আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগমুহূর্তে পরিচালিত আইআইএলডির জরিপে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া গেছে। এতে ৪৪ দশমিক ১০ শতাংশ ভোটার বিএনপিকে এবং ৪৩ দশমিক ৯০ শতাংশ ভোটার জামায়াত জোটকে ভোট দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
তবে সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীদের সংগঠন ‘ন্যাশনালিস্ট রিসার্চ সেল’ নামের একটি সংগঠনের করা জরিপে বলা হয়েছে, এবারের নির্বাচনে বিএনপি ৭৭ শতাংশ ভোট পাবে। ওই জরিপের তথ্য বলছে, বিএনপি ২২০টি আসন পেতে পারে। আর জামায়াত পাবে ৫৭টি আসন।
জাগরণ ফাউন্ডেশন ও প্রজেকশন বিডির সহযোগিতায় গত ২১ জানুয়ারি থেকে ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ে সারাদেশের ৩০০ আসনের ভোটারদের ওপর ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল অ্যান্ড ডিপ্লোমেসি (আইআইএলডি) এ জরিপ চালিয়েছে। জরিপে মোট ৬৩ হাজার ৬১৫ জনের মতামত নেওয়া হয়েছে। প্রচার শুরুর পর থেকে ১৬ দিনে পরিচালিত এ জরিপের ফলাফলে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
সোমবার দুপুরে রাজধানীর পল্টনের একটি রেস্তোরাঁয় আয়োজিত অনুষ্ঠানে জরিপের ফলাফল তুলে ধরা হয়। ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬ : প্রাক-নির্বাচনী জনমত জরিপ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে জরিপের ফলাফলের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন আইআইএলডির নির্বাহী পরিচালক শফিউল আলম শাহীন।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এটি ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল অ্যান্ড ডিপ্লোমেসির (আইআইএলডি) চূড়ান্ত নির্বাচনী জরিপ। এর আগে প্রথম দফায় গত ১২ জানুয়ারি তারা জরিপের ফল প্রকাশ করেছিল।
আইআইএলডির নির্বাহী পরিচালক শফিউল আলম শাহীন বলেন, জরিপে ৩০০ আসনের প্রতিটি থেকে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রতিটি আসন থেকে সর্বনি¤œ ১০০ থেকে সর্বোচ্চ ৩০০ জনের মতামত নেওয়া হয়েছে। সারাদেশ থেকে মোট ৬৩ হাজার ৬১৫ জনের মতামত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৫৭ দশমিক ৫৯ শতাংশ এবং নারী ভোটার ৪২ দশমিক ৪১ শতাংশ।
তিনি জানান, বয়স, শিক্ষা, ধর্ম ও বিভাগীয় পর্যায়ে পৃথক জরিপ করা হয়েছে। স্যাম্পলের জন্য ইউনিয়ন নির্বাচন করতে লটারির মাধ্যমে ভোটার খুঁজে জরিপে অংশগ্রহণ করানো হয়েছে।
কোন্ দলের পক্ষে কত শতাংশ ভোট ॥ জরিপের তথ্য বলছে, নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত জোটকে ৪৪ দশমিক ১০ শতাংশ মানুষ ভোট দিতে চান। জামায়াতের সমর্থিত জোট ৪৩ দশমিক ৯০ শতাংশ মানুষ ভোট দেবেন বলে জানিয়েছেন। এছাড়া জাতীয় পার্টিতে ১ দশমিক ৭০ শতাংশ এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ৩ দশমিক ৮০ শতাংশ মানুষ ভোট দিতে চান। আর ৬ দশমিক ৫০ শতাংশ মানুষ ভোট দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেননি। আগে রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা থাকায় বিএনপিকে ভোট দিতে চান ভোটাররা এবং জামায়াত তুলনামূলকভাবে সৎ ও কম দুর্নীতিগ্রস্ত হওয়ায় ভোটাররা ভোট দিতে চান।
শহরে বেশি ভোট পাবে বিএনপি, গ্রামে জামায়াত ॥ দেশের শহরাঞ্চলের মানুষদের মধ্যে ৪৬ শতাংশ বিএনপি সমর্থিত জোটে ভোট দিতে চান এবং জামায়াতকে ৪২ শতাংশ মানুষ ভোট দিতে চান। শহরের ৬ শতাংশ মানুষ ভোট দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়নি। গ্রামাঞ্চলের মানুষদের মধ্যে ৪৩ শতাংশ বিএনপি সমর্থিত জোটে ভোট দিতে চান এবং জামায়াত সমর্থিত জোটে ভোট দিতে চান ৪৫ শতাংশ মানুষ। এখানেও ৬ শতাংশ মানুষ সিদ্ধান্ত জানাননি।
আসন বিবেচনায় জামায়াত সমর্থিত জোটে ১০৫টি এবং বিএনপির সমর্থিত জোটের ১০১টি নিশ্চিতভাবে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে উঠে এসেছে জরিপে। ৭৫টি আসনে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস দেওয়া হয়েছে। আর ১৯টি আসনে স্বতন্ত্র ও অন্যান্য দল থেকে বিজয়ী হতে পারে।
দ্রব্যমূল্য কমানোতে গুরুত্ব ভোটারদের ॥ জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এবার নির্বাচনে ৯২ দশমিক ৯০ শতাংশ মানুষ ভোট দেবেন বলে জানিয়েছেন। ৪ দশমিক ৪০ শতাংশ মানুষ ভোট দেবেন না। এছাড়া ২ দশমিক ৭০ শতাংশ মানুষ তাদের সিদ্ধান্ত জানাননি।
নির্বাচনপরবর্তী সরকারের কাছে ভোটাররা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে চায় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দ্রব্যমূল্য কমিয়ে আনতে ৬৭ শতাংশ ভোটার মতামত দিয়েছেন। এর বাইরে আইনের সুশাসন ফেরানো, দুর্নীতির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান, চাকরির নিশ্চয়তা ও সংস্কারসহ অনেক বিষয়ে ভোটাররা অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
ভোট দিতে প্রার্থীর যোগ্যতায় আগ্রহ বেশি ॥ ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রার্থীর যোগ্যতা বিবেচনায় নেওয়ার প্রতি জোর দিয়েছেন বেশিরভাগ ভোটার। যোগ্যতা বিবেচনায় দেবেন বলেন জানিয়েছেন ৭১ শতাংশ ভোটার। আর দলের সিদ্ধান্তে মনোনীত প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার পক্ষে ৪৭ শতাংশ ভোটার। এছাড়া দলের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় ভোট দিতে চান ৩৬ শতাংশ মানুষ। এছাড়া উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি, অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব ও জুলাই চেতনাসহ কিছু বিষয় বিবেচনায় নিয়ে ভোট দিতে চান ভোটাররা।
ন্যাশনালিস্ট রিসার্চ সেলের জরিপ রিপোর্ট ॥ এবারের নির্বাচনে বিএনপি ৭৭ শতাংশ ভোট পাবে বলে এক জরিপে উঠে এসেছে। ওই জরিপের তথ্য বলছে, বিএনপি ২২০টি আসন পেতে পারে। আর জামায়াত পাবে ৫৭টি আসন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীদের সংগঠন ‘ন্যাশনালিস্ট রিসার্চ সেল’ নামের একটি সংগঠন এই জরিপ পরিচালনা করেছে।
সোমবার সকালে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে এক অনুষ্ঠানে সংগঠনটির পক্ষে এই জরিপের এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনটির সহ-সভাপতি আব্দুর রহিম তুহিন। ড. গাজী মিজানুর রহমানসহ সংগঠনের অন্যান্য নেতারাও এ সময় উপস্থিত ছিলেন। এই জরিপ কাজে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ সাবেক ছাত্র ও ৫ জন পিএইচডি ডিগ্রীধারী গবেষক অংশ নেন। জরিপে অংশ নেওয়া ৩০০ জনকে ৪টি করে প্রশ্ন করা হয়।
সংগঠনটি বলছে, ‘এই জরিপে ৩০০ জনকে প্রশ্ন করা হয়েছিল। এর মধ্যে ৭৭ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, তারা বিএনপিকে সমর্থন করেন। ১৬ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, তারা জামায়াতে ইসলামীকে সমর্থন করেন। এছাড়া এনসিপিকে ৩ শতাংশ, জাতীয় পার্টিকে ২ শতাংশ, অন্যান্য দলকে ১ শতাংশ উত্তরদাতা সমর্থন করেছে। মন্তব্য করেননি ১ শতাংশ উত্তরদাতা।’
জরিপের তথ্য তুলে ধরে সংগঠনটি জানায়, গণভোটে সংস্কারে কাকে ভোট দেবেন এমন প্রশ্নে ৪৯ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, এখনো তারা এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেননি। ৩০ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, তারা হ্যাঁ এর পক্ষে ভোট দেবেন। ২১ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন তারা না এর পক্ষে ভোট দেবেন। ৯৯ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, তাদের আসনের নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে তারা সন্তুষ্ট।’
সংগঠনটি বলছে, ‘কোন দল কতটি আসন পাবে, এমন প্রশ্নের জবাবে যে তথ্য এসেছে, তাতে বিএনপি ২২০টি আসন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ৫৭টি আসন, এনসিপি ২টি, জাতীয় পার্টি ৫টি, স্বতন্ত্র ১২টি অন্যান্য দল ৪টি আসন পাবে।’