একের পর এক সিদ্ধান্ত। আবার পরিবর্তন। প্রশ্ন উঠেছে নানা মহলে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর নানা আবদার মেটাতে সিদ্ধান্তে বারবার পরিবর্তন আনতে হচ্ছে সাংবিধানিক এই সংস্থাটিকে।
আবার কেউ কেউ বলছেন, নির্বাচন পরিচালনায় যে সক্ষমতা দেখানো দরকার সেখানেও ব্যর্থ হচ্ছে এ এম এম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বে থাকা কমিশন। রোববার রাতে শুধুমাত্র তিন ধরনের ব্যক্তি ছাড়া ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজের ভেতর কেউ মোবাইলফোন নিয়ে আসতে পারবেন না- এমনই এক সিদ্ধান্তের কথা জানায় ইসি। রাত পেরিয়ে সকাল হতেই তোলপাড় শুরু হয় সর্বত্র। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রশ্ন ওঠে। ভোটের দিন সাংবাদিকদের মোবাইল ব্যবহার বিষয়ে একই সিদ্ধান্ত হওয়ায় বিতর্ক আরও জোরদার হয়।
এ নিয়ে সকালেই ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ), রিপোর্টার্স ফোরাম ফর ইলেকশন অ্যান্ড ডেমোক্রেসি (আরএফইডি), রিপোর্টার্স অ্যাগেইনস্ট করাপশনসহ (র্যাক) একাধিক সংগঠন তীব্র প্রতিবাদ জানায়। পরে দুপুরে আরএফইডি’র নেতৃত্ব ইসি’র সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদের সঙ্গে বৈঠকে বসে।
এ সময় তিনি সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের মোবাইল ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের ব্যাপারে আশ্বস্ত করেন। বিকালে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ সাংবাদিকদের আলাপকালে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার বিষয়ে নিশ্চিত করেন। তবে এমন বিতর্কের অবসান হতে না হতেই নির্বাচন কমিশনে ভোটকেন্দ্রে সবাই যেন মোবাইলফোন নিয়ে যেতে পারেন সেই দাবি নিয়ে হাজির হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি (ভিপি) সাদিক কায়েম। এ ছাড়া একই দাবিতে সিইসি’র সঙ্গে দেখা করেন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। তার সঙ্গে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতারাও উপস্থিত ছিলেন। সিইসি’র সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে আসিফ মাহমুদ বলেন, ইসি’র সিদ্ধান্ত নিয়ে সারপ্রাইজ হচ্ছি। একটি দলকে সুবিধা দিতে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করছে ইসি।
বিকালে সাংবাদিক, রাতে সবার জন্য উন্মুক্তের সিদ্ধান্ত: বিকালে নির্বাচন কমিশনার সানাউল্লাহ গণমাধ্যম ও পর্যবেক্ষকদের ভোটকেন্দ্রে মোবাইলফোন নেয়ার বিষয়টি শিথিল করার কথা জানালেও রাতে সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছেন সবাই মোবাইল নিতে পারবেন। তবে গোপন কক্ষের ছবি তোলায় বারণ করেছেন ইসি সচিব।
আখতার আহমেদ বলেন, ভোটার, প্রার্থী, তাদের এজেন্ট, সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকরা মোবাইলফোন সঙ্গে নিয়ে ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারবেন। তবে গোপন কক্ষে, যেখানে ব্যালটে সিল দেয়া হয়, সেখানে কোনো ছবি তোলা যাবে না। তিনি বলেন, ‘ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজের মধ্যে মোবাইল ব্যবহারে যে সীমাবদ্ধতার কথা বলা হয়েছিল, সেটি নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল। বিষয়টি পরিষ্কার করতেই পরিপত্র সংশোধন করা হচ্ছে। ইসি সচিব জানান, কিছু ক্ষেত্রে মোবাইল ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা থাকবে। পোলিং অফিসার, সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার, প্রিজাইডিং অফিসার এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের কাছে মোবাইল রাখা যাবে না। এ বিষয়টি ‘ফিল্টার’ করে চূড়ান্ত নির্দেশনা দেয়া হবে। তিনি বলেন, ‘ভোটার ও সংবাদকর্মীদের মূল প্রশ্ন ছিল- তারা মোবাইল নিয়ে কেন্দ্রে ঢুকতে পারবেন কিনা। এ বিষয়ে কমিশনের অবস্থান স্পষ্ট, তারা মোবাইল নিয়ে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারবেন, তবে গোপন কক্ষে ছবি তোলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
বিতর্কের কেন্দ্রে বিএনসিসি মোতায়েন: ভোটকেন্দ্রে শৃঙ্খলা রক্ষা এবং বয়স্ক ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ভোটারদের সহায়তার জন্য শুরুতে বিএনসিসি ক্যাডেটদের নিয়োগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ইসি। এ জন্য স্বরাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দেয়া হয়েছিল। বিএনপি’র পক্ষ থেকে এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে বলা হয়, ভোটকেন্দ্রে এমন একটি সংগঠনের উপস্থিতি জনমনে বিভ্রান্তি ও বিতর্কের সৃষ্টি করতে পারে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দীনের সঙ্গে দেখা করে বিএনপি নেতারা তাদের আপত্তি জানিয়ে আসেন। এর দুই দিনের মধ্যে বিএনসিসি নিয়ে ইসি তাদের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিএনসিসি সদস্যরা কেবল পোস্টাল ব্যালট গণনার কেন্দ্রে নিয়োজিত থাকবেন।
পোস্টাল ব্যালটের নকশা জটিলতা:
প্রবাসী ভোটারদের জন্য শুরুতে বর্ণানুক্রমিক প্রতীকের অবস্থান ঠিক করে ডাকযোগে ভোটের ব্যালট পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু বিএনপি অভিযোগ তোলে, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে পোস্টাল ব্যালটের নকশা হয়েছে। এতে তাদের দলীয় প্রতীক ‘ধানের শীষ’ ব্যালট পেপারের অনেক নিচে ভাঁজের মধ্যে চলে গেছে। অথচ প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত ও তাদের জোটসঙ্গী এনসিপি’র প্রতীক স্থান পেয়েছে সবার উপরে। এ নিয়ে কয়েক দফা বৈঠকের পর ইসি পোস্টাল ব্যালটের নকশায় পরিবর্তন আনে।
রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন নিয়ে প্রশ্ন: রাজনৈতিক দলগুলোর নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও ইসি তার অবস্থানে অটল থাকতে পারেনি। শুরুতে কিছু দলকে নিবন্ধনের ঘোষণা দিয়েও পরে তা বাতিল করা হয়। আবার ‘আমজনতার দল’-এর নিবন্ধন না পাওয়ায় দলটির সদস্য সচিব তারেক রহমানের আমরণ অনশন এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সংহতির মুখে ইসি নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়। শেষ পর্যন্ত ‘আমজনতার দল’ ও ‘জনতার দল’ উভয়কেই নিবন্ধন দেয়া হয়।
সীমানা নির্ধারণ ও তফসিল বিতর্ক:
নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ ছিল এই কমিশনের জন্য সব থেকে বড় অগ্নিপরীক্ষা। ৪৬টি আসনের সীমানা পরিবর্তন নিয়ে উচ্চ আদালতে ৩০টিরও বেশি রিট মামলা হয়। বাগেরহাট ও গাজীপুরের সংসদীয় আসন নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হলে ইসি শেষ মুহূর্তে তাদের গেজেট পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। এমনকি পাবনা-১ ও পাবনা-২ আসনের ভোটগ্রহণ স্থগিত ও পুনরায় চালুর মতো নজিরবিহীন ঘটনাও ঘটেছে।
বারবার সিদ্ধান্ত বদলের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাসুদ সংবাদমাধ্যমকে বলেন, একটি সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন নিশ্চিত করতেই এই পরিবর্তনগুলো আনা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, কোনো রাজনৈতিক চাপের মুখে ইসি এসব করেনি। কমিশনের অভ্যন্তরে কিছু বিষয়ে মতপার্থক্য ছিল। রাজনৈতিক দলগুলোর যৌক্তিক আপত্তির কারণে সিদ্ধান্তগুলো পুনর্বিবেচনা করা হয়েছে। ইসি সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে এবং জনস্বার্থেই কাজ করছে বলে মন্তব্য করেন আবদুর রহমানেল মাসুদ।
অবশ্য নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার জানিয়েছেন, ইসি’র সক্ষমতা নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠেছে। এই নির্বাচনে তারা তাদের সক্ষমতা সেভাবে দেখাতে পারছে না। মানবজমিনকে তিনি বলেন, মোবাইল ব্যবহারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে আবার পরিবর্তন করার কোনো কারণ নেই। কারও মতামতের অপেক্ষা করা তো উচিত নয়। তা ছাড়া মনোনয়নের সময় ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকা প্রার্থীকে বৈধতা দেয়ার বিষয়ে ইসি’র ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অন্যদিকে পর্যবেক্ষক নিবন্ধন নিয়েও বিতর্ক হয়েছে। যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও অনেক পর্যবেক্ষককে অনুমোদন দেয়া হয়েছে।