর্তমানে ২০টির বেশি মৌলিক অধিকারের কথা বলা হলেও জুলাই সনদে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট ও ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষার বিষয়টি যুক্ত করা হয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষতার বিষয়ে জুলাই সনদে সকল সমপ্রদায়ের সহাবস্থান ও যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করা হবে বলে বলা হয়েছে। ৪৭টি সাংবিধানিক সংস্কারের বাইরে আর যে ৩৭টি সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে জুলাই সনদে সেগুলো সংশোধন করা যাবে আইন/অধ্যাদেশ, বিধি ও নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে।